দেশের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীদের লাগেজ কেটে মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি ও লুটপাট স্থায়ীভাবে বন্ধে উড়োজাহাজের কার্গো হোল্ড থেকে লাগেজ বেল্ট পর্যন্ত পুরো যাত্রাপথ টার্মিনালের মনিটরে সরাসরি (লাইভ সিসিটিভি) সম্প্রচারের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিমানবন্দরে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
আজ সোমবার (৫ অক্টোবর) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন জনস্বার্থে এ আইনি নোটিশ পাঠান।
নোটিশটি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (CAAB) চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন কমিশনের (ACC) চেয়ারম্যান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO), হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ কক্সবাজার, সৈয়দপুর, রাজশাহী, যশোর ও বরিশাল বিমানবন্দরের পরিচালক ও ব্যবস্থাপকদের বরাবর পাঠানো হয়েছে।
লাগেজ চুরিতে যাত্রীদের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ
আইনি নোটিশে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সার্বভৌম প্রবেশদ্বার। অথচ দীর্ঘদিন ধরে দেশে আসা ও বিদেশগামী সাধারণ যাত্রী, পর্যটক, বিদেশি কূটনীতিক ও ব্যবসায়ী এবং বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকরা লাগেজ চুরির শিকার হচ্ছেন।
নোটিশে অভিযোগ করা হয়, উড়োজাহাজের মালামাল রাখার স্থান (কার্গো হোল্ড) থেকে লাগেজ নামিয়ে কনভেয়ার বেল্টে পৌঁছানোর মধ্যবর্তী সময়ে সক্রিয় একটি অসাধু চক্র নিয়মিতভাবে যাত্রীদের তালাবদ্ধ লাগেজ কেটে মোবাইল, ল্যাপটপ, স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি ও ছিনতাই করছে।
এ ধরনের লাগাতার চুরির ঘটনায় যাত্রীরা আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক হয়রানির শিকার হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে আরও দাবি করা হয়, এ ধরনের ঘটনা সংবিধানের ৪২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সম্পত্তির মৌলিক অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মর্যাদাপূর্ণ জীবনের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
‘ব্লাইন্ড স্পট’ বন্ধ করে পুরো লাগেজ পরিবহন প্রক্রিয়া ক্যামেরার আওতায় আনার দাবি
নোটিশে বলা হয়, রানওয়ে ও ব্যাগেজ সর্টিং এলাকায় নজরদারির অভাব এবং সিসিটিভির আওতাবহির্ভূত এলাকাগুলোকে (Blind spots) কাজে লাগিয়ে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মী ও লোডাররা এ ধরনের অপরাধ করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তাই লাগেজ চুরির সিন্ডিকেট বন্ধ করতে পুরো লাগেজ পরিবহন প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
এতে উড়োজাহাজের কার্গো অংশ থেকে লাগেজ খালাস, ট্রলিতে তোলা, র্যাম্প এলাকা অতিক্রম করে ব্যাগেজ বেল্টে তোলার পুরো প্রক্রিয়া উচ্চমানের ক্লোজড-সার্কিট ক্যামেরার (CCTV) আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে অ্যারাইভাল লাউঞ্জের বড় পর্দায় পুরো প্রক্রিয়াটি সরাসরি যাত্রীদের সামনে লাইভ সম্প্রচারের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে।
লাগেজ তল্লাশিও ক্যামেরায় লাইভ দেখানোর দাবি
নিরাপত্তা বা তল্লাশির স্বার্থে কাস্টমস বা নিরাপত্তা সংস্থা কোনো যাত্রীর লাগেজ খুললে বা পরীক্ষা করলে সেই কার্যক্রমও যাত্রীর সামনে সরাসরি ক্যামেরায় লাইভ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে লাগেজ খোলা, তল্লাশি বা হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিমানবন্দর কর্মী নিয়োগে দুর্নীতি বন্ধের দাবি
বিমানবন্দরের কর্মী নিয়োগে দুর্নীতির বিষয়েও নোটিশে কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, কোনো কর্মচারী যদি ঘুষ বা দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ পান, তাহলে তার কাছ থেকে সততা ও নিষ্ঠা আশা করা যায় না। বরং অবৈধভাবে দেওয়া ঘুষের টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা থেকেই এ ধরনের কর্মীরা যাত্রীদের লাগেজ কাটা ও মূল্যবান মালামাল লুটের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেন বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে।
এ কারণে বিমানবন্দরের লোডার, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগে ঘুষ ও অনিয়ম বন্ধ করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে সক্রিয় প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি চালানোর দাবি জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ কাঠামো বাস্তবায়নেরও দাবি করা হয়েছে।
১০ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ
আইনি নোটিশে আগামী ১০ দিনের মধ্যে দেশের সব বিমানবন্দরে লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের লাইভ সিসিটিভি সম্প্রচার চালু, প্রকাশ্যে লাগেজ তল্লাশি নিশ্চিত এবং দুদকের মাধ্যমে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দেশের রেমিট্যান্সযোদ্ধা ও সাধারণ যাত্রীদের অধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি সুরক্ষায় সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট পিটিশন (PIL) দায়ের করা হবে।

