পারিবারিক সহিংসতার আইনি প্রতিকার

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ৬:০৮ অপরাহ্ণ
মুহম্মদ আলী আহসান

মুহম্মদ আলী আহসান: বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে- “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী”। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে- “রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবেন”। সংবিধানে নারীর সমান অধিকারের বিধান বর্ণিত হলেও তারা ন্যায়সঙ্গত আচরণ থেকে বঞ্চিত।

বাংলাদেশে নারী ও শিশু জীবন যাপনের জন্য পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং প্রায় ক্ষেত্রে কোন প্রতিকার পাচ্ছে না। সে জন্য নারী ও পুরুষ শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের মাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

উক্তরূপ সমস্যা সমাধানকল্পে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ, ১৯৭৯ ও শিশু অধিকার সনদ, ১৯৮৯ এর স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানে বর্ণিত নারী ও শিশুর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ এবং পারিবারিক সহিংসতা হতে নারী ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ প্রণয়ন করে।

উক্ত আইনের ৩ ধারায় পারিবারিক সহিংসতার সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা বলতে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে এমন কোন ব্যক্তি কর্তৃক পরিবারের অপর কোন নারী বা শিশু সদস্যের উপর শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন বা আর্থিক ক্ষতিকে বুঝাবে।

শারীরিক নির্যাতন: শারীরিক নির্যাতন অর্থ, এমন কোন কাজ বা আচরণ করে যার দ্বারা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির জীবন, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা বা শরীরের কোন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্থ হয় অথবা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে অপরাধমূলক কাজ করতে বাধ্য করা বা প্ররোচনা প্রদান করা বা বলপ্রয়োগও তার অন্তর্ভূক্ত।

মানসিক নির্যাতন: মানসিক নির্যাতন অর্থ, মৌখিক নির্যাতন, অপমান, অবজ্ঞা, ভীতি প্রদর্শন বা এমন কোন উক্তি করা যার দ্বারা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়, হয়রানী করা, ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ অর্থাৎ স্বাভাবিক চলাচল, যোগাযোগ বা ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা মতামত প্রকাশে হস্তক্ষেপ করা।

যৌন নির্যাতন: যৌন নির্যাতন অর্থ, যৌন প্রকৃতির এমন আচরণ যার দ্বারা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সম্ভ্রম, সম্মান বা সুনামের ক্ষতি হয়।

আর্থিক ক্ষতি: আর্থিক ক্ষতি অর্থ, আইন বা প্রথা অনুসারে বা কোন আদালত বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যে সকল আর্থিক সুযোগ-সুবিধা, সম্পদ বা সম্পত্তি লাবের অধিকারী তা হতে তাকে বঞ্চিত করা অথবা তার উপর তার বৈধ অধিকার প্রয়োগে বাধা প্রদান করা, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র প্রদান না করা, বিবাহের সময় প্রাপ্ত উপহার বা স্ত্রীধন বা অন্য কোন দান বা উপহার হিসেবে প্রাপ্ত কোন সম্পদ হতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা বা উক্ত সম্পদের উপর তার বৈধ অধিকার প্রয়োগে বাধা প্রদান করা, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির মালিকানাধীন যে কোন স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি তার অনুমতি ব্যতিরেকে হস্তান্তর করা বা তার উপর তার বৈধ অধিকার প্রয়োগে বাধা প্রদান অথবা পারিবারিক সম্পর্কের কারণে যে সকল সম্পদ বা সুযোগ-সুবিধাদিতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির ব্যবহার বা ভোগদখলের অধিকার রয়েছে তা হতে তাকে বঞ্চিত করা বা উক্ত সম্পদের উপর তার বৈধ অধিকার প্রয়োগে বাধা প্রদান করা।

প্রতিকার সমূহ: পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ এর অধীনে নারী ও শিশু নিম্নবর্ণিত প্রতিকার লাভের অধিকারী।

১। অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা আদেশ: অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা আদেশ উক্ত আইনের ১৩ ধারায় বর্ণিত হয়েছে। উক্ত ধারা অনুযায়ী আবেদন প্রাপ্তির পর আদালত আবেদনপত্রের সাথে উপস্থাপিত তথ্যাদি পর্যালোচনা করে আদালত সন্তুষ্ট হলে প্রতিপক্ষ কর্তৃক বা তার প্ররোচনায় কোনরূপ পারিবারিক সহিংসতা ঘটলে বা ঘটবার সম্ভাবনা থাকলে আদালত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সুরক্ষা আদেশ প্রদান করতে পারবে এবং কেন স্থায়ী সুরক্ষা আদেশ প্রদান করা হবে না তা নোটিশ প্রাপ্তির ৭ (সাত) কার্য দিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য প্রতিপক্ষকে নির্দেশ দিতে পারবে।

২। সুরক্ষা আদেশ: উক্ত আইনেরন ১৪ ধারায় সুরক্ষা আদেশ সম্পর্কিত বিধান বর্ণিত আছে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও প্রতিপক্ষকে শুনানীর সুযোগ প্রদান করে আদালত যদি সন্তুষ্ট হয় পারিবারিক সহিংসতা ঘটেছে বা ঘটবার সম্ভাবনা রয়েছে তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির পক্ষে সুরক্ষা আদেশ প্রদান করতে পারবে এবং প্রতিপক্ষকে নিম্নবর্ণিত কাজ করা হতে বিরত থাকার আদেশ প্রদান করতে পারবে।

যথা- পারিবারিক সহিংসতামূলক কোন কাজ সংঘটন, পারিবারিক সহিংসতামূলক কাজ সংঘটনে সহায়তা করা বা প্ররোচনা প্রদান, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির কর্মস্থল, ব্যবসা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান যেখানে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সচরাচর যাতায়াত করেন সে স্থানে প্রবেশ, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সাথে ব্যক্তিগত, লিখিত, টেলিফোন, মোবাইল ফোন, ই-মেইল বা অন্য কোন উপায়ে যোগাযোগ করা, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল বা তার কোন আত্মীয় বা অন্য কোন ব্যক্তি, যিনি তাকে পারিবারিক সহিংসতা হতে রক্ষার জন্য সহায়তা প্রদান করেছেন উক্তরূপ ব্যক্তির প্রতি সহিংসতামূলক কাজ করা হতে, সুরক্ষা আদেশে উল্লেখিত অন্য যেকোন কাজ।

৩। বসবাস আদেশ: উক্ত আইনের ১৫ ধারায় বসবাসের আদেশ সম্পর্কিত বিধান বর্ণিত আছে। উক্ত বিধান অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত নিম্নরূপ বসবাস আদেশ প্রদান করতে পারবে।

