শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আইনজ্ঞ, সাবেক বিচারক ও মানবাধিকারকর্মী নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি তাঁর নাম ঘোষণা করে। ৮৫ বছর বয়সী এই মানবাধিকারকর্মী দীর্ঘ কর্মজীবনে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে আইনি লড়াই থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘ কর্মজীবনে রাষ্ট্র ও জাতীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে এবং সংঘাত ও সহিংসতার শিকার মানুষের মনে আশা জাগাতে পিল্লাই অসামান্য নৈতিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন।
কমিটির বক্তব্য, “বর্ণবাদবিরোধী লড়াইয়ে নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অন্যদের পক্ষে তাঁর শুরুর দিকের আইনি লড়াই থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক হিসেবে তাঁর ভূমিকা মূলত এক সূত্রে গাঁথা।”
আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে পিল্লাইয়ের দীর্ঘদিনের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে নোবেল কমিটি মনে করে, তাঁর কর্মজীবন দেখিয়েছে কীভাবে আইনি ব্যবস্থা যুদ্ধ ও সহিংসতা প্রতিরোধে, সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানে এবং গুরুতর অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে ভূমিকা রাখতে পারে।
‘এটি নির্ঘাত কোনো মশকরা’, পুরস্কার পেয়ে পিল্লাইয়ের প্রতিক্রিয়া
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হওয়ার খবর শুনে দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার আইনজীবী ও সাবেক জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই রসিকতা করে বলেছেন, “এটি নির্ঘাত কোনো মশকরা।”
পুরস্কার ঘোষণার পর এক ভিডিও বার্তায় ৮৫ বছর বয়সী এই বর্ষীয়ান নারীর এমন কৌতুকপূর্ণ ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসে।
একজন আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে নিজের পেশাগত অভ্যাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে পিল্লাই হেসে বলেন, “আইনজীবী ও বিচারক হওয়ায় আমি এখনও খবরটি সত্য কি না, তা যাচাই করে নিতে চাই।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সহকর্মীদের করতালির জবাবেও রসিকতা করেন তিনি। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে খোঁচা দিয়ে পিল্লাই বলেন, “আপনারা যদি এভাবে আরও কিছুক্ষণ হাততালি দিতে থাকেন, তবে আমি হয়তো এই পুরস্কারের অর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নেব।”
আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় তাঁর কাজের জন্য নোবেল কমিটি যে সাহসের প্রশংসা করেছে, সে বিষয়ে পিল্লাই বলেন, “সত্যি কথা বলার জন্য কেন সাহসের প্রয়োজন হবে? আপনি আইন ব্যাখ্যা করবেন এবং সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখে একটি নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন, এটাই স্বাভাবিক।”
পুরস্কার ঘোষণার সময় পিল্লাই জার্মানির নুরেমবার্গে একটি আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর প্রতিক্রিয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।
নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাইয়ের পরিচয়
ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাভি পিল্লাইয়ের পরিবার তামিল বংশোদ্ভূত। ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পারিবারিক নাম ছিল নাভানেথেম নাইডু।
বর্ণবাদী শাসনামলে বেড়ে ওঠা পিল্লাই আইন পেশায় যুক্ত হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য, বিচ্ছিন্নতা ও কাঠামোগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করেন। নেলসন ম্যান্ডেলাসহ বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষে তাঁর প্রাথমিক আইনি কাজ তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৯৫ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টে নিয়োগ পাওয়া প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে ইতিহাস গড়েন। এর আগে ও পরে আইনজীবী হিসেবে তাঁর কাজ এবং বিচারিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি অর্জন করেন তিনি।
পিল্লাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডার বিচারক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ছিলেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁর অন্যতম লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক আইনকে আরও শক্তিশালী করা, গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে গণহত্যা হিসেবে বিচারের ক্ষেত্রে ভূমিকা
আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ও আইনি নীতিমালা বিকাশে নাভি পিল্লাইয়ের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। বিশেষ করে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অপরাধ হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
রুয়ান্ডার গণহত্যা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিচারিক কার্যক্রমে তিনি এমন কিছু আইনি নীতির বিকাশে ভূমিকা রাখেন, যা যৌন সহিংসতার মতো অপরাধকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিচারের সুযোগ সম্প্রসারিত করে।
একই বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রচারমাধ্যম বা অপপ্রচারের মাধ্যমে গণহত্যায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়। নোবেল কমিটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, গণহত্যায় উসকানির অভিযোগে শুধু প্রচার ও অপপ্রচার ছড়ানোর ভিত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে পিল্লাইয়ের ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার শুধু অপরাধ সংঘটনের সরাসরি নির্দেশদাতা বা বাস্তবায়নকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অপরাধে উসকানি, সহায়তা ও সংশ্লিষ্ট দায় নির্ধারণের আইনি পরিসরকে শক্তিশালী করা।
নোবেল কমিটির মতে, পিল্লাইয়ের স্বাধীনতা, বিচারিক দক্ষতা, নৈতিক দৃঢ়তা ও নীতিনিষ্ঠ অবস্থান তাঁকে সমসাময়িক সময়ের অন্যতম সম্মানিত আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
গাজায় গণহত্যার অভিযোগ নিয়ে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন নাভি পিল্লাই। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি এই কমিশনের নেতৃত্ব দেন।
গত বছর কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। প্রতিবেদনে গণহত্যার অভিযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অপরাধ ও দায় নির্ধারণের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। ইসরায়েল ওই প্রতিবেদনকে ‘কলঙ্কজনক’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে।
পিল্লাইয়ের নেতৃত্বাধীন কমিশনের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়। গাজায় সংঘটিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং গুরুতর অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্নে প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এদিকে পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়কে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই পুরস্কার বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলায় আইসিজের বিচারক
