লইয়ার্স ক্লাব ডেস্ক: বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে মামলার নথি (Case Records) যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে উপস্থাপন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অনিয়ম, গাফিলতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি উঠেছে।
এ প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্র্যাকটিসরত আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের নিকট একটি আইনি নোটিশ প্রেরণ করেছেন। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল ২০২৬) রেজিস্টার্ড এ/ডি (Registered A/D) যোগে এ নোটিশ পাঠানো হয়।
নোটিশে বলা হয়েছে, একটি মামলার কার্যকর শুনানি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি নির্ধারিত সময়ে আদালতে উপস্থিত থাকার উপর। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুনানির দিন ফাইল আদালতে পৌঁছায় না। ফলে মামলার নথি অনুপস্থিত থাকায় মাননীয় বিচারপতিরা শুনানি নিতে পারেন না এবং মামলাগুলো বারবার মুলতবি করতে বাধ্য হন। এতে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নোটিশে সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট বিভাগ) রুলস, ১৯৭৩ এর Chapter-IVA, Rule-08 উল্লেখ করে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ অফিসারকে প্রতিদিন বিকাল ৩টার মধ্যে রিকুইজিশনে স্বাক্ষর করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট শাখা বা সেকশনকে পরদিন সকাল ৯:৩০টার মধ্যে মামলার নথি সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে পাঠাতে হবে। একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট রুলস, ১৯৬৬ এর Rule-06 অনুযায়ী আদালতের অনুমতি ছাড়া কোনো নথি আদালতের হেফাজতের বাইরে নেওয়া যাবে না এবং Rule-07 অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় রিকুইজিশনের ভিত্তিতে নথি প্রেরণ করতে হবে।
এছাড়া Employees (Discipline & Appeal) Rules, 1983 অনুযায়ী দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণ এবং নিয়ম অমান্য করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়। রেজিস্ট্রার জেনারেলের দপ্তর থেকে একাধিক সার্কুলার ও অফিস আদেশ জারি করা হলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন : প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে আশফাকুল ইসলাম
নোটিশে বলা হয়, ফাইল প্রেরণে অযৌক্তিক বিলম্ব করা হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ফাইল “গায়েব” বা “খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না” বলে জানানো হয়। ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা তদবির ছাড়া ফাইল এগোয় না। এমনকি অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ অর্থ লেনদেন ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ফাইল বেঞ্চে পাঠানো হয় না।
নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা। কিছু বেঞ্চ অফিসার ও সেকশন স্টাফ “স্পিড মানি” দাবি করে এবং ফাইল দ্রুত পাঠানোর জন্য অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রদানের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে একটি অস্বচ্ছ ও অনৈতিক পরিবেশ গড়ে উঠেছে, যা বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই পরিস্থিতির কারণে আইনজীবীরা তাদের মূল পেশাগত কাজ—আইন গবেষণা, ড্রাফটিং এবং যুক্তি উপস্থাপন—থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন। ফাইল সংগ্রহ ও অনুসরণে সময় ব্যয় করতে হচ্ছে, ফলে পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। অন্যদিকে বিচারপ্রার্থীদের বারবার আদালতে এসে ফিরে যেতে হচ্ছে, যার ফলে সময়, অর্থ ও মানসিক শক্তির অপচয় ঘটছে এবং ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে।
নোটিশে বলা হয়, সময়মতো ফাইল আদালতে না পৌঁছানো মামলার জট বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক মামলা মাসের পর মাস কজ লিস্টে থাকলেও শুনানি শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে বিচারব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। একইসঙ্গে আদালতের প্রশাসনিক দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, বিচারব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা কমছে এবং আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নোটিশে বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ ও ৩৫(৩) উল্লেখ করে বলা হয়, জীবনের অধিকার মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়, বরং ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তাও এর অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের দ্রুত ও উন্মুক্ত বিচারের অধিকার রয়েছে। কিন্তু মামলার নথি অনুপস্থিত থাকায় শুনানি না হওয়া এই মৌলিক অধিকারকে সরাসরি ব্যাহত করছে।
আরও পড়ুন : আবু সাঈদ হত্যায় দুই পুলিশ সদস্যর মৃত্যুদণ্ড, ২৮ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড
উল্লেখ করা হয়, একই বিষয়ে ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর রেজিস্ট্রার জেনারেলের নিকট লিখিত আবেদন করা হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এতে বোঝা যায়, সমস্যাটি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ অবগত থাকলেও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হচ্ছে।
নোটিশে সকল সার্কুলার ও অফিস আদেশ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, ফাইল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং ঘুষ ও অনিয়ম বন্ধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
নোটিশে ৭ (সাত) দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে।
এতে আরও বলা হয়, বিচারব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, বরং তার কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য। মামলার নথি প্রেরণের মতো একটি মৌলিক প্রশাসনিক বিষয় অবহেলিত হলে পুরো বিচারব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়তে পারে।
এ অবস্থায় দ্রুত, দৃশ্যমান এবং কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণই হতে পারে একমাত্র সমাধান বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

