বিচারের নামে অবিচার বন্ধ হোক

সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন, ২০২৬: আইন ও শরিয়াহর তুলনামূলক পর্যালোচনা

মুহাম্মদ ইয়াসিন তাহা : একজন বাবা সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটি বাড়ি তৈরি করেন। তিনি সেই বাড়ি সন্তানদের দিয়ে দেন। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে এসে তিনি আর সেই বাড়িতে থাকতে পারেন না। সন্তানরা বাড়িটি বিক্রি করে দেয়। ফলে বাবা অসহায় ও দরিদ্র হয়ে পড়েন। একজন মা তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তি ছেলেদের দিয়ে দেন। কিন্তু ছেলেরা তার দেখাশোনা করে না। শেষ পর্যন্ত সেই মা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে গিয়ে আশ্রয়ের জন্য অনুরোধ করেন। আমাদের সমাজে এ ধরনের ঘটনা এখন আর বিরল নয়।

এ কারণেই একজন বাবা হয়তো তার একমাত্র বাড়িটি সন্তানদের দিয়ে দিতে চান, কিন্তু একই সঙ্গে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই বাড়িতে থাকার অধিকারও ধরে রাখতে চান। একজন মা হয়তো তার জমি সন্তানদের দিয়ে দিতে চান, কিন্তু জীবনের বাকি সময় ওই জমি থেকে পাওয়া অর্থ বা আয় ভোগ করতে চান। একজন স্বামী হয়তো তার সম্পত্তি স্ত্রীকে দিয়ে দিতে চান, কিন্তু একই সঙ্গে জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার নিজের কাছে রাখতে চান।

প্রশ্ন হলো, এমন কোনো ব্যবস্থা কি আইন তৈরি করতে পারে, যেখানে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর হবে, কিন্তু দাতা তার আজীবন নিরাপত্তা ও সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার হারাবেন না?

বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম। কিন্তু ইসলামী আইন পূর্ণাঙ্গভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় মুসলিম বাবা-মায়ের অধিকার সবসময় শুধু ইসলামী আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত করা সম্ভব হয় না। ইসলামী বিধানও অন্যান্য অনেক আইনি বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ইসলামী ন্যায়বিচারের কাঠামো যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত না থাকলে শুধু একটি ইসলামী বিধান প্রয়োগ করে সব সামাজিক সমস্যার সমাধান করা সবসময় সম্ভব নয়।

এই বাস্তব সমস্যার একটি আইনি সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেছে Transfer of Property (Amendment) Act, 2026। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এ প্রস্তাবিত ১২২A ও ১২২B ধারা সম্পত্তি হস্তান্তরের পাশাপাশি দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগের অধিকার সংরক্ষণের জন্য একটি নতুন ও পৃথক ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা বলছে।

প্রস্তাবিত ১২২A(১) ধারায় একজন দাতা অস্থাবর বা স্থাবর সম্পত্তি দান করতে পারবেন, একই সঙ্গে জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন। ১২২A(২) অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা বাবা-মা ও সন্তান, দাদা-দাদি/নানা-নানি ও নাতি-নাতনি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রযোজ্য হতে পারে। স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক।

১২২A(৩) ধারায় বলা হয়েছে, দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলেও সম্পত্তি ভোগের ক্ষেত্রে দাতার অধিকার বহাল থাকবে। ১২২A(৪) ধারা স্পষ্ট করে যে, এটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি পৃথক পদ্ধতি এবং এর মাধ্যমে প্রচলিত Gift, Heba বা অন্য কোনো বৈধ হস্তান্তরের বৈধতা সীমিত বা ক্ষুণ্ন হবে না।

অন্যদিকে, ১২২B ধারার অধীনে নিবন্ধনের পর সাধারণভাবে এই দান প্রত্যাহারযোগ্য হবে না। তবে প্রকৃত আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষাগত বা পারিবারিক প্রয়োজনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে তা পরিবর্তন বা বাতিল করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে জেলা জজের অনুমতিতেও তা করা যেতে পারে।

এখন আমরা সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীকে ঘিরে চলমান গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের একটি পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি। এখানে একটি প্রবণতা ক্রমশ দেখা যাচ্ছে, যেখানে প্রচলিত আইনের অধীনে Gift এবং মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীনে Heba-কে একই বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এখানেই আমাদের একটু থামা প্রয়োজন।