যথা- সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যে অংশীদারী বাসগৃহে বা তার যে অংশে বসবাস করেন সে গৃহে বা অংশে প্রতিপক্ষকে বসবাস বা যাতায়াত করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে অংশীদারী বাসগৃহ বা তার কোন অংশ হতে বেদখল করা বা ভোগ দখলে কোনরূপ বাধা সৃষ্টি সংক্রান্ত কার্য হতে প্রতিপক্ষকে বারিত করা, আদালতের নিকট যদি সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সুরক্ষা আদেশ বলবৎ থাকা অবস্থায় অংশীদারী বাসগৃহ সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা তার সন্তানের জন্য নিরাপদ নয়, তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সম্মতির প্রেক্ষিতে আদালত প্রয়োগকারী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধায়নে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির জন্য নিরাপদ আশ্রয় স্থানের ব্যবস্থা করবেন, উপযুক্ত বলে বিবেচিত হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির জন্য অংশীদারী বাসগৃহের বিকল্প বাসস্থান বা অনুরূপ বাসস্থানের জন্য ভাড়া প্রদানের জন্য প্রতিপক্ষকে নির্দেশ প্রদান, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে প্রয়োগকারী কর্মকর্তাসহ অংশীদারী বাসগৃহে প্রবেশের অনুমতি প্রদানের আদেশ, যাতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি উক্ত বাসগৃহ হতে তার ব্যক্তিগত ও মালিকানাধীন জিনিসপত্র, যেমন- চিকিৎসা, শিক্ষা ও পেশাগত দলিলাদি ও সনদপত্রসহ যে কোন ধরনের দলিল, পাসপোর্ট, চেক বই, সঞ্চয়পত্র, বিনিয়োগ ও ব্যাংক হিসাব এবং আয়কর সম্পর্কিত কাগজপত্র, স্বর্ণালংকার, নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন, গৃহস্থালী জিনিসপত্র এবং অন্যান্য যে কোন সামগ্রী সংগ্রহ করতে পারেন বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কর্তৃক ব্যবহৃত এবং ব্যয় বহনকৃত যানবাহন ব্যবহার অব্যাহত রাখার জন্য প্রতিপক্ষকে আদেশ প্রদান। তবে, অংশীদারী বাসগৃহের সম্পূর্ণ বা অংশ বিশেষ সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির অনুকূলে দখলে রাখার আদেশ প্রদান করা হলেও উক্ত আদেশ উক্ত বাসগৃহে প্রতিপক্ষের স্বত্ব ও স্বার্থকে ক্ষুন্ন করবে না। এছাড়া, আদালতের বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিপক্ষকে অংশীদারী বাসগৃহ হতে সাময়িকভাবে উচ্ছেদ করা প্রয়োজন হলে আদালত প্রতিপক্ষকে অংশীদারী বাসগৃহ হতে সাময়িক উচ্ছেদের আদেশ প্রদান করতে পারবে। তবে, নিম্নলিখিত কারণে উক্ত আদেশ অকার্যকর হবে। যথা- সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির জন্য সুবিধাজনক নিরাপদ আশ্রয় বা নিরাপদ স্থান বা বিকল্প বাসগৃহ প্রদান করা সম্ভব হলে অথবা আদালতের নিকট সন্তোষজনকভাবে উক্ত উচ্ছেদ আদেশ বহাল রাখার কোন প্রয়োজন নাই মর্মে প্রতীয়মান হলে। তাছাড়া, আদালতের নিকট উপযুক্ত বলে বিবেচিত হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা তার সন্তান অথবা তার পরিবারের অন্য কোন সদস্যের নিরাপত্তার স্বার্থে অন্য যে কোন শর্ত বা নির্দেশনা প্রদান করতে পারবে। অধিকন্তু প্রতিপক্ষকে জামানতসহ বা জামানত ব্যতীত মুচলেকা সম্পাদনের আদেশ দিতে পারবে যেন তিনি বা তার পরিবারের অন্য কোন সদস্য ভবিষ্যতে পারিবারিক সহিংসতামূলক কাজ করবেন না। উপরন্তু আদালত সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা তার সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লিখিত আদেশ প্রদান করতে পারবে। অন্যদিকে, আদালত সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির মালিকানাধীন যে কোন স্থাবর সম্পত্তি, স্ত্রীধন, উপহার সামগ্রী বা বিবাহের সময় অর্জিত যে কোন সম্পদ এবং অস্থাবর সম্পত্তি, মূল্যবান দলিল, সনদ এবং অন্য কোন সম্পদ বা মূল্যবান জামানত তাকে ফেরত প্রদানের জন্য প্রতিপক্ষকে আদেশ প্রদান করতে পারবে।

