বাংলাদেশে জমি ক্রয় বা উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা পাওয়ার পর শুধু দলিল রেজিস্ট্রি করলেই মালিকানার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয় না। সরকারি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে নামজারি বা মিউটেশন করাও প্রয়োজন। এবার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে ভূমি মন্ত্রণালয়।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা না হলে কোনো ওয়ারিশের নামে আলাদা খতিয়ান করা যাবে না। মৃত ব্যক্তির সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে যৌথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রত্যেক ওয়ারিশের প্রাপ্য হিস্যাও সেখানে উল্লেখ থাকবে।
এ ক্ষেত্রে যৌথ নামজারির জন্য আলাদা কোনো বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজন হবে না। তবে ওয়ারিশরা নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত আপস-বণ্টননামা বা বণ্টননামা দলিল থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্যবস্থায় উত্তরাধিকারী জমির ক্ষেত্রে ‘আগে যৌথ, পরে আলাদা’ নীতি চালু হয়েছে। এর ফলে সরকারি রেকর্ডে প্রকৃত মালিকদের নাম নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ওয়ারিশদের মধ্যে বিরোধ ও প্রতারণা কমতে পারে।
নামজারি কী এবং কেন জরুরি?
জমি কেনা কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা পাওয়ার পর সরকারি রেকর্ড বা খতিয়ানে আগের মালিকের পরিবর্তে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াই নামজারি বা মিউটেশন।
জমির দলিল রেজিস্ট্রি মালিকানা হস্তান্তরের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলেও সরকারি ভূমি রেকর্ডে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত না করলে ভবিষ্যতে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে। রেকর্ডে নাম না থাকলে অন্য ওয়ারিশ বা অবৈধ দখলদার জমির ওপর দাবি তুলতে পারেন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমিসেবা পোর্টালের মাধ্যমে বর্তমানে অনলাইনে নামজারির আবেদন করা যায়। নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও ফি অনুসরণ করে নামজারির আবেদন সাধারণত ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির লক্ষ্য রয়েছে। তবে কাগজপত্র অসম্পূর্ণ থাকলে কিংবা জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে বেশি সময় লাগতে পারে।
উত্তরাধিকারী জমিতে নতুন নিয়ম
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনের পরিবর্তিত নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারিতে সব ওয়ারিশকে একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
আগে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির পাঁচ ওয়ারিশের মধ্যে একজন নিজের নামে আলাদা নামজারি করে নেওয়ার সুযোগ পেতেন। নতুন ব্যবস্থায় এভাবে একজনের নামে আলাদা নামজারি করার পরিবর্তে সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে যৌথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তাদের ‘কো-শেয়ারার’ হিসেবে দেখানো হবে এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ বা হিস্যা উল্লেখ থাকবে।
যৌথ নামজারির আবেদনের সময় সব ওয়ারিশের তথ্য, ওয়ারিশ সনদ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে হবে। কোনো বৈধ ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে আবেদন নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ওয়ারিশ সনদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র অথবা সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কমিশনারের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হবে।