Gift ও Heba অভিন্ন নয়। তবে তারা একেবারেই সম্পর্কহীনও নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৬ সালের সংশোধনী Heba-কে সংস্কার, সীমিত বা সংকুচিত করার কোনো প্রচেষ্টা নয়। বরং এটি সম্পত্তি আইনের অধীনে একটি নতুন ও পৃথক আইনি ব্যবস্থা তৈরি করছে। এই পার্থক্যটি উপেক্ষা করা হলে বিতর্ক হয়তো আরও জোরালো হবে, কিন্তু সমাধান দুর্বল হয়ে পড়বে।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর সপ্তম অধ্যায়ে Gift বা দানসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। ১২২ ধারায় Gift বলতে কোনো বিদ্যমান স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি কোনো বিনিময়মূল্য ছাড়া স্বেচ্ছায় হস্তান্তরকে বোঝানো হয়েছে, যা গ্রহীতা বা তার পক্ষে অন্য কেউ গ্রহণ করবে। সুতরাং একটি বিদ্যমান সম্পত্তি, স্বেচ্ছায় হস্তান্তর, বিনিময়মূল্যের অনুপস্থিতি এবং গ্রহীতার গ্রহণ—এসবই প্রচলিত আইনের অধীনে Gift-এর মূল উপাদান।

স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে ১২৩ ধারা অনুযায়ী দাতার বা তার পক্ষে স্বাক্ষরিত এবং অন্তত দুইজন সাক্ষী দ্বারা সত্যায়িত একটি নিবন্ধিত দলিল প্রয়োজন।

অন্যদিকে, মুসলিম আইনে Heba হলো কোনো বিনিময়মূল্য ছাড়া একজন দাতার কাছ থেকে গ্রহীতার কাছে সম্পত্তির মালিকানা স্বেচ্ছায় হস্তান্তর। মুসলিম আইনের অধীনে দাতার বৈধ মালিকানা ও আইনগত সক্ষমতা থাকতে হবে এবং গ্রহীতাকে হস্তান্তর গ্রহণ করতে হবে। সম্পত্তিটি হতে হবে নির্দিষ্ট, বিদ্যমান, হস্তান্তরযোগ্য এবং দাতার মালিকানাধীন।

Heba-এর প্রচলিত উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইজাব ও কবুল, পক্ষগুলোর আইনগত সক্ষমতা, সম্পত্তির সুনির্দিষ্ট পরিচয়, বিনিময়মূল্যের অনুপস্থিতি এবং দখল হস্তান্তর বা Qabd। মুসলিম আইনে Heba সম্পন্ন হয়েছে কি না তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে Qabd বা দখল হস্তান্তর ঐতিহ্যগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে আসে। প্রচলিত আইনের অধীনে Gift-এর ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হতে পারে, রাষ্ট্রীয় আইনের নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক শর্ত অনুযায়ী হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে কি না। কিন্তু Heba-এর ক্ষেত্রে মুসলিম আইনের মৌলিক শর্তগুলো পূরণ হয়েছে কি না, বিশেষ করে যেখানে প্রয়োজন সেখানে দখল হস্তান্তর হয়েছে কি না—সেটিও বিবেচ্য হতে পারে।

দুই ব্যবস্থার প্রশ্ন কখনো একই ফলাফলে পৌঁছাতে পারে, কিন্তু তাদের আইনি উৎস এক নয়। একটি বিষয় ফিকহগত বৈধতার সঙ্গে সম্পর্কিত, অন্যটি রাষ্ট্রীয় আইনের আনুষ্ঠানিকতা ও প্রমাণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই পার্থক্য উপেক্ষা করলেই এমন ধারণা তৈরি হয় যে Heba এবং Gift একই লেনদেনের দুটি নাম মাত্র।

কোরআনে আধুনিক সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের মতো করে Heba-এর কোনো কারিগরি বা বিস্তারিত সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। বরং কোরআন দানের নৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। মানুষকে তাদের প্রিয় সম্পদ থেকে ব্যয় করতে, আত্মীয়স্বজন, এতিম, দরিদ্র ও মুসাফিরদের সহায়তা করতে এবং যারা কোনো অধিকারের অধিকারী তাদের অধিকার পূরণ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।

এসব আয়াত Heba-এর কারিগরি সংজ্ঞা নয়; বরং ইসলাম ও সম্পত্তির মধ্যকার নৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি নির্ধারণ করে। Heba-এর কারিগরি বিধান পরবর্তীতে সুন্নাহ এবং মুসলিম ফকিহদের রচনার মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সঃ) সন্তানদের মধ্যে দানের ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতার শিক্ষাও দিয়েছেন। নুমান ইবনে বশীর (রা.)-এর সুপরিচিত ঘটনায় একজন বাবা তার এক সন্তানকে বিশেষভাবে একটি উপহার দিলে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কি তার সব সন্তানকে একইভাবে দিয়েছেন? এরপর তিনি তাকে আল্লাহকে ভয় করতে এবং সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে নির্দেশ দেন।

