পণ্য কিনে ঠকে ভোক্তার লাভ এক কোটি

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২ মার্চ, ২০২০ ১২:৩৭ অপরাহ্ণ

বাণিজ্য মেলায় একটি প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কিনে ঠকেছেন মো. রকিবুল হাসান। ভুক্তভোগী এই ক্রেতা এস এস ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামের ওই বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করা হয় ১০ হাজার টাকা। আর এই টাকার ২৫ শতাংশ অর্থাৎ দুই হাজার ৫০০ টাকা পান অভিযোগকারী ভোক্তা।

গত ১০ বছরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মানহীন কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য কিনে রকিবুলের মতো ঠকে যাওয়া ভোক্তাদের সহায় হয়ে এসেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এমন সব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে আসছে সংস্থাটি। আর প্রতিটি জরিমানার ২৫ শতাংশ পান অভিযোগকারী ভোক্তা। গত দশ বছরে সব মিলিয়ে জরিমানার এক কোটি এক লাখ ৮৫ হাজার টাকা পেয়েছেন ভোক্তারা। আর বাকি টাকা জমা হয়েছে সরকারি কোষাগারে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন প্রণীত হয়। ২০১০ সালের ৬ এপ্রিল বাজার তদারকির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠ পর্যায়ে আইনটির বাস্তবায়ন শুরু করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

২০১০ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ২৮ হাজার ১৬৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে প্রমাণিত হয়েছে পাঁজ হাজার ৯২১টি। প্রমাণিত অভিযোগগুলোতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয় চার কোটি ১২ লাখ ৯৬ হাজার আট টাকা। এর মধ্য থেকে ২৫ শতাংশ হিসেবে ভোক্তাদের দেওয়া হয়েছে এক কোটি এক লাখ ৮৫ হাজার দুই টাকা।

মোড়কের গায়ে সংশ্লিষ্ট পণ্যের খুচরা বিক্রয় মূল্য, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ ইত্যাদি লেখা না থাকা, পণ্য ও সেবা মূল্যের তালিকা প্রদর্শন না করা, নির্ধারিত মূল্যের অধিক মূল্য দাবি করার কারণে ১৭ হাজার ১১০ প্রতিষ্ঠানকে এসব জরিমানা করা হয়।

সবচেয়ে বেশি জরিমানা করা হয় অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন করা প্রতিষ্ঠানকে। যেখানে ২১ হাজার ৪৯৫ প্রতিষ্ঠানকে ১৮ কোটি ৮৯ লাখ ৮৬ হাজার ৫৯০ টাকা জরিমানা করা হয়। আর মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করায় আট হাজার ৩৯৫ প্রতিষ্ঠানকে দুই কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার ৪৫০ টাকা। সেবার মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করায় ৩২৬ প্রতিষ্ঠানকে ১২ লাখ ৯২ হাজার ২৫০ টাকা।

ভেজাল পণ্য বা ওষুধ বিক্রয়, ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য মিশ্রিত পণ্য বিক্রয়, অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাতে প্রতারিত করা, প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রয় বা সরবরাহ না করার অভিযোগে ২৭ হাজার ৪৭৬ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয় ২৯ কোটি ৭ লাখ ১৭ হাজার ২০ টাকা।

এ ছাড়া ওজনে, পরিমাপে, দৈর্ঘ্য পরিমাপক ফিতা বা অন্য কিছুতে কারচুপি করার কারণ, পণ্যের নকল প্রস্তুত বা উৎপাদন, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বা ওষুধ বিক্রয় করা, সেবাগ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্নকারী কাজ করা, অবহেলার কারণে সেবাগ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য ইত্যাদির হানি করার ইত্যাদিত কারণে সব মিলিয়ে ৮৮ হাজার ৫৫০ প্রতিষ্ঠানকে ৫৭ কোটি ৯৫ লাখ ৮৪ হাজার ৪৫০ জরিমানা করা হয়। এমনও রয়েছে যে একই প্রতিষ্ঠান ও দোকানে একাধিকবার জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোক্তারা সচেতন হওয়ায় অভিযোগ বাড়ছে। প্রতারক ব্যবসায়ীকে যে জরিমানা করা হয়, তার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারী ভোক্তা পায় বলে অনেকে এক্ষেত্রে উৎসাহিত হয়ে অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে আরও উৎসাহিত হচ্ছে। কোনো ব্যবসায়ী ভোক্তাকে ঠকালে শুধু শাস্তিই পাবেন না, বরং ভোক্তাও অভিযোগ করে আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, এমন আইনের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে।

