বিচারের নামে অবিচার বন্ধ হোক

সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধনী) আইন ২০২৬: আইন ও শরীয়াহর তুলনামূলক পর্যালোচনা

মুহাম্মদ ইয়াসিন তাহা : একজন বাবা সারা জীবনের সঞ্চয়ে একটি বাড়ি করেছেন। সেই বাড়িটি সন্তানদের দান করেছেন। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি বাড়িটিতে থাকতে পারেন নাই। সন্তানরা বাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছে। বাবা নিঃস্ব, পথের ফকির।

একজন মা তার পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি ছেলেদের লিখে দিয়েছেন। ছেলেরা মায়ের খোঁজ নেয় না। মা বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে জীবনযাপন করছেন।

এই ঘটনাগুলো আমাদের সমাজের নৈমিত্তিক ঘটনা। সেজন্য একজন বাবা নিজের একমাত্র বাড়িটি সন্তানদের লিখে দিতে চান, কিন্তু তিনি নিজে এতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন সেই বাড়িতে থাকতে চান। একজন মা চান তার জমি সন্তানদের নামে লিখে দিতে, কিন্তু সেই জমি থেকে যে আয় আসে, তা দিয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে চান। একজন স্বামী স্ত্রীকে সম্পত্তি দিতে চান, কিন্তু নিজের জীবনকালীন ব্যবহার বা ভোগের অধিকারটুকুও রাখতে চান।

প্রশ্ন হলো, আইন কি এমন একটি ব্যবস্থা দিতে পারে, যেখানে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর হবে, কিন্তু দাতার জীবনের নিরাপত্তাটুকুও হারিয়ে যাবে না?

বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ হলেও ইসলামি আইনের বাস্তবায়ন না থাকায় মুসলিম পিতা-মাতার অধিকার পূর্ণ করতে ইসলামী আইনের প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। ইসলামের একটি বিধান অপর অনেকগুলো বিধানের সাথে সম্পর্কিত। ইসলামি বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না হলে ইসলামের বিচ্ছিন্ন কোনো বিধানের বাস্তবায়ন করে সামাজিক যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

ফলে ২০২৬ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী মূলত দাতার জীবনের নিরাপত্তার বাস্তব প্রশ্নটিরই একটি আইনগত উত্তর খুঁজেছে। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর প্রস্তাবিত ধারা ১২২এ ও ১২২বি-তে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দানের একটি নতুন স্বতন্ত্র ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে।

  • ধারা ১২২এ(১) অনুযায়ী, দাতা স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি দান করেও নিজের জীবনকাল পর্যন্ত তার ভোগাধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।

  • ধারা ১২২এ(২) অনুযায়ী, এ ধরনের দান পিতা-মাতা ও সন্তান, পিতামহ-মাতামহ ও নাতি-নাতনি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে করা যাবে; স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল আবশ্যক।

  • ধারা ১২২এ(৩) অনুযায়ী, দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলেও সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে গেলেও দাতার ভোগাধিকার বহাল থাকবে।

  • ধারা ১২২এ(৪) স্পষ্টভাবে বলছে, এটি সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি এবং এর মাধ্যমে প্রচলিত গিফ্ট, হেবা বা অন্য কোনো বৈধ হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতা সীমিত বা প্রভাবিত হবে না।

অন্যদিকে, ধারা ১২২বি অনুযায়ী এ ধরনের দান নিবন্ধনের পর সাধারণভাবে অপ্রত্যাহারযোগ্য হবে। তবে আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজনে দাতা ও গ্রহীতার পারস্পরিক সম্মতিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে তা পরিবর্তন বা প্রত্যাহার করা যাবে। আর কোনো পক্ষের সম্মতি পাওয়া সম্ভব না হলে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জেলা জজের অনুমোদনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এই সংশোধনীর বিতর্কে আমরা এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েছি, যেখানে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের গিফ্ট এবং মুসলিম পারসোনাল ল-এর হেবাকে একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এখানেই একটু থামা দরকার। কারণ গিফ্ট ও হেবা এক জিনিস নয়। আবার তারা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নও নয়। আর ২০২৬ সালের নতুন সংশোধনী হেবার কোনো সংস্কার পথ বা হেবাকে সংকুচিত করার কোনো উপায় নয়। বরং এটি সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে গিফ্টের একটি নতুন ও স্বতন্ত্র আইনগত পথ। এই পার্থক্যটুকু না বুঝলে বিতর্ক হবে অনেক, কিন্তু সমাধান হবে কম।

