ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল কার্যকর না থাকায় দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে আটকে থাকা একটি ফার্স্ট আপিল নিষ্পত্তি করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ রায়ের ফলে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা অনুরূপ পুরনো মামলাগুলোর নিষ্পত্তির পথ উন্মুক্ত হলো।
এতদিন আপিল ট্রাইব্যুনাল কার্যকর না থাকায় যারা বাধ্য হয়ে হাইকোর্টে এসেছিলেন, তারা এখন বিলম্ব মওকুফের আবেদনসহ সংশ্লিষ্ট জেলার ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালে আইনি প্রতিকার চাইতে পারবেন।
রায়ে আদালত বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আইন সংশোধন ও সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল’ কার্যকর হওয়ায় এখন সংশ্লিষ্ট আপিলকারীদের উপযুক্ত ফোরামেই যেতে হবে। একই সঙ্গে এতদিন উপযুক্ত আপিল ট্রাইব্যুনাল না থাকায় হাইকোর্টে রিটসহ বিভিন্নভাবে আইনি প্রতিকার চাইতে গিয়ে যে সময়ক্ষেপণ হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালকে বিলম্ব মওকুফের আবেদন বিবেচনা করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
এ. কে. এম. ফজলুল হক ও অন্যান্য বনাম বায়তুল আমান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লি. ও অন্যান্য মামলায় হাইকোর্ট এমন নির্দেশনা দিয়েছেন।
গত ১৮ আগস্ট বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান এবং বিচারপতি উর্মী রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ২৩ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে। মামলার মূল রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান।
রায় প্রদানকালে আদালতে আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. ইফতেখার আহমেদ। বিবাদীপক্ষে কেউ উপস্থিত ছিলেন না।
রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর আপিলকারীরা যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে আপিল দায়ের করলে সংশ্লিষ্ট জেলার ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালকে তাদের বিলম্ব মওকুফের আবেদন বিবেচনা করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
মামলার পটভূমি
দেশের জমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রায় প্রতিটি জেলায় রয়েছে ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল। এসব ট্রাইব্যুনালে হাজারো মামলা বিচারাধীন। স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট, ১৯৫০-এর ১৪৫বি ধারা অনুযায়ী ২০০৪ সালে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল এবং ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
এই আইনে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের যেকোনো রায়, ডিক্রি বা আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষের কেবল ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু আইন হলেও সরকার কোনো সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল’ প্রতিষ্ঠা করেনি কিংবা কোনো বিচারককে দায়িত্ব প্রদান করেনি।
এরপর দীর্ঘ ১৯ বছর পর ২০২৩ সালের ১১ জুলাই জাতীয় সংসদে ‘স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৩’ পাস হয়। এর ধারাবাহিকতায় সরকার ২০২৩ সালের ২৩ আগস্ট গেজেট জারির মাধ্যমে প্রতিটি জেলার জেলা জজদের ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব প্রদান করে বিচারিক ফোরাম কার্যকর করে।
মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৬ সালে ঢাকার ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে আরএস/বিএস খতিয়ান ও রেকর্ড সংশোধনের দাবিতে এ. কে. এম. ফজলুল হকসহ অন্যরা মামলা করেন। ওই মামলায় বিবাদী পক্ষ দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ-৭, রুল-১১ অনুযায়ী আবেদন প্রত্যাখ্যানের আবেদন জানায়। ট্রাইব্যুনাল বিবাদীর আবেদন বিবেচনায় নিয়ে ২০০৭ সালের ৩ জুলাই বাদীর আবেদন প্রত্যাখ্যান করে রায় ও ডিক্রি দেন।
এরপর আইন অনুযায়ী বাদীপক্ষের আপিল করার একমাত্র ফোরাম ছিল ‘ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল’। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল কার্যকর না থাকায় এ. কে. এম. ফজলুল হকসহ অন্যরা আইনি প্রতিকারের জন্য বাধ্য হয়ে ২০০৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগে ফার্স্ট আপিল দায়ের করেন। যা নিয়ম অনুযায়ী তামাদি মেয়াদের মধ্যেই নিবন্ধিত হয়েছিল। যদিও এভাবে হাইকোর্টে আপিল করাটা ছিল ভুল প্রক্রিয়া।
তবে হাইকোর্ট বিভাগ ফার্স্ট আপিলটি শুনানির উদ্যোগ নেন। শুনানিতে ফার্স্ট আপিলকারীদের আইনজীবী যুক্তি দেন, আপিলটি ভুল ফোরামে দায়ের করা হয়েছিল এবং বর্তমানে সঠিক ফোরাম কার্যকর হওয়ায় আপিলকারীদের উপযুক্ত ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে মামলাটি নিষ্পত্তি করা সমীচীন।
এরপর হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়ে মামলাটি নিষ্পত্তি করেন।
হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা
হাইকোর্ট রায়ে উল্লেখ করেন, স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্টের ১৪৫বি ধারার আইনি কাঠামো অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগ সরাসরি ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না। সাধারণ দেওয়ানি এখতিয়ার অনুযায়ীও এই আপিল গ্রহণ বা বিচার করার আইনি সুযোগ নেই। ফলে হাইকোর্টে দায়ের করা ফার্স্ট আপিলটি আর শুনানিযোগ্য নয়।
তবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে হাইকোর্ট বেঞ্চ নির্দেশনা দিয়েছেন, সংক্ষুব্ধ বাদী/আপিলকারীরা ঢাকার যথাযথ ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালে নতুন করে আপিল দায়ের করতে পারবেন।
রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর আপিলকারীরা যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে আপিল দায়ের করলে ট্রাইব্যুনাল তাদের বিলম্ব মওকুফের আবেদন বিবেচনা করবে। একই সঙ্গে আপিল দায়েরের নির্ধারিত সময়ে কোনো আপিল ট্রাইব্যুনাল বিদ্যমান না থাকায় বাধ্য হয়ে আপিলকারীরা ভুল ফোরামে, অর্থাৎ হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন জানিয়েছিলেন—ট্রাইব্যুনালকে বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
অতএব, ফার্স্ট আপিলটি নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং নিম্ন আদালতের যাবতীয় নথি ও রায়ের অনুলিপি অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

