মো. শহীদুল্লাহ মানসুর
মো. শহীদুল্লাহ মানসুর

আত্মহত্যা প্রতিরোধে চাই সামাজিক আন্দোলন

মোঃ শহীদুল্লাহ মানসুর: স্বাভাবিকভাবে কেউ মরতে চাওয়ার জন্য আত্মহত্যা করে না, আসলে আত্মহত্যার প্রকৃত কারণই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে অধিকাংশ আত্মহত্যার পিছনে থাকে শত-সহস্র যন্ত্রণা, বঞ্চনা বা অপমান বা ব্যর্থতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাওয়ার নেশা।

“মরতে চাই” এবং অভ্যন্তরীণ কষ্ট থেকে মুক্তি চাই” এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য যেমন কেউই বুঝতে পারে না তেমনি বুঝার চেষ্টাও করে না। স্বভাবতই প্রতিটি মানুষ তাঁর নিজ জীবনকে পৃথিবীর সবকিছুর থেকে বেশি ভালবাসে। কিন্তু মানুষ যখন তাঁর সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত জিনিসটিকেই ত্যাগ করে তখন বুঝতে হবে তারা যথেষ্ট সাহসী কিন্তু আবেগপ্রবণ।

হঠাৎ বা কোন উদ্দেশ্য ছাড়া কেউ আত্মহত্যা করেছে এমন নজির পৃথিবীতে পাওয়া দুষ্কর। বিগত কয়েকবছর ধরে মাত্রাতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে আত্মহত্যার হার বাড়ছে, বাড়ছে প্রবণতা কিন্তু সমাধান কোথায়? সমাধানের পথ খুজতে গেলে সবার আগে ভাবতে হবে আত্মহত্যার ঠিক আগ মূহুর্তে সেই মানুষটির মানসিক ও সামাজিক অবস্থান কেমন ছিল?

শুধু সচেতনতামূলক সভা, সেমিনার বা ক্যাম্পেইন অনেকাংশে রূপকথার গল্পের মতোই যা শুনতে বা দেখতেই ভাল লাগে কিন্তু তা মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনে তেমন কাজে আসে না। আইন বা বিধিনিষেধ দিয়ে কোনভাবেই আত্মহত্যা বন্ধ বা কমানো সম্ভব নয় বরং সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামো, জীবনের উদ্দেশ্য ও আচারনে পরিবর্তন পারে আত্মহত্যার প্রবণতাকে কমাতে।

বাংলাদেশের একাধিক আইনে বেশকিছু বিধিনিষেধ দেওয়ার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে তা বিশ্লেষণ করা যাক; 

কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করে ফেললে সেখানে কোন সমাধান আইন দিতে না পারলেও বাংলাদেশ দন্ডবিধি, ১৮৬০ এর ৩০৯ ধারা অনুযায়ী,

যদি কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করার উদ্যোগ নেন বা চেষ্টা করেন বা আত্মহত্যা করার উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করেন তবে তা অপরাধ বলে বিবেচিত হবে এবং এর জন্য উক্ত ব্যক্তির ১ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড বা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড হতে পারে।

এই বিধানের দ্বারা মানুষকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে যেন কেউ এই কাজ না করে। 

কোনো ব্যক্তি সবসময় এককভাবে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় তা কিন্তু নয়। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্য কাউকে আত্মহত্যা করার জন্য প্ররোচনা দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ দন্ডবিধি, ১৮৬০ এর ৩০৬ ধারা অনুযায়ী,

যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তিকে আত্মহত্যা করার জন্য সহায়তা করেন তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে।

সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, যদি কোনো ব্যক্তিতাঁর কথা বা আকার-ইঙ্গিত বা কাজের মাধ্যমে অন্য কোনো ব্যক্তিকে শারীরিক ও মানসিকবভাবে হেয়প্রতিপন্ন বা অপমান বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য বা উত্তেজিত করার মাধ্যেমে বিশ্বাস করান যে তাঁর বেঁচে থাকাই অর্থহীন বা বৃথা বা অন্যায় এবং ফলস্বরূপ উক্ত ব্যক্তি আত্মগ্লানি ও সম্মানহীনতায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হলে এটি আত্মহত্যার প্ররোচনা বলে বিবেচিত হবে এবং এর জন্য ১০ বছরের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদন্ড এবং সাথে অর্থদন্ডও হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০) ৯ক ধারা অনুযায়ী, কোনো নারীর অসম্মতিতে বা অনিচ্ছায় যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কোনো কাজ করেন যা ঐ নারীর সম্ভ্রমহানি করে বা করার প্রত্যক্ষ কারণ হওয়ায় উক্ত নারী আত্মহত্যা করলে তা প্ররোচনা হিসাবেই বিবেচিত হবে। এর জন্য উক্ত ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১০ বছর যা ৫ বছরের কম নয় এমন সশ্রম কারাদন্ড হবে।