ভোক্তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ছাড়াও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিজস্ব উদ্যোগেও বাজার অভিযান করে থাকে। ১৯ জানুয়ারি ২০২০ পর্যন্ত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন মতে দোষী সাব্যস্ত করে ৭০ হাজার ২৭১টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৫৩ কোটি ৮২ লাখ ৮৮ হাজার ৪৪২ টাকা জরিমানা আদায় করেছে তারা। ২০০৯ থেকে ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত অভিযোগ পাওয়া গেছে চার হাজার ৩৮৫টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে তিন হাজার ৬৩৬টি, তদন্তাধীন ৭৪৯টি।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাবের সভাপতি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ভোক্তাদের অধিকার তখনই সংরক্ষণ হতে যখন দেখব আর একটিও অভিযোগ পড়ছে না। তবে ভোক্তা অধিকার সাংরক্ষণ অধিদপ্তর তাদের সীমিত লোকবল দিয়ে ভালো কাজ করাছে। জনগণের মধ্যে সচেতনা তৈরি করছে তারা। কিন্তু ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সম্পর্কে সবাইকে জানাতে হলে উপজেলা পর্যায়েও অফিস করতে হবে। আরও প্রচারণা করতে হবে।

তিনি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), স্থানীয় সরকারসহ ভোক্তাদের নিয়ে কাজ করে এমন অন্য কর্তৃপক্তকে আরও জোরালো ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশপাশি ভোক্তা বান্ধব বাজার ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে হবে বলেও জানান তিনি।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমরা আমাদের কার্যক্রম সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে কাজ করছি। এ বছর আমরা ইউনিয়ন পর্যায়ে আমাদের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্যবহুল ৫০ হাজার ক্যালেন্ডার বিতরণ করেছি। ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছি। তরুণদের মধ্যে আমাদের কার্যক্রম ছড়িয়ে দিচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেড় হাজার শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমরা একটি অনুষ্ঠান করছি। আমরা চাই, ভোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে। আর এ জন্য ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করছি। বিভিন্ন এলাকার হোটেল রেস্টুরেন্টের মালিকদের দিয়ে আমরা কমিটি করে দিচ্ছি। তারা আমাদের কার্যক্রম মনিটরিং করতে সহায়তা করছে। আসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী নেতারা সোচ্চার হচ্ছে।’

উপজেলা পর্যায়ে কার্যালয়ের বিষয়ে মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ে অফিস হওয়া প্রয়োজন। এটা হলে আমাদের কার্যক্রম আরও জোরদার হবে।’

গণশুনানি হয়েছে আড়াই হাজারের বেশি
জানা গেছে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর শুরু থেকে গত বছর (২০১৯) পর্যান্ত গণশুনানি করেছে দুই হাজার ৫৯৭টি আর মতবিনিময় সভা করেছে ৪ হাজার ৭৫৪টি। সচেতনতামূলক পোস্টার বিতরণ করেছে তিন লাখ ৫১ হাজার ৭৪১টি, প্যাম্পলেট ১৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০টি, লিফলেট ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৯৫০, স্টিকার তিন লাখ। আর ক্যালেন্ডার বিতরণ ৭৬ হাজার ৮০০টি।

যেভাবে অভিযোগ করা যায়
কোনো ভোক্তা বা অভিযোগকারী তার পূর্ণাঙ্গ নাম, পিতা ও মাতার নাম, ঠিকানা, ফোন, ফ্যাক্স ও ই-মেইল নম্বর (যদি থাকে) এবং পেশা উল্লেখ করে কারণ উদ্ভব হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্য সম্পর্কে কোনো পণ্যের উৎপাদনকারী, প্রস্তুতকারী, সরবরাহকারী বা পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে ই-মেইল, ফ্যাক্স বা অন্য কোনো উপায়ে লিখিতভাবে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন।

দায়েরকৃত আমলযোগ্য তদন্তে প্রমাণিত ও জরিমানা আরোপ করা হলে আদায়কৃত জরিমানার ২৫ শতাংশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগকারীকে প্রদান করা হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে ০১৭৭৭৭৫৪৬৬৮ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।

পণ্যের মোড়ক ব্যবহার না করা হলে ৩৭ ধারায় এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। মূল্যের তালিকা প্রদর্শন না করা হলে ৩৮ ধারায় এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। এ ছাড়া আরও অনেক ধারা রয়েছে।

ভোক্তা হিসেবে কারও কোনো অভিযোগ থাকলে অভিযোগ তদন্ত করে প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর মধ্যে আছে জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান। এক বছর থেকে তিন বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডের শাস্তি রাখা আছে বিধানে। এর বিকল্প হিসেবে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যায়। দণ্ডিত ব্যক্তি আবার একই অপরাধ করলে সর্বোচ্চ পরিমাণের দ্বিগুণ দণ্ডের বিধান আছে। সূত্র- ঢাকা টাইমস