প্রসঙ্গ: জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অপরাধ আমলে নেয়ার ক্ষমতা বিতর্ক

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৫ জুন, ২০১৯ ৪:১৬ অপরাহ্ণ
এস. এম. শরিয়ত উল্লাহ্

এস. এম. শরিয়ত উল্লাহ্:

২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল দিন। এই দিনে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ হতে পৃথক হয়। এ সময়ের পূর্বে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ “ম্যাজিস্ট্রেট” এর দায়িত্ব পালন করতেন। বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর ম্যাজিস্ট্রেসী বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে নিযুক্ত কর্মকর্তাদের পরিবর্তে বিজেএস এর মাধ্যমে নিযুক্ত বিচারকদের উপর ন্যস্ত করা হয়। কিছু কিছু প্রশাসনিক কাজ quasi-judicial (আধা-বিচারিক) হওয়ায় প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে বিচার বিভাগ পৃথককরণের সময় ম্যাজিস্ট্রেট পদটি দুই ভাগে ভাগ করা হয়, জুডিসিয়াল এবং এক্সিকিউটিভ। উদ্দেশ্য, জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটগণ বিচারিক কাজ করবে (যেমন অপরাধ আমলে নেয়া, মামলা বিচার করা ইত্যাদি) এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ প্রশাসনিক কাজ করবে (যেমন লাইসেন্স প্রদান, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ইত্যাদি)। উক্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এর দায়িত্ব দেয়া হয় প্রশাসন ক্যাড্যারের কর্মকর্তাদেরকে এবং মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশকে। কিন্তু, ২০০৮ সাল থেকেই জেলা ম্যাজিস্ট্রেটগণ অপরাধ আমলে নেয়ার ক্ষমতা চেয়ে আসছেন, যা বিচার বিভাগ পৃথককরণের মহান উদ্দেশ্য, মাজদার হোসেন মামলার রায় এবং সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। তারপরও আসন্ন ডিসি সম্মেলনেও তারা পুনরায় এই ক্ষমতা চাইবেন।

“জেলা ম্যাজিস্ট্রেট” এবং “নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট” কোন বিচারিক পদ নয়, এটা প্রশাসনিক পদ। তবে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ বর্তমানে কিছু কিছু বিচারিক কাজ করে থাকেন। মহামান্য সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ইতিমধ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে। তবে মোবাইল কোর্ট বিষয়ক ঐ মামলাটি মহামান্য সুপ্রিমকোর্টের আপীল বিভাগে বিচারাধীন আছে এবং আদালতের নিকট থেকে সময় নিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ এখনো মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আসছেন। বিধায়, মোবাইল কোর্ট এখনো আইনানুগভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। এটা নিয়ে দ্বিমত নেই। তবে, যেহেতু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ কিছু কিছু বিচারিক কাজ করছেন সেহেতু সংবিধান এবং বিদ্যমান আইনয়ানুযায়ী তারা বিচারিক কাজের ক্ষেত্রে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের তত্ত্বাবধান এবং নিয়ন্ত্রনাধিন [দেখুনঃ বাংলাদেশ সংবিধান (অনুচ্ছেদ ১০৯ এবং ১১৬)]। এছাড়াও, ফৌজদারী কার্যবিধি অনুযায়ী জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ সকল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ মাননীয় জেলা ও দায়রা জজের অধিনস্ত [দেখুনঃ ফৌজদারি কার্যবিধি ধারা-৪৩৫ এবং মোবাইল কোর্ট আইনের ধারা ১৩(৩)]।

উল্লেখ্য যে, জেলা পর্যায়ে বিচারকাজে নিয়োজিত সকল বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, বিচারক এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) প্রদান করেন মাননীয় জেলা ও দায়রা জজ। যিনি জেলার সর্বোচ্চ কর্মকর্তা। বিজ্ঞ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ সকল ম্যাজিস্ট্রেট (জুডিসিয়াল এবং এক্সিকিউটিভ) এর আপীলেট অথরিটি হলেন মাননীয় জেলা ও দায়রা জজ। বিধায়, সুষ্ঠু বিচারিক কার্য নিশ্চিত এবং শৃঙ্খলার স্বার্থে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ সকল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের বিচারিক কাজের প্রতিবেদন মাননীয় জেলা ও দায়রা জজ বরাবর প্রদানের বাধ্যবাধকতা থাকা উচিৎ। একই সাথে তাদের বিচারিক কাজের মূল্যায়ন তথা এসিআর প্রদানের ক্ষমতা মাননীয় জেলা ও দায়রা জজকে প্রদান করা উচিৎ।

সম্মানিত ডিসিগণ ২০০৮ সাল থেকে বরাবরের মতো এবারো আসন্ন ডিসি সম্মেলনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের অপরাধ আমলে নেয়ায় ক্ষমতা চাইবেন। এর আগে সম্মানিত ডিসিগণ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক কাজের ক্ষেত্রে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট এবং মাননীয় জেলা ও দায়রা জজের নিকট তাদের অধীনতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতের বিষয়েও কথা বলবেন বলে “আশা” রাখি।

লেখক: সহকারী জজ, পাবনা।