৪। ক্ষতিপূরণ আদেশ: উক্ত আইনের ১৬ ধারায় ক্ষতি পূরণের আদেশের বিধান বর্ণিত হয়েছে। উক্ত বিধান অনুযাী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, আর্থিক, স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতি হলে বা ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে, ধারা ১১ এর অধীন আবেদনের সাথে অথবা পৃথক দরখাস্তের মাধ্যমে আদালতের নিকট ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করা যাবে। উক্ত আবেদন প্রাপ্তির ৬ (ছয়) মাসের মধ্যে আদালত আবেদন নিষ্পত্তি করবে। তবে, উক্ত আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে পক্ষসমূহকে শুনানীর সুযোগ প্রদান করে আদালত যেরূপ উপযুক্ত মনে করবে সেরূপ আর্থিক ক্ষতিপূরণ সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে প্রদানের জন্য প্রতিপক্ষকে আদেশ দিতে পারবে। উক্ত ক্ষতি পূরণ আদেশ প্রদানের সময় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আঘাত, ভোগান্তি, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির প্রকৃতি ও পরিমাণ, ক্ষতির জন্য চিকিৎসা খরচ, ক্ষতির স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব, ক্ষতির কারণে বর্তমান এবং ভবিষ্যত উপার্জনের উপর তার প্রভাব, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির যে পরিমাণ স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি স্থানান্তর, হস্তান্তর, ধ্বংস বা ক্ষতি করা হয়েছে তার পরিমাণ ও মূল্য, পারিবারিক সহিংসতার কারণে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা তার পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি কর্তৃক ইতোমধ্যে ব্যয়িত অর্থের যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নিবেন। আদালত সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি এবং তার সন্তানের ভরণ পোষণের জন্য তিনি যেরূপ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত সেরূপ জীবনযাত্রার জন্য পর্যাপ্ত ও যুক্তিযুক্ত অর্থ প্রদানের জন্য প্রতিপক্ষকে আদেশ দিতে পারবে। তাছাড়া, আদালত উপযুক্ত মনে করলে এককালীন বা মাসিক পরিশোধযোগ্য ভরণ পোষণের আদেশ দিতে পারবে। আদালত ক্ষতিপূরণ আদেশের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহ এবং সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিকট প্রেরণ করবে, যার অধিক্ষেত্রের মধ্যে প্রতিপক্ষ সাধারণত: বসবাস বা অবস্থান করেন। প্রতিপক্ষ সরকারি, বেসরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবী হলে ক্ষতিপূরণ আদেশের একটি অনুলিপি প্রতিপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রেরণ করতে হবে। তবে, প্রতিপক্ষ ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে আদালত প্রতিপক্ষের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বা যার অধীনে তিনি কর্মরত রয়েছেন তাকে উক্তরূপ ক্ষতিপূরণ সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বরাবর পরিশোধের নিমিত্ত প্রতিপক্ষের মজুরী, বেতন বা অন্য কোন পাওনা হতে নির্ধারিত অংশ সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে সরাসরি অথবা তার ব্যাংক একাউন্টে জমা প্রদানের জন্য নির্দেশ প্রদান করতে পারবে। এছাড়া, ক্ষতিপূরণ আদেশের অর্থ public demands recovery act, 1913 এর বিধান অনুযায়ী আদায় করা যাবে।

৫। নিরাপদ হেফাজত আদেশ: আদালত উক্ত আইনের অধীনে আবেদন বিবেচনার যে কোন পর্যায়ে উক্ত আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সন্তানকে তার নিকট অথবা তার পক্ষে অন্য কোন আবেদনকারীর জিম্মায় অস্থায়ীভাবে সাময়িক নিরাপদ হেফাজতে রাখার আদেশ দিতে পারবে এবং প্রয়োজনে উক্ত আদেশে প্রতিপক্ষ কর্তৃক উক্ত সন্তানের সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ প্রদান করা যাবে।

পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ এর অধীনে প্রদত্ত উক্ত প্রতিকারসমূহের ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা প্রতিপক্ষ কর্তৃক দাখিলকৃত আবেদনের প্রেক্ষিতে পক্ষগণকে শুনানীর সুযোগ দিয়ে আদালতের নিকট সন্তোষজনক মর্মে প্রতীয়মান হলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রদত্ত কোন আদেশ পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধন বা বাতিল করা প্রয়োজন হলে আদালত লিখিত কারণ উল্লেখপূর্বক আদেশ সংশোধন করতে পারবে। তবে, আদালত কর্তৃক প্রদত্ত সুরক্ষা আদেশ সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কর্তৃক প্রত্যাহারের আবেদন না করা পর্যন্ত এবং আদালত কর্তৃক তা গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