বাংলাদেশের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ এর সপ্তম অধ্যায়ে গিফ্ট বা দান সম্পর্কে বিধান রয়েছে। আইনের ১২২ ধারায় সহজভাবে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার বিদ্যমান স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি স্বেচ্ছায় এবং বিনাপ্রতিদানে অন্য কাউকে দিলে এবং গ্রহীতা তা গ্রহণ করলে সেটি গিফ্ট। অর্থাৎ গিফ্টের মধ্যে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: ১. সম্পত্তি বিদ্যমান হতে হবে। ২. দান স্বেচ্ছায় হতে হবে। ৩. বিনিময়ে কোনো মূল্য বা প্রতিদান থাকবে না। ৪. গ্রহীতার গ্রহণও থাকতে হবে।

স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে ১২৩ ধারায় নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে গিফ্ট করার বিধান রয়েছে। দাতার স্বাক্ষরের পাশাপাশি অন্তত দুইজন সাক্ষীর সত্যায়নের কথাও বলা হয়েছে।

অন্যদিকে হেবা হলো কোনো বিনিময় বা প্রতিদান ছাড়াই একজন ব্যক্তি (দাতা/ওয়াহিব) কর্তৃক অন্য ব্যক্তির (গ্রহীতা/মাউহুব লাহু) কাছে সম্পত্তির মালিকানা স্বেচ্ছায় হস্তান্তর। হেবার জন্য দাতাকে সম্পত্তির বৈধ মালিক ও আইনগতভাবে সক্ষম হতে হয় এবং গ্রহীতার গ্রহণের প্রয়োজন হয়। হেবার বিষয়বস্তু হতে হয় নির্দিষ্ট, অস্তিত্বশীল, হস্তান্তরযোগ্য এবং দাতার বৈধ মালিকানাধীন সম্পত্তি।

হেবার প্রধান উপাদান হলো: (১) ইজাব ও কবুল, (২) পক্ষসমূহের সক্ষমতা, (৩) নির্দিষ্ট সম্পত্তি, (৪) বিনিময় বা প্রতিদানের অনুপস্থিতি, এবং (৫) কবজ বা দখল হস্তান্তর।

ইসলামী আইনে কবজ হেবাকে সম্পূর্ণ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পত্তি মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার হলেও সেই অধিকার দায়িত্বহীন নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

তোমরা যা ভালোবাস, তা থেকে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পূর্ণ নেকি লাভ করতে পারবে না। আর তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৯২)

সূরা আল-বাকারার ১৭৭ নম্বর আয়াতে আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের জন্য সম্পদ ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগ করার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করেছেন:

তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং জেনে-শুনে অন্যের সম্পদের কোনো অংশ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের কাছে পৌঁছিয়ো না। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৮)

সূরা আলে ইমরান ৩:৯২-তে বলা হয়েছে “তোমরা কল্যাণ অর্জন করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা যা ভালোবাসো তা দান করো”, এবং সূরা আন-নাহল ১৬:৯০-তে আল্লাহ “আত্মীয়দের তাদের প্রাপ্য প্রদান” করার নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা আল-ইসরা ১৭:২৬ স্পষ্টভাবে বলে “আত্মীয়দের তাদের হক দান করো এবং দরিদ্র ও মুসাফিরদেরও”, যা পরিবারের মধ্যে সম্পত্তি বিতরণকে শরিয়তসম্মত করে তোলে। সূরা আল-ইনসান ৭৬:৮-৯-তে উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রকৃত বিশ্বাসীরা নিজেদের সম্পদ ভালোবেসে দরিদ্র, এতিম ও বন্দীদের খাদ্য দান করে, এবং সূরা আল-হাশর ৫৯:৭-তে সম্পত্তি বিতরণের নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। সূরা আল-আদিয়াত ১০০:৮-১০-তে সতর্ক করা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি সম্পদ নিয়ে গর্ব করে এবং দরিদ্র ও এতিমদের খাদ্য দান করে না তার জন্য আল্লাহর শাস্তি রয়েছে, এবং সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৭-এ উদারতা ও উপহার প্রদানের নৈতিকতা শেখানো হয়েছে।

