আদালতের জামিন আদেশ কার্যকর না করে একজন হাজতিকে প্রায় ২৫ ঘণ্টা অবৈধভাবে আটক রাখার অভিযোগে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে “ন্যায়বিচার দাবি নোটিশ” (Demand of Justice Notice) পাঠানো হয়েছে। চট্টগ্রামে একজন বিচারপ্রার্থী ব্যক্তির পক্ষে দায়ের করা বিচারিক আদেশ লঙ্ঘন ও অবৈধ আটক সংক্রান্ত ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এ নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
মোহাম্মদ শফি নামের এক বন্দির পক্ষে সোমবার (১৩ এপ্রিল ) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও চট্টগ্রাম জজ কোর্টের আইনজীবী মানশ দাস সংশ্লিষ্ট কারা কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে এই নোটিশ প্রদান করেন।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন, জেলার সাইয়েদ শাহ শরীফ, ডেপুটি জেলার মো. রাকিব শেখ ও তৌহিদুল ইসলামকে নোটিশটি পাঠানো হয়েছে।
নোটিশে দাবি করা হয়েছে যে, আদালতের জামিন আদেশ থাকা সত্ত্বেও তাকে বিভিন্ন মামলায় পুনরায় গ্রেপ্তার দেখানো, এবং পরে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী জামিন বন্ড জমা দেওয়ার পরও তাকে নির্ধারিত সময়ে মুক্ত না করে অবৈধভাবে আটক রাখা হয়েছে।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, মোহাম্মদ শফি একজন আইন মেনে চলা নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনের সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী।
অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী—
সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী।
অনুচ্ছেদ ৩১ অনুযায়ী—
প্রত্যেক নাগরিক আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অবিচ্ছেদ্য অধিকার রাখেন; আইন ব্যতীত কারও জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না।
নোটিশে বলা হয়, স্থানীয় একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিরোধিতার কারণে এবং রাউজান থানার কিছু পুলিশ কর্মকর্তার যোগসাজশে মোহাম্মদ শফিকে একাধিক মামলায় জড়ানো হয়।
এসব মামলার মধ্যে রয়েছে—
- রাউজান থানা মামলা নং ১০(১১)২০২৫, জি.আর. কেস নং ২১৯/২০২৫
(দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৭/২৯৫/২৯৫(ক)/৩৭৯/৪৩৫/৪২৭/৫০৬/১১৯ ধারা এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ধারা ৩)
এই মামলায় তাকে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকে কারাগারে প্রেরণ করেন।
পরবর্তীতে—
- রাউজান থানা মামলা নং ১১(১২)২০২৫
(দণ্ডবিধির ৪৪৭/৪৩৬/৪২৭/৩৪ ধারা)
এ মামলাতেও তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
ধারাবাহিকভাবে নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানো
উপরোক্ত দুই মামলায় জামিন পাওয়ার পর ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে তাকে আরও একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়—
- রাউজান থানা মামলা নং ০৮(১১)২০২৫, জি.আর. কেস নং ২১৭/২০২৫
(দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/২৯৫/২৯৫(ক)/৩৭৯/৪৩৬/৪২৭/১০৯ ধারা এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ধারা ৩)
আদালত ওই আবেদন মঞ্জুর করে অন্তর্বর্তীকালীন আটকাদেশ প্রদান করেন।
জামিন ও মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন
পরবর্তীতে ০৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রামের সেশন জজ আদালত ক্রিমিনাল মিসকেস নং ১৩৬০/২০২৬-এ তাকে জামিন প্রদান করেন।
একই দিনে—
- জামিন বন্ড দাখিল করা হয়
- সকল আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়
- বিকাল ৩টা ১৫ মিনিটে (মেমো নং ৯৩৮) কারা কর্তৃপক্ষ জামিননামা গ্রহণ করে
এবং যাচাই করে দেখা যায় যে, তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলায় কোনো ওয়ারেন্ট বা আটকাদেশ তখন বিদ্যমান ছিল না।
এমনকি কারা কর্তৃপক্ষ তাকে মুক্তির জন্য প্রস্তুত তালিকায়ও অন্তর্ভুক্ত করে।
তবুও ২৫ ঘণ্টা আটক!
কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও— ০৫ এপ্রিল ২০২৬ বিকাল ৩টা ১৫ মিনিট থেকে ০৬ এপ্রিল ২০২৬ বিকাল ৪টা ১০ মিনিট পর্যন্ত মোট প্রায় ২৫ ঘণ্টা তাকে কারাগারে আটক রাখা হয়।
নোটিশে বলা হয়, এই আটক—
- সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন
- আদালতের আদেশ অমান্য (Contempt of Court)
- এবং একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ
পরবর্তী প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট
পরবর্তীতে ০৬ এপ্রিল ২০২৬ বিকাল ৪টা ১৪ মিনিটে আরেকটি মামলায় প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট কারাগারে পৌঁছায়—
- রাউজান থানা মামলা নং ০৫(০১)২০২৫, জি.আর. কেস নং ০৫/২৫
(দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৭/২৯৫/৪২৭/৩৭৯/১০৯ ধারা এবং বিস্ফোরক আইনের ধারা ৫)
এরপর ০৭ এপ্রিল আদালত ওই মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন আটকাদেশ দেন।
নোটিশে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে— নোটিশ পাওয়ার ৩ দিনের মধ্যে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা দিতে হবে যে, কোন আইনি ক্ষমতায় ০৫ এপ্রিল বিকাল ৩:১৫ থেকে ০৬ এপ্রিল বিকাল ৪:১০ পর্যন্ত সময়সীমায় মোহাম্মদ শফিকে আটক রাখা হয়েছিল।
অন্যথায়, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং সকল দায়-দায়িত্ব ও খরচ তাদের বহন করতে হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