বণ্টননামা না থাকলেও যৌথ নামজারি
নতুন নিয়মের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শুধু বণ্টননামা না থাকার কারণে যৌথ নামজারির আবেদন নামঞ্জুর করা যাবে না।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসানের মতে, আগে অনেক ক্ষেত্রে এক বা দুইজন ওয়ারিশ অন্যদের বাদ দিয়ে জমি নিজের নামে নামজারি করে নেওয়ার চেষ্টা করতেন। নতুন ব্যবস্থায় সব ওয়ারিশকে একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে এ ধরনের সুযোগ কমবে।
তিনি বলেন, “আগে অনেক ভূমি অফিস বণ্টননামা না থাকলে যৌথ নামজারিও নামঞ্জুর করত। এখন মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, শুধু এই কারণে আবেদন বাতিল করা যাবে না।”
আইনজীবী ইশরাত হাসানের মতে, এর ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির রেকর্ড হালনাগাদ করা সহজ ও দ্রুত হবে এবং বণ্টননামা না থাকার কারণে সাধারণ মানুষের হয়রানিও কমবে।
আলাদা খতিয়ান করতে হলে নিবন্ধিত বণ্টননামা
উত্তরাধিকারীরা যদি জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে প্রত্যেকে যার যার অংশ বুঝে নিতে চান, তাহলে নিবন্ধিত বণ্টননামা করতে হবে।
অংশীদাররা নিজেদের মধ্যে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে সম্পত্তির অংশ নির্ধারণ করে সেটি সরকারিভাবে নিবন্ধন করলে সেই দলিলকে নিবন্ধিত বণ্টননামা বা আপস-বণ্টননামা বলা হয়।
নিবন্ধিত বণ্টননামা থাকলে প্রত্যেক ওয়ারিশের নামে পৃথক নামজারি করে আলাদা খতিয়ান করা যাবে। একইভাবে পৃথকভাবে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে চাইলে আলাদা খতিয়ানের প্রয়োজন হবে।
অর্থাৎ উত্তরাধিকারী জমির নামজারিতে এখন দুটি পথ রয়েছে।
প্রথমত, যৌথ নামজারি: কোনো বণ্টন না হলে সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে থাকবে এবং প্রত্যেকের হিস্যা উল্লেখ থাকবে।
দ্বিতীয়ত, পৃথক নামজারি: নিবন্ধিত বণ্টননামা অনুযায়ী প্রত্যেক ওয়ারিশ নিজ নিজ নামে পৃথক খতিয়ান করতে পারবেন।
নামজারি ছাড়া জমি রেজিস্ট্রি, দান বা হেবা নয়
নামজারি বা খতিয়ান ছাড়া জমি কেনাবেচা, দান কিংবা হেবা করা যাবে না বলে নতুন ব্যবস্থায় বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। ফলে জমি নিবন্ধনের সময় সংশ্লিষ্ট খতিয়ান দেখানোর প্রয়োজন হবে।
তবে আগে থেকেই কারও নামে নামজারি সম্পন্ন হয়ে থাকলে আবার নতুন করে নামজারি করতে হবে না। উদাহরণ হিসেবে, কোনো জমির নামজারি ২০১৫ সালে সম্পন্ন হয়ে থাকলে এবং সংশ্লিষ্ট খতিয়ানে মালিকের নাম সঠিকভাবে রেকর্ড করা থাকলে পুনরায় নামজারি করার প্রয়োজন নেই।
তবে বিশেষজ্ঞরা পুরোনো রেকর্ড অনলাইনে যাচাই করে ডিজিটাল সিস্টেমে সঠিকভাবে সংরক্ষিত আছে কি না, তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ ডিজিটাল রেকর্ডে তথ্য না থাকলে ভবিষ্যতে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ কিংবা জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
নামজারি করতে যেসব কাগজপত্র লাগবে
নামজারির আবেদনের ক্ষেত্রে সাধারণত জমির রেজিস্ট্রি দলিল বা দলিলের কপি, আগের খতিয়ানের তথ্য, দাগ নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাগজপত্র দিতে হয়।
উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা পেলে ওয়ারিশ সনদ ও মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদও প্রয়োজন হবে। নির্ধারিত ফি পরিশোধের রসিদও আবেদনের সঙ্গে দিতে হবে।
জমি নিয়ে মামলা, বিরোধ বা কাগজপত্রে অসঙ্গতি থাকলে নামজারি নিষ্পত্তিতে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।
নতুন নিয়মের সম্ভাব্য সুফল
বিশেষজ্ঞরা নামজারির নতুন নিয়মের কয়েকটি বড় সুফল দেখছেন।