এই আয়াতগুলো হেবার কারিগরি সংজ্ঞা নয়। কিন্তু সম্পত্তির সঙ্গে ইসলামের যে নৈতিক সম্পর্ক, তা স্পষ্ট করে। সম্পত্তি শুধু মালিকানা নয়, এটি দায়িত্বও।

রাসুলুল্লাহ (ﷺ) সন্তানদের মধ্যে দানের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচারের শিক্ষা দিয়েছেন। নু‘মান ইবনে বশীর (রা.)-এর ঘটনায় একজন পিতা তার এক সন্তানকে বিশেষ একটি দান করেছিলেন। বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন:

তুমি কি তোমার প্রত্যেক সন্তানকে এর অনুরূপ দিয়েছ?

তিনি বললেন, “না।” তখন রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:

“আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।” (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২৫৮৬ ও ২৫৮৭)

এই হাদিসের শিক্ষা হলো, জীবদ্দশায় সম্পত্তি দেওয়ার স্বাধীনতা থাকলেও সেই স্বাধীনতা নৈতিক দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আবার রাসুলুল্লাহ (ﷺ) দান ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও কঠোর সতর্ক করেছেন:

“যে ব্যক্তি তার দান ফিরিয়ে নেয়, সে যেন নিজের বমি পুনরায় গিলে খায়।” (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২৬২১)

অবশ্য ফিকহি বিধানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যতিক্রম ও মতপার্থক্য বিবেচনায় রাখতে হবে। একইভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনে গিফ্ট প্রত্যাহারের প্রশ্নও পৃথকভাবে ১২৬ ধারার আলোকে বিচার করতে হবে।

কুরআন অবশ্য ‘হেবা’কে আধুনিক দেওয়ানি আইনের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ কারিগরি সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করেনি। কিন্তু সম্পদ দান ও আত্মীয়স্বজনের প্রতি সম্পদ ব্যয়ের নৈতিক ভিত্তি স্পষ্ট করে দিয়েছে। অর্থাৎ কুরআন আমাদের দানের নৈতিক ভিত্তি দিয়েছে; হেবার কারিগরি বিধান গড়ে উঠেছে সুন্নাহ ও ফিকহের মাধ্যমে।

হেবা নিয়ে ফিকহি আলোচনায় ‘কবজা’ তথা দখল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশেষত মুসলিম আইনের ঐতিহ্যগত বিশ্লেষণে শুধু মুখে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়া এবং বাস্তবে হস্তান্তর সম্পন্ন হওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। হেবার সঙ্গে ‘কবজা’ আর গিফ্টের সঙ্গে ‘নিবন্ধন’ অন্যতম সূক্ষ্ম তাত্ত্বিক পার্থক্য।

হেবার ক্ষেত্রে ফিকহি প্রশ্ন হতে পারে—হেবা সম্পূর্ণ হয়েছে কি না? গিফ্টের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইনের প্রশ্ন হতে পারে—আইনে নির্ধারিত পদ্ধতিতে হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে কি না? দুটি প্রশ্ন কখনো একই ফলাফলের দিকে যেতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন দুটির উৎস এক নয়। একটি ফিকহি বৈধতার প্রশ্ন; অন্যটি আইনগত আনুষ্ঠানিকতা ও প্রমাণের প্রশ্ন। এই পার্থক্যকে উপেক্ষা করলেই হেবা ও গিফ্টকে একই জিনিস মনে হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। হেবা ও গিফটের আরোও কিছু সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর পার্থক্য রয়েছে।

