শফিকুল ইসলাম : বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ মামলা অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছিলো। তবে ২০২৫ সালে ইন্টেরিম গভর্মেন্ট নারী শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ এর মাধ্যমে ধারা ৯খ যুক্ত করে এটি আইনে পরিণত করে। ধারা ৯খ অনুসারে-
যদি কোন ব্যক্তি দৈহিক বলপ্রয়োগ ব্যতীত বিবাহের প্রলোভন দেখাইয়া ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সঙ্গে যৌনকর্ম করেন এবং যদি উক্ত ঘটনার সময় উক্ত ব্যক্তির সহিত উক্ত নারীর আস্থাভাজন সম্পর্ক থাকে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক সাত বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন’।
ধর্ষণের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে পেনাল কোড, ১৮৬০ এর ৩৭৫ ধারা। ৩৭৫ ধারার আলোকে সম্মতি বাহ্যিক সম্মতি বোঝায় না। এটি হতে হবে সক্রিয় ও যুক্তিনির্ভর সম্মতি। যদি সম্মতি misconception of fact বা ভুল ধারণার উপর ভিত্তি করে দেওয়া হয় তবে তা আইনগতভাবে অবৈধ হয়ে যায়। বিয়ের প্রতিশ্রুতিরক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে।
১। মিথ্যা প্রতিশ্রুতি: বিয়ের প্রতিশ্রুতি শুরু হতেই মিথ্যা হতে হবে।
২। সরাসরি সম্পর্ক: এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফলে নারীর যৌন সম্পর্কে সরাসরি লিপ্ত হওয়ার সিদ্ধান্তের সরাসরি সম্পর্ক থাকতে হবে।
প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে আদালতকে সূক্ষ্মভাবে বিচার করতে হবে যে এটি কি কেবল একটি প্রতিশ্রুতি নাকি শুরু থেকেই একটি প্রতারণামূলক কৌশল।
এই বিষয়ে Niam Ahmed vs State [2023 SCC Online SC 89] মামলার সিদ্ধান্তে একই নীতির ব্যক্ত হয়েছে।
2024 INSC 897 মামলায় আদালত নিম্নের মতামত ব্যক্ত করেন-
দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়া এবং এই বাস্তবতা যে অভিযোগকারী সেই পুরো সময়জুড়ে কোনো প্রতিবাদ করেননি, বরং বাধাহীনভাবে শারীরিক সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছিলেন—এই প্রেক্ষাপটে বলা কঠিন যে এই আচরণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায়। অভিযোগকারী নারীর এই দীর্ঘস্থায়ী আচরণ বাস্তবে অপরাধমূলক দায়কে দুর্বল করে দেয়। এটাও সহজে অনুমান করা যায় না যে, দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি—যারা পরিপক্ব—দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্ক বজায় রাখবেন কিন্তু প্রতারণামূলক আচরণ সম্পর্কে কিছুই বুঝতে পারবেন না। যদি সত্যিই বিয়ের প্রতিশ্রুতি মিথ্যা হতো, তাহলে এত দীর্ঘ সময় (প্রায় নয় বছর) অপেক্ষা না করে বিষয়টি অনেক আগেই প্রকাশ পেত। দীর্ঘদিনের সম্মতিপূর্ণ সম্পর্ক পরবর্তীতে ভেঙে গেলে, সেটিকে ফৌজদারি মামলায় রূপান্তর করার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এই প্রবণতা ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল কিনা সেটা হয়তো ম্যাসেজিং দেখে বা অন্য কোনভাবে আদালতে উপস্থাপন করা সম্ভব। কিন্তু শুধু সেই জন্যই শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে কিনা অথবা সেই বিয়ের প্রতিশ্রুতি চাতুরিতাপূর্ণ ছিল কিনা এই বিষয়গুলি অবশ্যই প্রমাণ খুবই জটিল বিষয়। মানুষের মধ্যে যখন প্রেমের সম্পর্ক থাকে তখন অনেক কথাই বলতে পারে। এরমধ্যে আবেগের বশবর্তী হয়ে অনেক কথাই বলা হতে পারে। আবেগের বশে কোন প্রতিশ্রুতি দিলে পরবর্তী সময়ে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় সেটি রক্ষা সম্ভব নাও হতে পারে। এরূপ ক্ষেত্রে উক্ত প্রতিশ্রুতি প্রতারণামূলক ছিল তা বলা পুরো সঠিকও নয়। কিন্তু এই আইনের ফলে উক্ত প্রতিশ্রুতিদাতাও শাস্তি ভোগ করতে পারেন যদিও তার উদ্দেশ্য প্রতারণামূলক ছিল না
এধরণের মামলা সাধারণত কখন করা হয় বা কেন করা হয়?
মূলত এক কথায় বলতে গেলে এধরণের বেশিরভাগ মামলা করা হয় প্রতিশোধ ও হয়রানি করার নিমিত্তে। সাধারণত প্রেমিক-প্রেমিকা যুগলের মধ্যে সম্পর্কের অবসান হলে অর্থাৎ ব্রেকআপ হলে বা লিভটুগেদার থাকাবস্থায় বা পরে কোন ঝামেলা হলে অনেক নারীরা প্রতিশোধের অস্ত্র হিসাবে এটিকে ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে।
উপসংহার
এই আইনে একইভাবে শারীরিক সম্পর্কের পর যদি কোন নারী বিয়ে না করে সেক্ষেত্রে পুরুষকে এই আইন মামলা করার কোন অধিকার প্রদান করেনা।বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক সংক্রান্ত আইন একদিকে নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চায়, অন্যদিকে এর অপব্যবহারের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।বর্তমান যুগে ২০২৫-২০২৬ সালে এসে নারীদেরকে এতটা অবলা দেখানো এবং পুরুষ সমাজকে কোণঠাসা করে বানানো আইন বাস্তবতা বিবর্জিত। এধরণের আইন ন্যায় প্রতিষ্ঠার পরিপন্থী।
প্রথমত, কেউ বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিলে তার সাথে বিয়ের আগে শারীরিক সম্পর্ক করা ধর্মীয় ও বাংলাদেশের সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এই বিষয়টি দেশের সকল নারীই জানেন। বরং এ ধরণের আইন তৈরী করে বিবাহ বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্কের একটি নিরাপত্তা বিধান করা হয়েছে যা পুরোপুরি দেশের ধর্মীয় ও আবহমান বাংলার সামাজিক রীতিনীতি ও মূল্যবোধের সাথে চরম সাংঘর্ষিক। এ ধরণের আইন দেশে ধর্ষণ মামলার সংখ্যা বাড়াবে হয়তো সাজাও বাড়বে। কিন্তু ন্যায়বিচার দিতে পারবে না।
লেখক : আইনজীবী, জেলা ও দায়রা জজ কোর্ট, ঢাকা।