একই সঙ্গে রাসুলুল্লাহ ﷺ উপহার দিয়ে তা পুনরায় ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন। এসব শিক্ষা থেকে বোঝা যায়, একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় তার সম্পত্তি নিয়ে যথেষ্ট স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও সেই স্বাধীনতা নৈতিক দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। অবশ্য মুসলিম ফিকহের বিস্তারিত বিধান ও ব্যতিক্রমগুলো আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশের আইনগত অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937-এর ২ ধারার অধীনে মুসলমানদের মধ্যে Gift বা দানসংক্রান্ত বিষয়ে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন প্রযোজ্য, তবে সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামো ও ব্যতিক্রমগুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।

একই সঙ্গে Registration Act, 1908-এর ১৭(১)(aa) ধারা মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীনে Heba-এর ঘোষণার নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান আইনি ব্যবস্থায় Heba-কে কেবল একটি ধর্মীয় বা মৌখিক ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না; প্রযোজ্য আইনগত আনুষ্ঠানিকতাও বিবেচনা করতে হবে।

একজন মুসলিম তার পরিস্থিতি এবং আইনগত শর্ত অনুযায়ী Heba, প্রচলিত Gift অথবা ২০২৬ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে প্রস্তাবিত নতুন আইনি ব্যবস্থার সাহায্যে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন, যেখানে তিনি জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার সংরক্ষণ করবেন। এগুলো পৃথক আইনি পথ এবং প্রতিটির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে।

তাই বিষয়টিকে Shariah বনাম নতুন আইন হিসেবে উপস্থাপন না করে আরও কার্যকর প্রশ্ন করা উচিত: নতুন এই আইনি ব্যবস্থাটি Heba এবং প্রচলিত Gift আইনের পাশাপাশি কীভাবে কার্যকর হবে?

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর প্রস্তাবিত ১২২A ও ১২২B ধারা একটি বাস্তব সমস্যার সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করছে। একজন বাবা তার বাড়ির মালিকানা ছেলের কাছে হস্তান্তর করতে পারেন, কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানে বসবাস করতে চান। একজন মা তার জমি সন্তানদের দিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু জীবদ্দশায় সেই জমি থেকে আয় পেতে চান। একজন স্বামী তার সম্পত্তি স্ত্রীকে দিতে পারেন, কিন্তু জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগের অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারেন।

প্রস্তাবিত ১২২A ধারা দাতাকে জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার বা usufruct সংরক্ষণের সুযোগ দিয়ে এ ধরনের হস্তান্তরের জন্য একটি স্বতন্ত্র আইনি ব্যবস্থা তৈরি করছে।

এই সংশোধনী বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ১২২A(৪) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে নতুন এই পদ্ধতি বিদ্যমান Gift, Heba বা অন্য কোনো বৈধ হস্তান্তরের বৈধতা সীমিত, ক্ষুণ্ন বা অন্য কোনোভাবে প্রভাবিত করবে না।

অর্থাৎ, এই সংশোধনী Heba বাতিল করছে না, Heba সীমিত করছে না এবং প্রচলিত Gift-এর বিকল্প হিসেবে Heba-কে সরিয়ে দিচ্ছে না। বরং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আইনের কাঠামোর মধ্যে এটি আরেকটি আইনি বিকল্প যুক্ত করছে।

তবে এই ব্যবস্থার আরেকটি দিকও রয়েছে। মালিকানা এবং আজীবন usufruct বা সম্পত্তি ভোগের অধিকার আলাদা হয়ে গেলে বেশ কিছু বাস্তব প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।

একজন বাবা যদি তার বাড়ির মালিকানা ছেলের কাছে হস্তান্তর করেন কিন্তু সেখানে জীবদ্দশায় বসবাসের অধিকার নিজের কাছে রাখেন, তাহলে ছেলে কি ওই সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবে? বিক্রি করলে ক্রেতা কী ধরনের অধিকার অর্জন করবে? বাবার সম্মতি ছাড়া সম্পত্তিটি কি বন্ধক রাখা যাবে? বাড়ি থেকে পাওয়া ভাড়া কে পাবেন? মেরামত, বিদ্যুৎ-পানি, কর ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কে বহন করবেন? বাবা ও ছেলের সম্পর্কের অবনতি হলে কী হবে? আর ছেলে যদি বাবার আগে মারা যায়, তাহলে ছেলের উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে বাবার আজীবন usufruct কীভাবে কার্যকর হবে?