‘হেবা’ ও ‘গিফ্ট’ দুটি শব্দই বাংলায় অনেক সময় ‘দান’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। ফলে সাধারণ আলোচনায় মনে হতে পারে, দুটো একই জিনিসের দুটি নাম। কিন্তু আইন ও ফিকহের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এদের মধ্যে যেমন মৌলিক সাদৃশ্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে উৎস, প্রকৃতি, আনুষ্ঠানিকতা, দখল, প্রত্যাহার এবং আইনগত ফলাফলের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য।

এই পার্থক্যগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ২০২৬ সালে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ সংশোধনের প্রস্তাবের পর। কারণ প্রস্তাবিত সংশোধনীতে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দানের একটি স্বতন্ত্র আইনগত কাঠামো তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে এখন প্রশ্নটি কেবল ‘হেবা কী’ বা ‘গিফ্ট কী’ এখানে সীমাবদ্ধ নেই; বরং প্রশ্ন হলো—শরিয়াহর হেবা, রাষ্ট্রীয় আইনের গিফ্ট এবং জীবনকালীন ভোগাধিকার; এই তিনটি ধারণা কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হবে?

বাংলাদেশের মুসলিমদের ক্ষেত্রে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন, ১৯৩৭-এর ধারা ২ অনুযায়ী উপহার বা দানের ক্ষেত্রে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন প্রযোজ্য। বাংলাদেশের আইনে হেবার ক্ষেত্রে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন এবং রাষ্ট্রীয় আইনের বিধান উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ধারা ১৭(১)(এএ) অনুযায়ী মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীন হেবা ঘোষণাপত্রের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। অতএব, বাংলাদেশের বর্তমান আইনে হেবা শুধু একটি ধর্মীয় বা মৌখিক ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হেবার বৈধতা নির্ধারণে ইজাব, কবুল, কবজ, দাতার বৈধ মালিকানা ও আইনগত সক্ষমতা এবং প্রযোজ্য নিবন্ধনসহ অন্যান্য আইনগত আনুষ্ঠানিকতা বিবেচনা করতে হয়।

একজন মুসলিম ব্যক্তি তার পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী হেবা করতে পারেন, প্রচলিত গিফ্ট করতে পারেন, অথবা নতুন আইনি ব্যবস্থার অধীনে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন। অবশ্যই প্রযোজ্য শর্ত পূরণ করতে হবে।

সুতরাং এখানে শরিয়াহ বনাম নতুন আইন এমন সংঘাত খুঁজে বের করার চেয়ে বরং দেখতে হবে, নতুন আইনটি কীভাবে প্রয়োগ হবে? মালিকানা দিলাম, কিন্তু ভোগাধিকার রাখলাম, তারপর?

আইনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাটিই আবার ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। কারণ মালিকানা আর ভোগাধিকার এক জিনিস নয়।

ধরা যাক, একজন বাবা তার বাড়ির মালিকানা ছেলেকে দিয়ে দিলেন। কিন্তু বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই বাড়িতে থাকার অধিকার রাখলেন। এখন প্রশ্ন:

  • ছেলে কি বাড়িটি বিক্রি করতে পারবেন?

  • বিক্রি করলে ক্রেতার অধিকার কতটুকু?

  • বাবার অনুমতি ছাড়া বন্ধক দেওয়া যাবে?

  • বাড়ি থেকে ভাড়া এলে তা কে পাবেন?

  • বিদ্যুৎ, পানি, পৌরকর, ভূমি উন্নয়ন কর, মেরামত—এসব খরচ কে বহন করবেন?

  • বাবা ও ছেলের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হলে কে দখলে থাকবেন?

  • আর ছেলে যদি বাবার জীবদ্দশায় মারা যান, তখন তার উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তির মালিকানা পেলেও বাবার ভোগাধিকার কীভাবে কার্যকর থাকবে?