বাংলাদেশ দন্ডবিধি, ১৮৬০ এর ৩০৫ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো শিশু বা উন্মাদ ব্যক্তিকে আত্মহত্যা করার জন্য কোনোরূপ সহায়তা বা প্ররোচনা দেন তবে উক্ত ব্যক্তির মৃত্যুদন্ড বা যাবজীবন কারাদন্ড বা সর্বোচ্চ ১০ পর্যন্ত কারাদন্ড এবং সাথে অর্থদন্ডও হতে পারে। 

সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ৩২ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি মৃত্যুর কারণ বা মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করে কোনো নোট রেখে আত্মহত্যা করে তবে উক্ত সুইসাইড নোট বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হবে। তবে সুইসাইড নোটকে ভিত্তিতে শাস্তি দেওয়া যায় না। এক্ষেত্রে সুইসাইড নোট সমর্থনে যথাযথ সাক্ষ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে আত্মহত্যায় যে প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে তা প্রমাণ করতে হবে।

মন্তব্য

আইন বা সেমিনার করে কোনো মানুষকে আত্মহত্যার পথ থেকে সরিয়ে আনা যায় না। তবে সামাজিক, পারিবারিক দায়িত্ববোধ, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনগুলো যথার্থভাবে মেনে চললে অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। মানুষ হিসেবে কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, উপলব্ধি করেন সমাজ কিংবা পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে বাবুঝতে সক্ষম হোন যে সফলতা বা ব্যর্থতা কোনো মানুষকে সুখ বা শান্তিতে রাখতে পারে না তবে তার পক্ষে আত্মহত্যা সম্ভব নয়।

আত্মহত্যার অন্যতম কারণ মানসিক অসুস্থতাও অথচ মানসিক অসুস্থতাকে ততোটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। উলটো তুচ্ছতাচ্ছিল্য, হেয় করা হয় যা আরো বেশি আত্মহত্যা প্রবণ করে তুলে। পারিবারিক কলহ অভিশাপ হিসাবে প্রতীয়মান হয়েছে। সফলতা ছাড়া জীবনের কোন অর্থ নেই, বা পছন্দের জিনিসটি না পাওয়া মানেই ব্যর্থতা এমন ধারণায় মানুষ অস্থির হয়ে পড়েছে। ব্যহত হচ্ছে জীবনের স্বাভাবিক গতি, ঘিরে ধরে হতাশা, ঝুঁকছে আত্মহত্যা দিকে।

অতি সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, সন্তান-সন্ততিসহ পরিবারের সবার আত্মহত্যার ঘটনা। পরিবারের সকলের আত্মহত্যার প্রবণতা দেশ ও জাতির জন্য অশনিসংকেত। নানাবিধ ছোট-বড় কারণে কলহের সূত্রপাত হলেও সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে সন্তানদের উপরে। তারা পারে না সহ্য করতে, না পারে প্রতিবাদ করতে। চাপের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে গেলে সন্তানদের উপর বিরূপ প্রভাব যেমন পড়ে তেমনি বেঁচে থাকার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলে কিংবা অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে অতিমাত্রায় হীনমন্যতাও মানুষকে আত্মহত্যার দিকে টেনে নিয়ে যায়।

সমাজে অর্থনৈতিক সমবস্থার সাথে বৈষম্য কমানো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী। এছাড়াও নানাবিধ কারণে ডিপ্রেশন ভোগে প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। ডিপ্রেশন থেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। সুতরাং আত্মহত্যার জন্য কোন সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব না হলেও আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে হলে পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

একই সাথে বেঁচে থাকা মানেই সফল হতে হবে এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পরিবারগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। জীবনের শুরু থেকেই সেভাবেই মানুসিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে।

এক্ষেত্রে ধর্মীয় শিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা মানুষকে জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বুঝাতে সক্ষম আর কেউ তাঁর জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন ও শিক্ষিত হলে সে কোনভাবেই আত্মহত্যার পথে অগ্রসর হতে পারে না।

সুতরাং বলাই যায়, আত্মহত্যা প্রতিরোধে পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় সম্মিলিত প্রয়াসের বিকল্প নেই।

লেখক: শিক্ষানবিশ আইনজীবী; ঢাকা ও দিনাজপুর জজ কোর্ট