বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল ‘ভালো ফল বয়ে আনবে না’: মাসদার হোসেন

বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের ফল ভালো হবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিচার বিভাগ পৃথককরণ মামলার বাদী ও সাবেক জেলা জজ মাসদার হোসেন

শনিবার (১১ এপ্রিল) জাতীয় প্রেস ক্লাবে এ দুটি অধ্যাদেশ নিয়ে আয়োজিত এক মুক্ত আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন এবং আইন ও বিচার পত্রিকার উদ্যোগে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল মতিন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক, ব্যারিস্টার ওমর ফারুক, আইনজীবী হাসান তারিক চৌধুরী, সাবেক যুগ্ম জজ ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন এবং জুলাই আন্দোলনের নেতা আরিফ সোহেল প্রমুখ।

মাসদার হোসেন বলেন,

ক্ষমতা আছে বলে কলমের খোঁচায় এতগুলো জিনিস মসনদে বসে বাতিল করে দিচ্ছেন। এই মুহূর্তে হ্যাঁ-না ভোট করুন, জরিপ করুন—৯৯ ভাগ লোক আপনাদের কাজের বিরুদ্ধে মতামত দেবে।

তিনি বলেন, গুমের শিকার হয়ে যারা মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন, তারা আজ সংসদ সদস্য—তাদের জিজ্ঞেস করেই গুমের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, “গুটি কয়েক মানুষের চিন্তাচেতনায় এসব কাজ হচ্ছে। এগুলোর ফল ভালো হবে না। এই দিন দিন না, আরও দিন আছে। আপনারা পথ হারিয়ে ফেললে জনগণ আপনাদের সঠিক পথে নিয়ে আসবে।”

ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে ২৮ জন বিচারকের কাছে আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা চাওয়ার বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, “আজ আইন মন্ত্রণালয় জজদের শোকজ করছে। মনে রাখতে হবে, জজদের একটি আলপিনের প্রয়োজন হলেও সুপ্রিম কোর্টের কাছে যেতে হয়। অথচ আইনমন্ত্রী কোন কর্তৃত্বে এই শোকজ করেছেন?”

আরও পড়ুন : বাংলাদেশ বার কাউন্সিল নির্বাচন ২০২৬: তফসিল, ভোটকেন্দ্র ও প্রার্থী হওয়ার নিয়ম

জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনকারীদের রক্তের ওপর আপনাদের মসনদ বসা। আপনারা এমনি এমনি আসেননি। তাদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করবেন না।”

আলোচনায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল মতিন বলেন, মাসদার হোসেন মামলার রায়ের প্রতিফলন হিসেবেই এই দুটি অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, “আপনারা সেই আইন বাতিল করে দিলেন, বললেন আরও ভালো আইন করবেন। অথচ চাইলে আগে আইন করে পরে সংশোধন করতে পারতেন।”

বিচারপতি আবদুল মতিন আরও মন্তব্য করেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে পারে।

উল্লেখ্য, মাসদার হোসেন বিচার বিভাগ পৃথককরণ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক মামলার বাদী হিসেবে বাংলাদেশে সুপরিচিত। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিচারকদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তার দায়ের করা মামলার মাধ্যমেই দেশের বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা পরে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনে।

‌‘সরকার বনাম মাসদার হোসেন’ মামলার রায় বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ১৯৯৯ সালে আপিল বিভাগ এ মামলায় ১২ দফা নির্দেশনা দেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে পৃথক করা এবং বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। এ রায়ের ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে দেশে কার্যকরভাবে বিচার বিভাগ পৃথক হয়।