প্রথমত, কোনো একজন ওয়ারিশ অন্যদের বাদ দিয়ে পুরো সম্পত্তি নিজের নামে রেকর্ড করে নেওয়ার সুযোগ কমবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি রেকর্ডে প্রকৃত মালিকদের নাম অন্তর্ভুক্ত হবে। ফলে জমির মালিকানা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সহজ হবে।
তৃতীয়ত, উত্তরাধিকারী জমি নিয়ে বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমা কমতে পারে। কারণ যৌথ খতিয়ানে সব ওয়ারিশের নাম ও হিস্যা উল্লেখ থাকবে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসানের মতে, নতুন ব্যবস্থায় বণ্টননামা না থাকার অজুহাতে যৌথ নামজারি প্রত্যাখ্যানের সুযোগ কমবে এবং ওয়ারিশদের মালিকানার হিস্যাও সরকারি রেকর্ডে স্পষ্ট থাকবে।
তিনি বলেন, “বণ্টননামা না থাকার অজুহাতে যৌথ নামজারি প্রত্যাখ্যান এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ করে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির রেকর্ড হালনাগাদ সহজ করতেই এই নির্দেশনা।”
নারী ওয়ারিশদের অধিকার রক্ষায় সহায়ক হতে পারে
ভূমি আইনজীবীদের মতে, নতুন নিয়মটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারী ওয়ারিশদের অধিকার রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফাহমিদা আখতার বলেন, অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের বাবা-মায়ের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার প্রবণতা দেখা যায় এবং এ ধরনের বিরোধ থেকেই অনেক মামলা তৈরি হয়।
তার মতে, নতুন নিয়মে সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে কাউকে বাদ দেওয়ার সুযোগ কমবে।
তিনি বলেন, “যদি আনুষ্ঠানিকভাবে বণ্টননামা করা হয় তাহলে পরে সেটিকে আলাদা খতিয়ানে আনা যাবে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে যেটা হবে, সবার নামে একটা জয়েন্ট মিউটেশন হবে।”
ব্যারিস্টার ফাহমিদা আখতারের মতে, আগে জয়েন্ট মিউটেশনের বিষয়টি যথাযথভাবে না থাকায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাই-বোনদের না জানিয়ে একজন ওয়ারিশ নিজের নামে পুরো সম্পত্তি রেকর্ড করে নেওয়ার সুযোগ পেতেন। নতুন ব্যবস্থায় সেই সুযোগ কমবে।
বাস্তবায়নে রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও
নতুন নিয়মের সুফলের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
অনেক পরিবারের কোনো ওয়ারিশ বিদেশে থাকেন কিংবা দীর্ঘদিন যোগাযোগের বাইরে থাকেন। ফলে সব ওয়ারিশের কাগজপত্র একসঙ্গে সংগ্রহ করে যৌথ নামজারির আবেদন করা কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে পৃথক খতিয়ান করতে হলে নিবন্ধিত বণ্টননামা করতে হবে। এতে অতিরিক্ত সময় ও খরচের প্রয়োজন হবে।
এ ছাড়া নির্ধারিত ২৮ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে নামজারি নিষ্পত্তি করতে হলে তহশিল অফিস এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে পর্যাপ্ত জনবল ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জমি কেনার পর দ্রুত নামজারির পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা জমি কেনার পর দীর্ঘদিন অপেক্ষা না করে নামজারি করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, দলিল রেজিস্ট্রির ৯০ দিনের মধ্যে নামজারির আবেদন করা ভালো।
আর উত্তরাধিকারী জমির ক্ষেত্রে পরিবারের সব ওয়ারিশকে নিয়ে যৌথভাবে নামজারি করা নিরাপদ। পরবর্তীতে প্রয়োজন হলে নিবন্ধিত বণ্টননামার মাধ্যমে পৃথক খতিয়ান করা যাবে।
সব মিলিয়ে, উত্তরাধিকারী জমির ক্ষেত্রে ‘আগে যৌথ, পরে আলাদা’ নীতির মাধ্যমে সরকারি ভূমি রেকর্ডে প্রকৃত মালিকদের স্বীকৃতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই উদ্যোগ ওয়ারিশদের মধ্যে বিরোধ ও প্রতারণা কমানোর পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে পারে।