এই প্রশ্নগুলো নিছক তাত্ত্বিক প্রশ্ন নয়। এগুলোই আগামী দিনের মামলার বিষয় হতে পারে। সুতরাং আইন প্রণয়ন করে সমস্যার একটি দরজা বন্ধ করা হলেও, অস্পষ্টতা রেখে দিলে অন্য দরজা দিয়ে নতুন মামলা ঢুকে পড়তে পারে। একটি ভালো আইন শুধু অধিকার সৃষ্টি করে না, অধিকারগুলোর সংঘর্ষও যতটা সম্ভব আগে থেকে নিয়ন্ত্রণ করে।

তবু ২০২৬ সালের সংশোধনীর সামাজিক প্রয়োজন অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। আমাদের সমাজে এমন ঘটনা বিরল নয়, যেখানে বাবা-মা আবেগের বশে জীবিত অবস্থায় সন্তানদের সবকিছু দিয়ে দেন। পরে সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে সেই বাবা-মায়ের নিজের জীবনযাপনই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এই জায়গায় সংশোধনীর উদ্দেশ্যকে স্বাগত জানানো উচিত।

কিন্তু উদ্দেশ্য ভালো হলেই আইন নিখুঁত হয়ে যায় না। আইনের আসল পরীক্ষা শুরু হয় আদালতে, যখন দুই পক্ষের সম্পর্ক আর ভালো থাকে না। এখানে ২০২৬ সালের সংশোধনীকে নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুলটি হচ্ছে, কেউ কেউ এটিকে এমনভাবে দেখছেন যেন এটি হেবাকে সংকুচিত করেছে কিংবা মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের ওপর নতুন কোনো রাষ্ট্রীয় বিধান চাপিয়ে দিয়েছে।

আমার বিবেচনায় এই ব্যাখ্যা সঠিক নয়। নতুন সংশোধনী হেবা কেড়ে নেয়নি। প্রচলিত গিফ্টও সংকুচিত করেনি। বরং এটি সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে একটি নতুন ও স্বতন্ত্র ব্যবস্থা তৈরি করেছে। নতুন সংশোধনীর ১২২ক ধারায় নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর করেও দাতার জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তির ব্যবহার ও ভোগের অধিকার সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিলের প্রয়োজনীয়তাও রাখা হয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সংশোধনীতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে এই নতুন পদ্ধতি বিদ্যমান গিফ্ট, হেবা কিংবা অন্য কোনো বৈধ হস্তান্তরকে সীমিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। অতএব, ২০২৬ সালের সংশোধনীকে ইসলামি শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো ব্যবস্থা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। এটি হেবার জায়গা দখল করতে আসেনি। এটি হেবাকে বাতিল করেনি। এটি প্রচলিত গিফ্টকেও সংকুচিত করেনি। বরং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আইনের মধ্যে একটি নতুন বিকল্প যুক্ত করেছে।

শরিয়াহ নিয়ে কথা বলা শুধু আবেগের বিষয় নয়। এটি জ্ঞানেরও বিষয়, গবেষণারও বিষয়, দায়িত্বেরও বিষয়। কোনো নতুন আইন বা বিল সামনে এলে এটি শরিয়াহবিরোধী বলে প্রতিবাদ করা সহজ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এরপর কী?

  • কোন ধারাটি সমস্যাজনক?

  • কেন সমস্যাজনক?

  • কোন কুরআনী নীতি বা সুন্নাহর নির্দেশের সঙ্গে অসামঞ্জস্য?

  • ফিকহের বিভিন্ন মাজহাব কী বলে?

  • বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে এর বিকল্প কী?

  • আইনটি সংশোধন করতে হলে বিকল্প ধারাটি কেমন হবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু স্লোগান দিয়ে শরিয়াহভিত্তিক আইনচিন্তা তৈরি হয় না। দুঃখজনকভাবে আমাদের ধর্মীয় নেতৃত্বের একটি অংশের মধ্যে মাঝে মাঝে সাময়িক শরিয়াহ-সক্রিয়তা দেখা যায়। কোনো একটি ইস্যু সামনে এলে উত্তেজনা তৈরি হয়, বিবৃতি আসে, প্রতিবাদ হয়। কিন্তু সেই ইস্যুর পেছনের আইনব্যবস্থা, বিচারিক কাঠামো, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।

এটি আলেমদের জ্ঞানকে ছোট করার কথা নয়, বরং তাদের কাছে আরও বড় দায়িত্ব প্রত্যাশা করার কথা। রাজপথে প্রতিবাদ প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু আইনসভায় বিকল্প খসড়া নিয়ে হাজির হওয়া আরও প্রয়োজনীয়।

