কক্সবাজারে ১ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসল আসামির পরিবর্তে চরম নাম-বিভ্রান্তি ও ভুল তথ্যের ভিত্তিতে এক নিরপরাধ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে। ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়ে অন্য ব্যক্তির জন্মনিবন্ধন কার্ডের ফটোকপি ব্যবহার করা মূল আসামি জামিনে গিয়ে আত্মগোপনে চলে গেলেও, ২০২৬ সালের রায়ের পর জারি হওয়া পরোয়ানাবলে বর্তমানে কারাগারে সাজা ভোগ করতে হচ্ছে ‘সোনা মিয়া’ নামের এক সম্পূর্ণ নির্দোষ ব্যক্তিকে।
গত মঙ্গলবার (১১ আগস্ট ২০২৬) রাতে কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলীর পাঠানো বার্তায় এবং জেলা দায়রা জজ আদালতে জমা দেওয়া পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদনে এই গুরুতর জালিয়াতি ও নাম-বিভ্রান্তির তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২০ সালে কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কর্তৃক ১ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম ‘রমজান’। গ্রেপ্তার এড়িয়ে নিজের পরিচয় গোপন করতে তিনি তাঁর সাথে থাকা সোনা মিঞার জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি ব্যবহার করে নিজেকে ‘সোনা মিঞা’ বলে দাবি করেন।
পরবর্তীতে তদন্ত কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিচারিক প্রক্রিয়ার কোনো ধাপেই আসামির সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি। ওই ভুয়া নামেই দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর গত ২৩ জুন ২০২৬ তারিখে র্যাব-১৫ সাজা পরোয়ানাবলে আসল সোনা মিঞাকে তাঁর নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।
ঘটনার প্রেক্ষাপট, পরিচয় গোপন ও মারাত্মক জালিয়াতি
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ২ মার্চ। ওই দিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবাসহ পাঁচজনকে আটক করে। মামলার এজাহারে ২ নম্বর আসামি হিসেবে নাম দেওয়া হয়— ‘সোনা মিয়া, পিতা: মৃত নজির আহমদ, বর্তমান ঠিকানা: কুতুবদিয়াপাড়া, ১ নম্বর ওয়ার্ড, কক্সবাজার পৌরসভা এবং স্থায়ী ঠিকানা: গর্জনিয়া, রামু’।
তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে যে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন, সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন— ২ নম্বর আসামি সোনা মিয়ার দেওয়া নাম-ঠিকানা অনুসন্ধানে সঠিক পাওয়া যায়নি। কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশ দিয়ে বারবার চেষ্টা করেও তার প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি। সেই কারণে আসামিকে কারাগারে রেখেই পরবর্তী বিচার কার্যক্রম পরিচালনার অনুরোধ জানানো হয়।
নথি অনুযায়ী, পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া সত্ত্বেও ২০২২ সালের ১৩ জুন ‘সোনা মিয়া’ পরিচয়ে থাকা ব্যক্তি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। জামিনে বের হওয়ার পরপরই মূল অপরাধী আত্মগোপনে চলে যান।
কারাগারের আবেদন ও পুলিশি তদন্তে অমিলের সত্যতা
২০২৬ সালের জুনে সাজা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার হয়ে আসল সোনা মিঞা কারাগারে যাওয়ার দুই-তিন দিন পর পুরো বিষয়টি এক নতুন মোড় নেয়। নিরপরাধ সোনা মিঞা জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করে জানান যে, তিনি এই ইয়াবা মামলার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন এবং জীবনে কখনোই জেলে যাননি।
বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে জেল সুপার কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে চিঠির মাধ্যমে অবহিত করেন। এরপর আদালত বিষয়টির সত্যতা যাচাই করে দ্রুত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন।
গত ২ জুলাই কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয় যে, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিঞা একই ব্যক্তি নন। ২০২০ সালে ইয়াবাসহ আটক ব্যক্তি নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করতে সোনা মিঞার জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি ব্যবহার করেছিলেন এবং তাঁর প্রকৃত নাম ‘রমজান’।