এসব নিছক তাত্ত্বিক প্রশ্ন নয়। এগুলো আগামী দিনের মামলার কারণ হয়ে উঠতে পারে। একটি ভালো আইন শুধু অধিকার সৃষ্টি করে না; সেই অধিকারগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাতও আগে থেকে বিবেচনা করে।

তাই ২০২৬ সালের সংশোধনীর সাফল্য শুধু এর উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করবে না। বরং পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী অধিকারগুলো কতটা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং আদালত সেগুলো কতটা কার্যকরভাবে ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ করতে পারে, তার ওপরও নির্ভর করবে।

শুধু একটি নতুন আইনগত সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে বলেই ২০২৬ সালের সংশোধনীকে সহজাতভাবে শরিয়াহবিরোধী বলার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। সংশোধনী নিজেই বিদ্যমান Gift ও Heba-এর বৈধতা বহাল রাখছে। এটি Heba-এর পুরো ক্ষেত্র দখল করছে না এবং Heba-কে অবৈধও ঘোষণা করছে না। বরং এটি এমন ব্যক্তিদের জন্য একটি নতুন আইনগত বিকল্প তৈরি করছে, যারা সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের পাশাপাশি জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার ধরে রাখতে চান।

তাই শরিয়াহ নিয়ে আলোচনা স্লোগাননির্ভর না হয়ে আরও গভীর হওয়া প্রয়োজন। নতুন কোনো আইন বা বিল প্রস্তাব করা হলে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোন বিধানটি সমস্যাজনক? কেন সেটি সমস্যাজনক? কোরআনের কোন নীতি বা সুন্নাহভিত্তিক কোন বিধানের সঙ্গে এর সংঘাত রয়েছে? ইসলামী ফিকহের বিভিন্ন মাজহাব এ বিষয়ে কী বলে? বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন ও সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে এটি কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ? আর কোনো বিধান পরিবর্তন করা প্রয়োজন হলে তার বিকল্প ভাষা কী হওয়া উচিত?

পৃথিবী বদলেছে। সম্পত্তির প্রকৃতিও বদলেছে। পরিবার, ব্যাংকিং, ব্যবসা, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, আবাসনব্যবস্থা এবং বিনিয়োগের কাঠামো—সবই পরিবর্তিত হয়েছে। যৌথ পরিবার ক্রমশ ছোট হয়ে একক পরিবারে রূপ নিচ্ছে।

তাই আধুনিক সমস্যার ক্ষেত্রে শরিয়াহর নীতিগুলো প্রয়োগ করতে হলে উলামা, ফুকাহা, আইনজীবী, বিচারক, আইন গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বয়ে গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা প্রয়োজন।

কাজটি শুধু কী করা উচিত নয়, তা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; বরং কী করা উচিত, তার বাস্তব ও কার্যকর সমাধানও তুলে ধরতে হবে।

আইনপ্রণেতাদেরও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। একটি আইন পাস করাই আইন প্রণয়নের শেষ ধাপ নয়। আইনের স্পষ্টতা, বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতা, সম্ভাব্য সংঘাত, ভবিষ্যৎ মামলা এবং বিচারিক ব্যাখ্যার সুযোগ—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে একই সম্পত্তির ওপর যখন মালিকানা এবং আজীবন usufruct পাশাপাশি বিদ্যমান থাকে, তখন ভবিষ্যতে আদালতে বিরোধ সৃষ্টি হওয়ার আগেই সম্ভাব্য সংঘাতগুলো বিবেচনা করা উচিত।

শেষ পর্যন্ত আমাদের Law বনাম Shariah-এর কৃত্রিম বিরোধিতার বাইরে যেতে হবে।

নতুন কোনো রাষ্ট্রীয় আইনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরিয়াহর বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রতিটি রাষ্ট্রীয় আইনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরিয়াহর অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত নয়।

মুসলিম আইনের ও ফিকহের অধীনে Heba-এর স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখতে হবে। প্রচলিত Gift রাষ্ট্রীয় আইনের কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হবে। আর যেখানে এই দুই ব্যবস্থার সরাসরি মিথস্ক্রিয়া রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের Muslim Personal Law (Shariat) Application Act, 1937-কে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে আইন ও ফিকহ—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই সেই সম্পর্ককে বোঝা প্রয়োজন।

অতএব, ২০২৬ সালের সংশোধনীকে Heba-এর ওপর আক্রমণ বা বিদ্যমান Gift আইনের ওপর বিধিনিষেধ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি এমন একটি নতুন আইনগত সুযোগ তৈরি করছে, যার মাধ্যমে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের পাশাপাশি দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।

এখন প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, এই নতুন ব্যবস্থাকে কতটা স্পষ্ট, ন্যায়সংগত, বাস্তবসম্মত এবং ভবিষ্যৎ বিরোধ প্রতিরোধে সক্ষম করে তোলা যায়।

এর জন্য শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সতর্ক আইন প্রণয়ন ও খসড়া প্রস্তুতি, তুলনামূলক আইন গবেষণা এবং আইন ও শরিয়াহর মধ্যে গভীর ও গঠনমূলক আলোচনা।

লেখক: মুহাম্মদ ইয়াসিন তাহা; অ্যাডভোকেট, কলামিস্ট ও তুলনামূলক আইন গবেষক। ই-মেইল: easintaha4@gmail.com