বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় হচ্ছে, স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস চালুর উদ্যোগ
সুপ্রিম কোর্ট

উত্তরাধিকার সনদ পরে বাতিল হলেও আগের সনদের ভিত্তিতে শেয়ার হস্তান্তর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল নয়: হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক : উত্তরাধিকার সনদ পরবর্তীতে বাতিল বা প্রত্যাহার করা হলেও, ওই সনদ কার্যকর থাকা অবস্থায় কোম্পানি যদি সনদধারীর সঙ্গে সৎ বিশ্বাসে শেয়ার সংক্রান্ত লেনদেন করে থাকে, তাহলে শুধু পরবর্তী সময়ে সনদ বাতিল হওয়ার কারণে আগের লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, কোম্পানি আইনের ৪৩ ধারায় সদস্য নিবন্ধন সংশোধনের আবেদন করতে গিয়ে জটিল উত্তরাধিকার, চুক্তি, নাবালকের সক্ষমতা, প্রতারণা, মালিকানা বিরোধ এবং তৃতীয় পক্ষের অধিকার নির্ধারণের মতো বিস্তৃত প্রশ্ন উঠলে, শুধু নিবন্ধন সংশোধনের সংক্ষিপ্ত কার্যক্রমে এসব বিরোধের পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি করা সবসময় উপযুক্ত নয়।

‘আবু তাবের ও অন্যান্য বনাম নিউটেক্স গ্রুপ অব কোম্পানিজ ও অন্যান্য’ মামলায় এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। মামলাটি কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ৪৩ ধারার অধীনে দায়ের করা হয়েছিল। কোম্পানি বিষয়ক মামলা নং ১৯১/২০১৭-এ গত ১৫ সেপ্টেম্বর রায় দেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. তৌফিক ইনামের একক বেঞ্চ। এর পর ২২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি গত ১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

মামলার পটভূমি

মামলার নথি অনুযায়ী, আবুল কাসেম বাবুল সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারহোল্ডার ছিলেন। তিনি ১৯৯৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মারা যান। তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ছিলেন বাবা হাজী আবুল খায়ের, স্ত্রী রাজিয়া কাসেম, দুই ছেলে রাজিবুল কাসেম ও সাজিবুল কাসেম এবং মেয়ে সাবরিনা কাসেম।

বাদীদের দাবি ছিল, আবুল কাসেম বাবুলের মৃত্যুর পর তার বাবা হাজী আবুল খায়ের উত্তরাধিকার সূত্রে শেয়ারের একটি অংশ পান। পরে ২০০০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি হাজী আবুল খায়ের মারা গেলে সেই অংশ বাদীদের ওপর বর্তায়।

এর মধ্যে রাজিয়া কাসেম ও আবুল কাসেম বাবুলের সন্তানরা ২০০০ সালে উত্তরাধিকার মামলা দায়ের করে ১৬ মে উত্তরাধিকার সনদ গ্রহণ করেন। বাদীদের দাবি, ওই মামলায় হাজী আবুল খায়েরকে পক্ষ করা হয়নি।

পরবর্তীতে বাদীরা ওই উত্তরাধিকার সনদ বাতিলের জন্য মামলা করেন। ২০১২ সালের ১১ জানুয়ারি আগের উত্তরাধিকার সনদ বাতিল হয় এবং একই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি বাদীদের অনুকূলে নতুন উত্তরাধিকার সনদ দেওয়া হয়। এরপর তারা সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কাছে শেয়ারের মালিকানা স্বীকার এবং সদস্য নিবন্ধন সংশোধনের দাবি জানান।

কোম্পানির বক্তব্য

অন্যদিকে কোম্পানির পক্ষের বক্তব্য ছিল, আবুল কাসেম বাবুলের মৃত্যুর পর ২০০০ সালের উত্তরাধিকার সনদের ভিত্তিতে তার স্ত্রী ও সন্তানদের উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০১ সালের ৮ জুলাই একটি সমঝোতা স্মারক এবং ৫ নভেম্বর ফরম ১১৭সহ বিভিন্ন নথির মাধ্যমে শেয়ার সংক্রান্ত লেনদেন সম্পন্ন হয়।

ওই সমঝোতার ভিত্তিতে সালিশি কার্যক্রমও হয়। প্রথমে ১ কোটি ৫৩ লাখ ৩৭ হাজার ৯১৭ টাকা এবং পরে ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কোম্পানির পক্ষের দাবি, এই অর্থ শেয়ারের বিনিময়ে দেওয়া হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট বিবাদীরা ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে শেয়ার অর্জন করেন। কোম্পানিগুলো তখন কার্যকর থাকা উত্তরাধিকার সনদ ও পরবর্তী হস্তান্তর নথির ওপর নির্ভর করে সৎ বিশ্বাসে কাজ করেছে।