আমাদের প্রয়োজন ফিকহুন নাওয়াজিল। বাংলাদেশের বাস্তবতায় শুধু পুরোনো ফিকহি বইয়ের একটি বিধান উদ্ধৃত করে আধুনিক প্রতিটি সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ পৃথিবী বদলেছে। সম্পত্তির ধরন বদলেছে। পরিবার বদলেছে। ব্যাংকিং বদলেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বদলেছে। নারীর আর্থিক ভূমিকা বদলেছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হয়েছে। শহুরে জীবনে বসবাসের ধরন বদলেছে। মানুষের আয়, সম্পদ ও বিনিয়োগের ধরন বদলেছে।

তাই নতুন বাস্তবতায় শরিয়াহর নীতিগুলো কীভাবে কার্যকর করা যায়, তার গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা প্রয়োজন। এমন গবেষণা, যেখানে আলেম, ফকিহ, আইনজীবী, বিচারিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নীতি-নির্ধারকেরা একই টেবিলে বসবেন।

প্রয়োজন শুধু ‘না’ বলা নয়, প্রয়োজন ‘এর বদলে কী’—তার উত্তর দেওয়া। কোনো আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বলা যায়, এটি গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু একটি বিকল্প আইন তৈরি করে বলা, এই সমস্যার শরিয়াহসম্মত ও বাস্তবসম্মত সমাধান হলো এটি—এর জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশ্রম প্রয়োজন, সেটিই আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার।

শুধু আলেমদের নয়, আইনসভারও আত্মসমালোচনা দরকার। আইনসভাকেও মনে রাখতে হবে, আইন পাস করাই আইন প্রণয়নের শেষ কথা নয়। একটি আইন কতটা পরিষ্কার, কতটা প্রয়োগযোগ্য, ভবিষ্যতে কত ধরনের বিরোধ তৈরি করতে পারে এবং আদালতে তার ব্যাখ্যার সুযোগ কতটুকু—এসবও আইন প্রণয়নের অংশ।

বিশেষ করে যখন একই সম্পত্তির ওপর মালিকানা এবং জীবনকালীন ভোগাধিকার পাশাপাশি রাখা হচ্ছে, তখন সম্ভাব্য বিরোধগুলো আগেই বিবেচনা করা জরুরি। একটি ভালো আইন ভবিষ্যতের মামলা কমায়। একটি অস্পষ্ট আইন কখনো কখনো ভবিষ্যতের মামলা তৈরি করে। তাই আইনসভা, আইনজীবী, বিচারক, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আরও গভীর আলোচনা প্রয়োজন।

আইন বনাম শরিয়াহ—এই কৃত্রিম দ্বন্দ্ব থেকে বের হতে হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হবে, প্রতিটি নতুন আইনকে শরিয়াহর প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো। আবার প্রতিটি রাষ্ট্রীয় আইনকে শরিয়াহর অংশ মনে করাও ভুল।

আইন তার নিজস্ব রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে চলবে। হেবা তার মুসলিম আইনগত ও ফিকহি ভিত্তিতে থাকবে। আর যেখানে এবং দুই ব্যবস্থার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আছে, সেখানে সেই সম্পর্ক আইন ও ফিকহ দুই দিক থেকেই বুঝতে হবে এবং মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন, ১৯৩৭-এর আলোকে ফিকহকে প্রাধান্য দিতে হবে।

২০২৬ সালের সংশোধনীকে তাই শরিয়াহবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো স্বাভাবিক কারণ নেই। বরং এটি একটি নতুন আইনগত পদ্ধতি তৈরি করেছে, যা প্রচলিত গিফ্ট ও হেবাকে সংকুচিত না করেই দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি করছে। এখন আসল কাজ হলো, এই ব্যবস্থার প্রয়োগকে পরিষ্কার, ন্যায়সংগত ও বিরোধসহনীয় করা।

লেখক: মুহাম্মদ ইয়াসিন তাহা; অ্যাডভোকেট, কলামিস্ট ও তুলনামূলক আইন গবেষক। ই-মেইল: easintaha4@gmail.com