বিচার প্রক্রিয়া: উক্ত আইনের ২০-২৮ ধারায় বিচার প্রক্রিয়া বর্ণিত হয়েছে। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তার অভিযোগ যেকোন থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা বা সরাসরি আদালতের নিকট সুরক্ষার জন্য আবেদন/অভিযোগ করতে পারবেন। আদালতে অভিযোগ দায়ের করা হলে প্রতিপক্ষকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিবেন ও ৭ (সাত) কার্য দিবসের মধ্যে উক্ত অভিযোগ শুনানীর জন্য ধার্য করবে। অত্র আইনের অধীনে প্রতিটি আবেদন (ক্ষতিপূরণ আদেশ ব্যতীত) নোটিশ জারীর তারিখ হতে অনধিক ৬০ (ষাট) কার্য দিবসের মধ্যে আদালত নিষ্পত্তি করবে। তবে, উল্লেখিত সময়ের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত কারণে আবেদন নিষ্পত্তি করা সম্ভব না হলে আদালত কারণ লিপিবদ্ধ করে প্রথমে ১৫ (পনের) কার্য দিবস ও তৎপর আরো ৭ (সাত) কার্য দিবস সময় নিতে পারবে এবং উহা লিখিতভাবে আপীল আদালতকে অবহিত করবে। উক্ত সময়-সীমার মধ্যে নিষ্পত্তি করা সম্ভব না হলে আদালত যথাশীঘ্র সম্ভব আবেদনটি নিষ্পত্তি করবে এবং নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ৭ (সাত) দিন অন্তর অন্তর আবেদনটির নিষ্পত্তির প্রতিবেদন লিখিতভাবে আপীল আদালতকে অবহিত করবে। আপীল আদালত যেকোন পক্ষ কর্তৃক আবেদন অথবা স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে আবেদনটি এখতিয়ার সম্পন্ন অন্য কোন আদালতে স্থানান্তর করতে পারবে। উক্তরূপে আবেদনটি প্রাপ্ত হয়ে আদালত যে পর্যায়ে আবেদনটি স্থানান্তরিত হয়েছে সে পর্যায় হতে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করবে। উক্ত আইনের অধীনে দাখিলকৃত আবেদন বা অপরাধের বিচার বা কার্যধারা জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য হবে এবং ক্ষতিপূরণ আদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কোন নির্দিষ্ট সীমা থাকবে না। তাছাড়া, উক্ত আইনের অধীন কোন আবেদন বা অপরাধের বিচার বা কার্যধারা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ফৌজদারী কার্যবিধির বিধানাবলী প্রযোজ্য হবে এবং ফৌজদারী কার্যবিধি অনুযায়ী সংক্ষিপ্ত বিচার করতে হবে। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগণের সম্মতির ভিত্তিতে অথবা আদালত স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত মনে করিলে উক্ত আইনের অধীন বিচার কার্যক্রম রুদ্ধদ্বার কক্ষে (trial in camera) করতে পারবে।

তাছাড়া, কোন আবেদন বা কার্যধারা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আদালত পক্ষগণকে অবহিত করে নির্ধারিত সময়-সীমার মধ্যে সরেজমিনে তদন্তের আদেশ দিতে পারবে। তাছাড়া, আদালত প্রতিপক্ষের উপস্থিতির জন্য নোটিশ জারী করা সত্ত্বেও প্রতিপক্ষ উপস্থিত না হলে বা একবার উপস্থিত হয়ে পরবর্তীতে আর উপস্থিত না হলে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করতে পারবে এবং আবেদন একতরফা নিষ্পত্তি করতে পারবে।

অপরদিকে, আবেদনকারীর অনুপস্থিতির কারণে কোন আবেদন খারিজ হলে আদালত আবেদনকারীর আবেদনের প্রেক্ষিতে আবেদন সন্তোষজনক হলে খারিজকৃত আবেদন যে পর্যায়ে খারিজ করা হয়েছে সে পর্যায় হতে আবেদন পুনরুজ্জীবিত করে বিচার শুরু করতে পারে। তবে, আবেদন খারিজের ৩০ (ত্রিশ) কার্য দিবসের মধ্যে উক্তরূপ আবেদন করতে হবে এবং একবারের অধিক আবেদন করা যাবে না।

উক্ত আইনের বিধান অনুযায়ী চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আপীল আদালত হিসাবে গণ্য হবে। উক্ত আইনের অধীনে প্রদত্ত আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষ আদেশ প্রদানের তারিখ হতে ৩০ (ত্রিশ) কার্য দিবসের মধ্যে উক্ত আপীল আদালতে আপীল দায়ের করতে পারবে। আপীল আদালত ৬০ (ষাট) কার্য দিবসের মধ্যে আপীল নিষ্পত্তি করবে এবং উপযুক্ত কারণ ব্যতীত আপীল একাধিকবার বদলী করা যাবে না।