বাদীদের দাবি

বাদীদের আইনজীবী আদালতে বলেন, তারা সংশ্লিষ্ট শেয়ারের বৈধ উত্তরাধিকারী। তাদের দাবি, আগের উত্তরাধিকার সনদে হাজী আবুল খায়েরকে অন্তর্ভুক্ত না করায় সেটি পরবর্তীতে বাতিল হয়েছে। ফলে ওই সনদের ওপর ভিত্তি করে করা পরবর্তী শেয়ার হস্তান্তরের ভিত্তিও আর বহাল নেই।

এ ছাড়া সমঝোতা স্মারক ও ফরম ১১৭ সম্পাদনের সময় আবুল কাসেম বাবুলের সন্তানরা নাবালক ছিলেন বলেও বাদীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। তাদের বক্তব্য ছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পারিবারিক সম্পর্ক সম্পর্কে অবগত থাকায় কোম্পানিগুলোকে সৎ বিশ্বাসের সুরক্ষা দেওয়া উচিত নয়।

বিবাদীদের আপত্তি

বিবাদীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, চারটি পৃথক কোম্পানির পৃথক সদস্য নিবন্ধন, পৃথক শেয়ারহোল্ডিং ও পৃথক লেনদেন নিয়ে একসঙ্গে মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০০১ সালে সম্পন্ন লেনদেনের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে আবেদন করা হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ১৬ বছর পর মামলা করা হয়েছে।

তাদের দাবি, বাদীরা মূলত সমঝোতা স্মারক, সালিশি কার্যক্রম, ফরম ১১৭ এবং শেয়ার হস্তান্তর বাতিল করতে চাইছেন। এসব বিষয়ে চুক্তির বৈধতা, নাবালকের সক্ষমতা, কর্তৃত্ব, মূল্য পরিশোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বী মালিকানার মতো জটিল প্রশ্ন জড়িত। এগুলো কোম্পানি আইনের ৪৩ ধারার অধীনে সংক্ষিপ্ত নিবন্ধন সংশোধনের আবেদনে নিষ্পত্তি করা সমীচীন নয়।

চার কোম্পানির দাবি এক মামলায় করা যাবে

আদালত চারটি কোম্পানির সদস্য নিবন্ধন সংশোধনের দাবি এক আবেদনে আনা হয়েছে বলে মামলাটি অগ্রহণযোগ্য, এমন যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন।

হাইকোর্ট বলেন, চারটি কোম্পানি পৃথক আইনগত সত্তা হলেও সংশ্লিষ্ট শেয়ার হস্তান্তরগুলো একই উত্তরাধিকার ঘটনা ও একই উত্তরাধিকার সনদের ওপর ভিত্তি করে হয়েছে। ফলে এসব বিষয়ে অভিন্ন আইনগত ও বাস্তব প্রশ্ন রয়েছে। আলাদা মামলা হলে একই বিষয় নিয়ে পুনরাবৃত্তি এবং পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্তের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তবে আদালত স্পষ্ট করেন, প্রতিটি কোম্পানির নিবন্ধন সংশোধনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির জন্য পৃথকভাবে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ৪৩ ধারার শর্ত পূরণ করতে হবে।

উত্তরাধিকার সনদ বাতিলের প্রভাব নিয়ে আদালতের ব্যাখ্যা

আদালত বলেন, উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫-এর দশম ভাগের আওতায় মৃত ব্যক্তির দেনা ও সিকিউরিটির বিষয়ে উত্তরাধিকার সনদ কার্যকর হয়। কোম্পানির শেয়ারও এ ক্ষেত্রে ‘সিকিউরিটি’ হিসেবে গণ্য হয়।

আইনের ৩৮১ ধারায় উত্তরাধিকার সনদের ভিত্তিতে সৎ বিশ্বাসে সম্পন্ন লেনদেনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। আবার ৩৮৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো উত্তরাধিকার সনদ পরবর্তীতে বাতিল বা অকার্যকর হলেও, সেই বাতিলের বিষয়টি না জেনে সনদধারীর সঙ্গে সৎ বিশ্বাসে সম্পন্ন লেনদেন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বৈধ সুরক্ষা পেতে পারে।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, পরবর্তীতে উত্তরাধিকার সনদ বাতিল হয়েছে, এই তথ্যই যথেষ্ট নয় যে ওই সনদের ভিত্তিতে আগে সম্পন্ন সব লেনদেন শুরু থেকেই অবৈধ ছিল। বাদীদের আরও প্রমাণ করতে হবে যে লেনদেনের সময় কোম্পানিগুলো সনদের ত্রুটি সম্পর্কে জানত অথবা তারা সৎ বিশ্বাসে কাজ করেনি।

কোম্পানির কর্মকর্তাদের পারিবারিক সম্পর্ক জানা যথেষ্ট নয়

বাদীদের দাবি ছিল, কোম্পানির কর্মকর্তারা আবুল কাসেম বাবুল ও হাজী আবুল খায়েরের পারিবারিক সম্পর্ক জানতেন। তাই তারা সৎ বিশ্বাসের দাবি করতে পারেন না।

