সিরাজ প্রামাণিক : জামিন অভিযুক্ত ব্যক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত অধিকার। বিচার শেষ হওয়ার আগে কেউ দোষী সাব্যস্ত হন না, তাই বৈধ ও স্পষ্ট কারণ ছাড়া কাউকে কারাগারে রাখা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
আমাদের আদালতে প্রায়ই একটি পরিস্থিতি দেখা যায়। উচ্চ আদালত নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য জামিন দিয়েছেন, সেই মেয়াদ শেষ হয়েছে, কিন্তু মেয়াদ বৃদ্ধির আদেশ সময়মতো নিম্ন আদালতে দাখিল করা যায়নি। তখন কি অভিযুক্তকে কারাগারে পাঠানো যায়? হাইকোর্ট বিভাগ এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিয়েছেন।
শুধু জামিনের মেয়াদ শেষ হলেই কারাগারে পাঠানো যাবে না
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেলেন। এই সময়ে তিনি প্রতিটি তারিখে নিম্ন আদালতে হাজির হয়েছেন। ছয় মাস শেষ হলো, কিন্তু আইনজীবীর মাধ্যমে মেয়াদ বৃদ্ধির আদেশ আনা বা দাখিল করা সম্ভব হয়নি।
শুধু এই কারিগরি কারণে নিম্ন আদালত তার জামিন বাতিল করে তাকে কারাগারে পাঠাতে পারেন না। কারণ আইনজীবীর কোনো ত্রুটির দায় একজন বিচারপ্রার্থীর ঘাড়ে চাপানো যায় না।
অভিযুক্ত নিয়মিত আদালতে হাজির থাকলে এবং জামিনের অপব্যবহারের কোনো অভিযোগ না থাকলে সংশ্লিষ্ট আদালত উচ্চ আদালতের দেওয়া জামিন বহাল রাখতে পারেন।
উচ্চ আদালতে জামিন-সংক্রান্ত রুল বা আপিল বিচারাধীন থাকলে নিম্ন আদালতকে তার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। রুল খারিজ, আপিল নামঞ্জুর, অথবা উচ্চ আদালতের নির্ধারিত জামিনের শর্ত ভঙ্গ না হওয়া পর্যন্ত নিম্ন আদালত সেই জামিন বাতিল করবেন না।
তবে জামিনের অপব্যবহার হলে বাতিল হতে পারে
এই রায় অভিযুক্তকে অবাধ সুযোগ দেয়নি। জামিনের অপব্যবহার হলে আইন অনুযায়ী জামিন বাতিল করা যাবে।
যেমন—
- একই ধরনের অপরাধে আবার জড়ানো;
- তদন্তে বাধা দেওয়া;
- সাক্ষী বা সাক্ষ্যপ্রমাণে হস্তক্ষেপ;
- আত্মগোপন বা বিদেশে পালানো;
- অথবা সহিংস বা প্রতিশোধমূলক কাজে জড়ানো।
অর্থাৎ আসল প্রশ্ন “মেয়াদ শেষ হয়েছে কি না” নয়, বরং “জামিন বাতিলের আইনসম্মত কারণ আছে কি না”।
অভিযুক্ত ও তার পরিবারের করণীয়
নিয়মিত হাজিরা দিন, জামিনের সব শর্ত মেনে চলুন এবং হাজিরার প্রমাণ ও জামিন আদেশের কপি সংরক্ষণ করুন। মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে আইনজীবীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।
ভুক্তভোগীর করণীয়
এই রায় ভুক্তভোগীর স্বার্থের বিরুদ্ধে নয়। অভিযুক্ত আপনাকে ভয় দেখালে, সাক্ষ্যে হস্তক্ষেপ করলে বা পালানোর চেষ্টা করলে তা আদালতকে জানান। জামিন বাতিলের পথ খোলা আছে।
প্রসিকিউশনের করণীয়
জামিন বাতিলের আবেদন শুধু মেয়াদোত্তীর্ণতার ভিত্তিতে নয়, অপব্যবহার বা শর্ত ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে করা উচিত।
বিচারকের করণীয়
জামিন বাতিলের আগে দেখে নেওয়া প্রয়োজন—
- উচ্চ আদালতে রুল বা আপিলের বর্তমান অবস্থা;
- জামিন আদেশের শর্ত;
- হাজিরার রেকর্ড;
- এবং অপব্যবহারের কোনো অভিযোগ আছে কি না।
একটি ছোট পদ্ধতিগত ভুল বোঝাবুঝিও একজন নির্দোষ-বলে-গণ্য মানুষকে অকারণে কারাগারে পাঠাতে পারে। এই রায় সেই অবিচার ঠেকানোর একটি রক্ষাকবচ।
যে মামলায় হাইকোর্ট এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন
মো. ইব্রাহিম বনাম রাষ্ট্র
১৪ এসসিওবি [২০২০] হাইকোর্ট বিভাগ ১০৬
ফৌজদারি আপিল নং ৬৫১৩/২০১৯
রায়ের তারিখ: ২৩.১০.২০১৯
(Md. Ibrahim Vs. The State, 14 SCOB [2020] HCD 106)
এই মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ নিম্ন আদালতের জামিন বাতিলের আদেশকে বেআইনি ও আইনের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করেন এবং অভিযুক্তকে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত জামিনে থাকার অনুমতি দেন। একই সঙ্গে বলা হয়, জামিনের অপব্যবহার হলে নিম্ন আদালত আইন অনুযায়ী জামিন বাতিল করতে পারবেন।
উচ্চ আদালতের জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়া বা মেয়াদ বৃদ্ধির আদেশ দাখিল না হওয়া নিজে নিজে জামিন বাতিলের যথেষ্ট কারণ নয়। জামিনের অপব্যবহার বা শর্ত ভঙ্গ না হলে শুধু একটি পদ্ধতিগত ত্রুটির জন্য কাউকে কারাগারে পাঠানো ন্যায়বিচার নয়।
অধিকার আর দায়িত্ব—দুটোই জামিনের অংশ।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।

