নিজস্ব প্রতিবেদক : অর্থঋণ আদালতের একতরফা ডিক্রি বাতিলের আবেদন করতে হলে ডিক্রি প্রদানের তারিখ অথবা ডিক্রি সম্পর্কে অবগত হওয়ার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে হবে। পাশাপাশি আবেদন দাখিলের পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা দেওয়ার শর্তও পূরণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করে এই অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ আদালতের নেই বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
উত্তরা ব্যাংক লিমিটেডের দায়ের করা ঋণ আদায়ের মামলায় একতরফা ডিক্রি বাতিলের আবেদন ও পরবর্তী কার্যক্রমসংক্রান্ত এক রিভিশন মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ এ সিদ্ধান্ত দেন। একই সঙ্গে আদালত রুল খারিজ করে দেন এবং আগে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেন। অর্থঋণ আদালতকে ২০১৬ সালে দায়ের করা ডিক্রি জারির মামলার কার্যক্রম আর বিলম্ব না করে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগও দিয়েছেন আদালত।
বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান ও বিচারপতি উর্মী রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের দ্বৈত বেঞ্চ ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট এ রায় দেন। দেওয়ানি রিভিশন মামলা নম্বর ৪১৬১/২০১৬-তে আবেদনকারী ছিলেন মো. মনির চৌধুরী এবং প্রতিপক্ষ উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড। সম্প্রতি এই রায়ের পুর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
ঋণ আদায়ে একতরফা ডিক্রি
মামলার নথি অনুযায়ী, উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড ঢাকার চতুর্থ অর্থঋণ আদালতে ২০১৫ সালে ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ১৯ পয়সা আদায়ের দাবিতে অর্থঋণ মামলা দায়ের করে। ব্যাংকের দাবি ছিল, বিবাদী নম্বর ২ মো. মনির চৌধুরী বিবাদী নম্বর ১ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী হিসেবে জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে ১২ লাখ টাকা ঋণসুবিধা গ্রহণ করেন। ঋণ মঞ্জুরিপত্রের শর্ত অনুযায়ী টাকা পরিশোধ না করায় ব্যাংক বন্ধক রাখা সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা করেও সফল হয়নি। ২০১৫ সালের ২৩ মার্চ পর্যন্ত সুদসহ তাঁর ঋণদায় দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ১৯ পয়সা।
অন্যদিকে, লিখিত জবাবে মনির চৌধুরী ব্যাংকের আরজির গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য অস্বীকার করেন। তিনি নিজেকে ঘড়ির ব্যবসায়ী উল্লেখ করে দাবি করেন, ব্যাংকের কাছ থেকে মঞ্জুর করা ১২ লাখ টাকার পুরো সুবিধা তিনি পাননি; বরং ঘুষ দেওয়ার কারণে এর ছয় ভাগের চার ভাগের সমপরিমাণ ঋণসুবিধা পেয়েছিলেন। তাঁর আরও দাবি ছিল, প্রাপ্ত ঋণের অর্ধেক ইতোমধ্যে পরিশোধ করেছেন।
পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি অর্থঋণ আদালত মামলাটিতে একতরফা ডিক্রি দেন। ডিক্রিটি ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রস্তুত করা হয়।
ডিক্রি বাতিলের আবেদন ও আপিল খারিজ
একতরফা ডিক্রি বাতিল এবং মূল মামলা পুনরুজ্জীবিত করার জন্য মনির চৌধুরী ২০১৬ সালের ৩০ মে অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯(২) ধারায় বিবিধ মামলা দায়ের করেন। মূল মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার আবেদন জানিয়ে তিনি ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা দেওয়ার অঙ্গীকারও করেন।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা না দেওয়ায় অর্থঋণ আদালত তাঁর আবেদন গ্রহণ করেনি। ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই এবং পরবর্তী সময়ে ২০ জুলাই এ বিষয়ে আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।
এরপর তিনি ঢাকার জেলা জজ আদালতে বিবিধ আপিল মামলা নম্বর ১৮৭/২০১৬ দায়ের করেন। জেলা জজ ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট আপিলটি খারিজ করে দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, আবেদনকারী বিবিধ মামলায় কিংবা আপিলে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা দেননি; ফলে আপিলটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
এরপর জেলা জজের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করেন মনির চৌধুরী।
হাইকোর্টে দুই পক্ষের বক্তব্য
আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী মো. তৌহিদুল ইসলাম যুক্তি দেন, হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী তাঁর মক্কেল ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা দিয়েছেন। তাই একতরফা ডিক্রি বাতিল করে তাঁকে মূল মামলা মোকাবিলার সুযোগ দেওয়া উচিত। তাঁর বক্তব্য ছিল, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯(২) ও ১৯(৩) ধারায় উল্লিখিত সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয়; বরং নির্দেশনামূলক। যথাযথ ক্ষেত্রে আদালত ১০ শতাংশ অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে আবেদন গ্রহণ করতে পারে।