তদন্তে আরও উঠে আসে, মূল অপরাধী রমজান ও আসল সোনা মিঞা একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরবর্তীতে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে তারা কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় একটি ভাড়া ঘরে একসঙ্গে থাকতেন। কোনো এক সময়ে সোনা মিঞার জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি রমজানের কাছে রয়ে যায় এবং গ্রেপ্তার হওয়ার পর নিজের পরিচয় লুকাতে রমজান সেই কাগজপত্র ব্যবহার করেন।
দুই ব্যক্তির শারীরিক ও পারিবারিক তথ্যের বড় ধরনের পার্থক্য
কারাগারে সংরক্ষন করা ২০২০ সালের এবং ২০২৬ সালের দুটি নথিপত্র পর্যালোচনা করে পুলিশ দেখেছে, দুই ব্যক্তির শারীরিক গঠন ও পারিবারিক তথ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে:
-
২০২০ সালে গ্রেপ্তার ব্যক্তি (মূল আসামি রমজান): পিতার নাম মৃত নজির আহমদ হলেও মায়ের নাম ছিল ‘সোনারা বেগম’ এবং স্ত্রীর নাম ‘আয়েশা’। তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে ছিল (বড় ছেলের নাম মোহাম্মদ আলী)। তাঁর শারীরিক গঠন ছিল— উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, ওজন ৫০ কেজি এবং ডান ও বাম গালে এবং ডান বাহুতে গুরুতর ক্ষতের চিহ্ন ছিল।
-
২০২৬ সালে গ্রেপ্তার ব্যক্তি (নিরপরাধ সোনা মিয়া): পিতার নাম মৃত নজির আহমদ হলেও মায়ের নাম ‘মাহমুদা খাতুন’ এবং স্ত্রীর নাম ‘জান্নাতুল ফেরদৌস’। তাঁর এক ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে (ছেলের নাম ওমর ফারুক ও মেয়ের নাম নাহিদা)। তাঁর শারীরিক গঠন— উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি, ওজন ৪২ কেজি এবং শরীরে শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহু, পেটের বাম পাশে ও পিঠের মাঝখানে তিল রয়েছে।
তদন্তের গাফিলতি ও আইনি প্রতিক্রিয়া
একটি স্পর্শকাতর মাদক মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা নিজে চার্জশিটে আসামির পরিচয় সঠিক নয় বলে উল্লেখ করার পরও কীভাবে সেই ব্যক্তি জামিন পেলেন এবং পরবর্তীতে তাঁর জায়গায় অন্য একজন নিরপরাধ মানুষকে সাজা ভোগ করতে হচ্ছে— তা নিয়ে আইনি অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মন্নান বলেন, “মামলার এজাহার থেকে শুরু করে চার্জশিট জমা দেওয়া পর্যন্ত পুরো তদন্ত প্রক্রিয়ায় পুলিশের চরম গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতা স্পষ্ট। একজন অপরাধী অন্যের জন্মনিবন্ধন দেখালে সেটা যাচাই-বাছাই করা তদন্ত কর্মকর্তার আইনি দায়িত্ব ছিল। আসল আসামি জামিনে পালিয়ে গেল, আর তার বদলে একজন নির্দোষ লোক মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা নিয়ে জেলে রইল— এটি অত্যন্ত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে দ্রুত এই নিরপরাধ ব্যক্তির মুক্তি ও আইনি নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।”
গ্রেপ্তারকৃত সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, “আমার স্বামী সাধারণ একজন মানুষ, তিনি কখনো কোনো অপরাধে জড়াননি। হঠাৎ র্যাব এসে তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আমরা জানতে পারি ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা মামলায় তাঁর নাকি মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকার সময় রমজান নামের এক রোহিঙ্গা বন্ধুর সাথে তাঁর পরিচয় ছিল, সে-ই কৌশলে আমার স্বামীর কাগজের কপি ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিঞা বানিয়ে এই জালিয়াতি করেছে।”
কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, আদালতের নির্দেশনামা অনুযায়ী বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। বুধবার (১২ আগস্ট ২০২৬) এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বিচারকের আদেশের তারিখ নির্ধারণ করা থাকলেও বেলা ২টা পর্যন্ত কোনো লিখিত নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে আদালতের আদেশের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছেন কারাগারে থাকা নির্দোষ সোনা মিয়া ও তাঁর পরিবার। একই সাথে প্রশ্ন উঠেছে, আসল অপরাধী রমজান এখন কোথায় এবং পুলিশের ভুলের দায় কেন একজন সাধারণ নাগরিককে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে?