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) চলমান মামলায়ও নাভি পিল্লাইয়ের ভূমিকা রয়েছে।
২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাঁকে অ্যাডহক বা বিশেষভাবে নিযুক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নোবেল কমিটির তথ্য অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে ওই মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এই মামলায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় রাষ্ট্রের দায় নির্ধারণ এবং গণহত্যার অভিযোগের বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষেত্রে মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ।
নোবেল কমিটির মতে, পিল্লাইয়ের বিচারিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে যুদ্ধ ও সহিংসতার ঝুঁকি কমানো এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক আইন দুর্বল হয়ে পড়ার বিরুদ্ধে বার্তা
নাভি পিল্লাইকে পুরস্কার দেওয়ার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও আইনের শাসনের গুরুত্ব তুলে ধরেছে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি।
কমিটির বক্তব্য, আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন চাপের মুখে পড়ছে এবং আইনের শাসনের ওপর ক্ষমতার রাজনীতির প্রভাব বাড়ছে, তখন এ পুরস্কার একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও কাজ করবে।
কমিটি মনে করে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসন শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সংঘাতের অহিংস সমাধানের ভিত্তি। ক্ষমতার জোরে আইনি কাঠামোকে উপেক্ষা করা হলে স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক আস্থা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত বাড়ার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক আইনকে কেবল শান্তি ও নিরাপত্তার সহায়ক ব্যবস্থা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটি অপরিহার্য। বিচারিক প্রতিষ্ঠান ও বিচারকদের স্বাধীনতা রক্ষা, যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার দেওয়ার ওপরও কমিটি গুরুত্ব দিয়েছে।
নোবেল কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার বিকাশে পিল্লাইয়ের অবদান এবং আইনের শাসনের প্রতি তাঁর অবিচল অবস্থান শান্তিপূর্ণ বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় আশার উৎস।
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ২৮৭ মনোনয়ন
নরওয়ের অসলোভিত্তিক নোবেল কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ২৮৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মনোনয়ন জমা পড়েছিল। এর মধ্যে চার ভাগের এক ভাগের কিছুটা বেশি ছিল বিভিন্ন সংস্থা।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়ার অধিকার নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের প্রধান, পূর্ববর্তী নোবেল বিজয়ী এবং নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সদস্যরা।
শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন ও বিজয়ী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠা, জাতিগুলোর মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি এবং শান্তিপূর্ণ সংঘাত নিরসনে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নোবেল কমিটি সাধারণত স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং শান্তির জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি কাজকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
চলতি বছর নাভি পিল্লাইকে পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বিশেষভাবে সামনে এসেছে। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন কীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে পারে, তা তাঁর কর্মজীবনে প্রতিফলিত হয়েছে।
গত বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন মারিয়া কোরিনা মাচাদো
২০২৫ সালে ভেনেজুয়েলায় গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের আন্দোলনে ভূমিকার জন্য দেশটির বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।
নোবেল কমিটি তাঁকে ‘ক্রমবর্ধমান অন্ধকারের মধ্যেও গণতন্ত্রের শিখা জ্বালিয়ে রাখা নারী’ হিসেবে অভিহিত করেছিল।
পরবর্তীতে মার্কিন হস্তক্ষেপে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মাচাদো তাঁর নোবেল পদক ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উপহার দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এটি ছিল প্রতীকী ঘটনা। নোবেল কমিটির নীতিমালা অনুযায়ী, পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তির মূল সম্মান বা নোবেল পুরস্কারের স্বীকৃতি অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করা যায় না। পদক উপহার দেওয়া হলেও পুরস্কারের আনুষ্ঠানিক মর্যাদা মূল বিজয়ীরই থাকে।
পিল্লাইকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টের অভিনন্দন
নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জয় করায় তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, পিল্লাই অবিচারের নৃশংসতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন অদম্য সাহসে এবং কখনো পিছু হটেননি।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট লেখেন, ন্যায়বিচার, শান্তি ও মানবমর্যাদার লড়াইয়ে নাভি পিল্লাইয়ের মতো নিজের জীবন সঁপে দেওয়ার নজির বিরল। তিনি নিপীড়িত, অসহায়, বঞ্চিত ও কণ্ঠহীন মানুষের পক্ষে সব সময় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
ফন ডার লিয়েন আরও বলেন, “আজকের এই অন্যায়ে ভরা বিশ্বে, যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়া সবচেয়ে বেশি জরুরি, সেখানে তাঁর সাহস আর স্পষ্ট নীতিবোধ আমাদের সঠিক পথ দেখানোর এক অমূল্য দিশারি।”
১০ ডিসেম্বর অসলোতে পুরস্কার প্রদান
আগামী ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের রাজধানী অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে নাভি পিল্লাইয়ের হাতে নোবেল শান্তি পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।
সুইডিশ শিল্পপতি আলফ্রেড নোবেলের উইলের মাধ্যমে নোবেল পুরস্কারের প্রচলন হয়। ১৮৯৫ সালে করা তাঁর উইল অনুযায়ী, মানবকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মানিত করার জন্য এই পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়। প্রথম নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় ১৯০১ সালে।
প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। নোবেল শান্তি পুরস্কারের সঙ্গে রয়েছে একটি পদক, সনদ ও অর্থমূল্য। চলতি বছরের পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রাউন, যা প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলারের সমান।
নাভি পিল্লাইয়ের এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্র ও ব্যক্তির জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্ন আবারও বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