আদালত বলেন, কোনো মৃত শেয়ারহোল্ডারের পারিবারিক সম্পর্ক জানা এবং সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকার সনদ অবৈধ বা ত্রুটিপূর্ণ, তা জানা এক বিষয় নয়। আদালতের মতে, ২০০০-২০০১ সালে কোম্পানিগুলো জানত যে উত্তরাধিকার সনদটি ত্রুটিপূর্ণ ছিল বা হাজী আবুল খায়েরের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দাবি করা হয়েছিল, এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ বাদীরা দিতে পারেননি।

সালিশি রায় বাদীদের ওপর সরাসরি বাধ্যতামূলক নয়

আদালত বলেন, কোনো ব্যক্তি সালিশি চুক্তির পক্ষ না হলে সাধারণভাবে অন্যদের মধ্যে হওয়া সালিশি রায়ের মাধ্যমে তার মৌলিক অধিকার নির্ধারণ করা যায় না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সদস্য নিবন্ধন অবশ্যই বাদীদের নামে সংশোধন করতে হবে। কারণ বিবাদীদের দাবি শুধু সালিশি রায়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। তারা কার্যকর থাকা উত্তরাধিকার সনদ, পরবর্তী সমঝোতা, হস্তান্তর নথি এবং অর্থ পরিশোধের ওপরও নির্ভর করছে।

নাবালকদের মাধ্যমে শেয়ার হস্তান্তরের প্রশ্নেও সরাসরি প্রতিকার নয়

বাদীরা দাবি করেছিলেন, শেয়ার হস্তান্তরের সময় আবুল কাসেম বাবুলের সন্তানরা নাবালক ছিলেন। আদালত বলেন, নাবালকের আইনগত সক্ষমতা, অভিভাবকের কর্তৃত্ব, লেনদেনের প্রকৃতি এবং নাবালকের স্বার্থে লেনদেনটি হয়েছিল কি না, এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে।

তবে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলেই বাদীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট শেয়ারের মালিক হিসেবে সদস্য নিবন্ধনে নাম লেখানোর অধিকারী হয়ে যান না। এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ বিচার প্রয়োজন হতে পারে।

দীর্ঘ বিলম্বও নিবন্ধন সংশোধনের আবেদনের বিরুদ্ধে গেছে

আদালত বলেন, কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ৪৩ ধারায় নির্দিষ্ট কোনো তামাদি সময়সীমা নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে দীর্ঘ বিলম্ব কোনো গুরুত্ব বহন করবে না।

এ ক্ষেত্রে ২০০১ সালের লেনদেনের পর ২০০৮ সালে বাদীরা আগের উত্তরাধিকার সনদের বিষয়ে জানতে পারেন, ২০১২ সালে নতুন সনদ পান এবং এরপর ২০১৭ সালে ৪৩ ধারায় হাইকোর্টে আবেদন করেন।

এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তৃতীয় পক্ষের অধিকার সৃষ্টি হয়েছে, অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে এবং কোম্পানির নথিতে দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট নাম বহাল রয়েছে। তাই পূর্ণাঙ্গ বিচার ছাড়া পুরোনো লেনদেন কার্যত বাতিল করে দেওয়ার মতো নিবন্ধন সংশোধনের আদেশ দিতে আদালত সতর্কতা অবলম্বন করেন।

উপযুক্ত দেওয়ানি বা স্বতন্ত্র মামলার সুযোগ খোলা

হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন, ৪৩ ধারার আবেদন খারিজ করার অর্থ এই নয় যে বাদীদের কোনো মৌলিক অধিকার বা দাবি থাকলে তা চিরতরে শেষ হয়ে গেছে।

সমঝোতা স্মারক বা হস্তান্তর নথি বাতিল, প্রতারণা, নাবালকের অধিকার, মালিকানা, হিসাব-নিকাশ, অর্থ ফেরত এবং সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকারীদের অধিকারসহ জটিল বিষয়গুলো প্রয়োজন হলে এমন কোনো উপযুক্ত মামলায় নিষ্পত্তি করা যেতে পারে যেখানে সব প্রয়োজনীয় পক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রমাণ গ্রহণের সুযোগ থাকবে।

আবেদন খারিজ

সবশেষে হাইকোর্ট বলেন, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সদস্য নিবন্ধনে থাকা নামগুলো কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ৪৩ ধারার অর্থে ‘যথেষ্ট কারণ ছাড়া’ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, এমনটি বাদীরা প্রমাণ করতে পারেননি।

২০০১ সালের লেনদেনের সময় কোম্পানিগুলো উত্তরাধিকার সনদের ত্রুটি সম্পর্কে জানত বা সৎ বিশ্বাসে কাজ করেনি, এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি। ২০১২ সালে উত্তরাধিকার সনদ বাতিল হওয়া আগের সৎ বিশ্বাসের লেনদেনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ করে না।

এসব কারণে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ৪৩ ধারায় দায়ের করা আবেদনটি খারিজ করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেন, বাদীদের কোনো স্বতন্ত্র আইনগত দাবি থাকলে তারা উপযুক্ত পৃথক কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারবেন। মামলায় কোনো খরচের আদেশ দেওয়া হয়নি এবং অন্তর্বর্তী আদেশ বহাল থাকলে তা বাতিল করা হয়েছে।