উক্ত আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপোষযোগ্য হওয়ায় সংশ্লিষ্ট থানা যে থানা এলাকার মধ্যে আবেদনকারী বসবাস করেন বা প্রতিপক্ষ বসবাস করেন বা পারিবারিক সহিংসতা যে স্থানে সংঘটিত হয়েছে বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যে স্থানে অস্থায়ীভাবে বসবাস করেন সে থানায় বা সংশ্লিষ্ট আমল গ্রহণকারী আদালতে আবেদন দাখিল করতে হবে।

সুরক্ষা আদেশ অমান্যের শাস্তি: উক্ত আইনের ৩০ ধারার বিধান অনুযায়ী প্রতিপক্ষ কর্তৃক সুরক্ষা আদেশ বা তার কোন শর্ত লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে এবং সে জন্য তিনি অনধিক ৬ (ছয়) মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০,০০০/- (দশ হাজার) টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অপরাধ পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে তিনি অনধিক ২ (দুই) বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ) টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

তবে, আদালত উপযুক্ত বিবেচনা করলে প্রতিপক্ষকে ধারা ৩০ এর অধীন শাস্তি প্রদান না করে ৩১ ধারা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিভিন্ন ধরণের সমাজকল্যাণমূলক কাজে সেবা প্রদানের জন্য আদেশ দিতে পারবে এবং উক্তরূপ সেবা প্রদানের বিষয়টি তত্ত্বাবধায়নের জন্য যেকোন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাকে দায়িত্ব প্রদান করতে পারবে।

উক্ত সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমে প্রতিপক্ষ কর্তৃক উপার্জিত আয় হতে আদালত উপযুক্ত পরিমাণ অর্থ সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি এবং তার সন্তান বা তার উপর নির্ভরশীল ব্যক্তিকে প্রদানের আদেশ দিতে পারবে। তবে, কোন ব্যক্তি ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে মিথ্যা আবেদন করলে তিনি তিনি অনধিক ১ (এক) বৎসর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

নারী নির্যাতন ঘরের ভিতরে বা বাইরে সংঘটিত হয়। তবে, পারিবারিক সহিংসতা নিজ বাসস্থানে অন্য কোন পরিবারের সদস্য কর্তৃক মহিলা বা শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়। বাংলাদেশ ব্যুরো, ২০১৫ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ৮০% মহিলা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে। পুরুষতান্ত্রিকতা এবং লিঙ্গ বৈষম্য পারিবারিক সহিংসতার দু’টি প্রধান কারণ।

আমাদের সমাজে মহিলাগণ সাধারণত: পুরুষের অধীনে বসবাস করেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহিংসতার শিকার হন। যা দেখে ছেলে শিশুরা তার পিতার মত প্রভাব বিস্তার বা নির্যাতন করতে শিখে এবং মেয়ে শিশুরা তাদের মাতার কাছ থেকে উক্ত নির্যাতন সহ্য করতে শিখে। বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে Support Service, Victim Support Centre, পুলিশী কার্যক্রম, Non-stop Crisis Centre এবং মহিলাদের জন্য জাতীয় Helpline থাকলেও জনগণ উক্ত আইনটি না জানার কারণে এবং সেবাদাতাদের অনাগ্রহীতা এবং প্রয়োগকারী কর্মকর্তা সময়মত না পাওয়ায় আইনটি প্রয়োগে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

সে জন্য আমাদের দেশে জাতীয় পারিবারিক সহিংসতা পলিসি, সুসংগত Support Service, প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ায় উক্ত আইনের ব্যাপক প্রচার, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, সেবা দানকারী ও আইনজীবীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান এবং আইনের প্রয়োগ বিষয়ে মনিটরিং করা প্রয়োজন। সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে উক্ত কাজে সহায়তা করার জন্য সংযুক্ত করা প্রয়োজন। উক্ত আইনটির সুষ্ঠু প্রয়োগ করা সম্ভব হলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ও যৌতুক নিরোধ আইনে হয়রানীমূলক মামলা কমে যাবে। পাশাপাশি পারিবারিক সহিংসতার হার হ্রাস পাবে। ফলে, আমাদের দেশে মহিলা ও শিশু মানুষের মত মানুষ হিসেবে বসবাসের অধিকার পেয়ে আরো বেশি জাতীয় অগ্রগতিতে অবদান রাখতে পারবে।

তথ্যসূত্র:
১। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০
২। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান।

মুহম্মদ আলী আহসান: চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মৌলভীবাজার।