এ বক্তব্যের সমর্থনে আবেদনকারীর আইনজীবী Begum Sultana Mazid and others Vs Syedul Islam, Afsaruddin Ahmed Vs Banque Indosuez এবং Fazlul Huq Vs Md Tohed Ali and others মামলার নজির উপস্থাপন করেন।
অন্যদিকে, উত্তরা ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী মো. জহিরুল মোমেনীন যুক্তি দেন, একতরফা ডিক্রি বাতিলের আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে দায়ের করা হয়নি এবং আবেদন দাখিলের পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যেও ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা দেওয়া হয়নি। ফলে আইনে নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হওয়ায় অর্থঋণ আদালতের আবেদন মঞ্জুর করার কোনো সুযোগ ছিল না।
অর্থঋণ আদালত আইনের ১৯ ধারায় কী বলা আছে
হাইকোর্ট অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯ ধারার বিধান বিশ্লেষণ করে বলেন, মামলার নির্ধারিত তারিখে বিবাদী অনুপস্থিত থাকলে আদালত একতরফা ডিক্রি দিতে পারে। সেই ডিক্রি বাতিলের আবেদন করতে হলে ডিক্রি প্রদানের তারিখ অথবা ডিক্রি সম্পর্কে অবগত হওয়ার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে হবে।
একই ধারার ১৯(৩) উপধারা অনুযায়ী, আবেদন দাখিলের পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ পরিমাণ টাকা নির্ধারিত পদ্ধতিতে জমা দিতে হবে। ১৯(৪) উপধারায় বলা হয়েছে, নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে ১০ শতাংশ অর্থ জমা দেওয়া হলে আবেদন মঞ্জুর, একতরফা ডিক্রি বাতিল এবং মূল মামলা আগের নম্বর ও নথিতে পুনরুজ্জীবিত হবে। অন্যদিকে, ১৯(৫) উপধারা অনুযায়ী, নির্ধারিত অর্থ জমা দিতে ব্যর্থ হলে আবেদন সরাসরি খারিজ হবে।
সময়সীমার বাইরে অর্থ জমার সুযোগ নেই
হাইকোর্ট বলেন, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ একটি বিশেষ আইন। একতরফা ডিক্রি বাতিলের জন্য এ আইনে নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও শর্ত দেওয়া আছে। তাই ১৯(২) ও ১৯(৩) ধারায় নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ নেই।
রায়ে Pubali Bank Ltd Vs Bangladesh and others মামলার নজির উল্লেখ করে বলা হয়, আইনের ১৯(২) ও ১৯(৩) ধারা পরস্পর সম্পূরক এবং একসঙ্গে পড়তে হবে। একতরফা ডিক্রি বাতিলের আবেদন করতে হলে উভয় ধারার শর্তই পূরণ করা আবশ্যক। নির্ধারিত সময়সীমার শর্ত অথবা ১০ শতাংশ অর্থ জমার শর্তের যেকোনো একটি পূরণ না হলে অর্থঋণ আদালতের আবেদন বিবেচনার সুযোগ থাকে না।
আদালত Osman Gazi Chowdhury Vs Artha Rin Adalat মামলার পর্যবেক্ষণও উল্লেখ করেন। সেখানে ১০ শতাংশ অর্থ জমার পরিমাণ, আবেদন করার সময়সীমা এবং নগদ অর্থ, ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার বা অন্য গ্রহণযোগ্য বিনিময় দলিলের মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ বিবেচনায় নিয়ে শর্তগুলোকে আবেদনকারীর জন্য পালনযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এ ছাড়া Prime Global Limited and others Vs Sonali Bank Limited and others মামলায় আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেন, একতরফা ডিক্রি বাতিলের আবেদন ডিক্রির তারিখ বা ডিক্রি সম্পর্কে জানার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে করতে হবে এবং আবেদন দাখিলের পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমা দিতে হবে।
দেওয়ানি কার্যবিধির নজির প্রযোজ্য নয়
আবেদনকারীর আইনজীবী যেসব মামলার নজির উপস্থাপন করেন, হাইকোর্ট সেগুলোকে বর্তমান মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে বিবেচনা করেন। আদালতের মতে, ওই সিদ্ধান্তগুলো দেওয়ানি কার্যবিধির অধীনে দেওয়া হয়েছিল, বিশেষ আইন অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর অধীনে নয়। তাই সেগুলোর সঙ্গে বর্তমান মামলার আইনগত পরিস্থিতির পার্থক্য রয়েছে।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, অর্থঋণ আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ডিক্রি ছাড়া অন্য আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ২০ ধারায় নেই। সে বিবেচনায় জেলা জজ আদালতে দায়ের করা বিবিধ আপিলটিও আইনগত ভুল ধারণার ভিত্তিতে করা হয়েছিল বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সব দিক বিবেচনা করে হাইকোর্ট আবেদনকারীর রিভিশন মামলায় জারি করা রুল খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে আগে দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। মামলায় খরচের বিষয়ে কোনো আদেশ দেননি আদালত।
রায়ে অর্থঋণ আদালতকে ২০১৬ সালে দায়ের করা অর্থঋণ জারি মামলার কার্যক্রম আর বিলম্ব না করে এগিয়ে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। আদালত অবিলম্বে রায় ও আদেশ সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানোর নির্দেশও দেন।
এ রায়ে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন, অর্থঋণ আদালতের একতরফা ডিক্রি বাতিলের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সীমা এবং ডিক্রিকৃত অর্থের ১০ শতাংশ জমার শর্ত পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বিশেষ আইনে নির্ধারিত এসব শর্ত উপেক্ষা করে পরে অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

