হাতের টানেই উঠে যাচ্ছে সড়কের পিচ: আদালতের স্বপ্রণোদিত মামলা
সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, আমতলী

স্ত্রীর বাড়িতে অপমানের অভিযোগ, স্বামীর আত্মহত্যা: ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা

বিপ্লব চন্দ্র দাস, আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি : বরগুনার আমতলীতে স্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মানসিক নির্যাতন ও অপমানের অভিযোগ তুলে এক যুবকের আত্মহত্যার ঘটনায় ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

নিহতের মা মোসা. জাকিয়া বেগম বাদী হয়ে গত ২৭ আগস্ট আমতলী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন।

মামলায় নিহতের স্ত্রী, তাঁর বাবা, মা, ভাই, চাচা ও বোনকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া চার থেকে পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে।

নিহত যুবকের নাম আবদুল্লাহ গাজী। তিনি আমতলী উপজেলার আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের ঘোপখালী কালীবাড়ি এলাকার মো. বারেক গাজীর ছেলে।

মামলার এজাহার ও নিহতের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ছয় বছর আগে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার চাকামইয়া এলাকার মো. ইউসুফ হাওলাদারের মেয়ে মোসা. হারিজা বেগমের সঙ্গে আবদুল্লাহর বিয়ে হয়।

দাম্পত্য কলহের অভিযোগ

নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আবদুল্লাহ ও তাঁর স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে একাধিকবার সালিশ বৈঠকও হয়।

পরিবারের অভিযোগ, একপর্যায়ে হারিজা গ্রামে থাকতে রাজি হননি। সংসার করতে হলে শহরে থাকতে হবে বলে তিনি স্বামীকে জানান।

এরপর স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় গিয়ে অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন আবদুল্লাহ। পরিবারের দাবি, নিজস্ব একটি অটোরিকশা কেনার জন্য তিনি বাড়ি থেকে টাকা নেন।

নিহতের মায়ের অভিযোগ, গত ১৫ জুলাই আবদুল্লাহর স্ত্রী ভাড়া বাসা থেকে অটোরিকশা কেনার জন্য রাখা ২০ হাজার ৯০০ টাকা নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান।

এ ঘটনায় আবদুল্লাহ গাজীপুরের বাসন থানায় লিখিত অভিযোগ করেছিলেন বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্ত্রীকে ফেরাতে টাকা পাঠানোর অভিযোগ

নিহতের মা জাকিয়া বেগমের অভিযোগ, গত ২৭ জুলাই ‘অবুঝ বালিকা’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে আবদুল্লাহকে বার্তা দিয়ে জানানো হয়, তাঁর স্ত্রী তাঁদের কাছে আছেন। স্ত্রীকে ফেরত পেতে হলে সাত হাজার টাকা দিতে হবে বলে বার্তায় জানানো হয়।

পরে আবদুল্লাহ একটি মুঠোফোন নম্বরে সাত হাজার ১০০ টাকা পাঠান বলে তাঁর মায়ের দাবি। তবে টাকা পাঠানোর পরও স্ত্রীকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

শ্বশুরবাড়িতে অপমানের অভিযোগ

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরেন আবদুল্লাহ। এরপর স্ত্রীকে নিয়ে আসার জন্য শ্বশুর মো. ইউসুফ হাওলাদারের বাড়িতে যান। সেখানে স্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিহতের মায়ের অভিযোগ, ২০ আগস্ট সন্ধ্যায় স্ত্রীকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে আবদুল্লাহ আবারও শ্বশুরবাড়িতে যান। এ সময় তাঁকে বিভিন্নভাবে অপমান ও গালিগালাজ করা হয়।

বাদীর দাবি, স্ত্রীকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে না পেরে আবদুল্লাহ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ওই দিন রাত আটটার দিকে নিজ বাড়ির বসতঘরের সামনের বারান্দায় গলায় গামছা পেঁচিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

রাতে বাড়ি ফিরে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান স্বজনেরা

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় আবদুল্লাহর মা-বাবা বাড়িতে ছিলেন না। তাঁরা তাঁর বোনের বাড়িতে গিয়েছিলেন। রাত আনুমানিক ১০টার দিকে বাড়িতে ফিরে তাঁরা ঘরের সামনের দরজা বন্ধ এবং পেছনের দরজা খোলা দেখতে পান।

পরে ঘরে ঢুকে বারান্দায় আবদুল্লাহকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তাঁরা। খবর পেয়ে আমতলী থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।

পুলিশ মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় ২১ আগস্ট আমতলী থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়। মামলার নম্বর ২৮/২৬।

আদালতে মামলা করেন নিহতের মা

নিহতের মা জাকিয়া বেগমের দাবি, ঘটনার পর তাঁরা থানায় গিয়ে মামলা করতে চাইলেও পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে তাঁকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে তাঁর অভিযোগ।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ আগস্ট তিনি আমতলী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দণ্ডবিধির ৩০৬/৩৪ ধারায় মামলা করেন।

মামলায় আবদুল্লাহর স্ত্রী মোসা. হারিজা বেগমকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন হারিজার বাবা মো. ইউসুফ হাওলাদার, ভাই মো. বাইজিদ, চাচা মো. রুহুল আমিন, মা মোসা. লিলি বেগম ও বোন মোসা. কুলসুম বেগম।

মামলার এজাহারে তাঁদের সবার বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার চাকামইয়া এলাকায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া চার থেকে পাঁচজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে।

অভিযুক্ত পরিবারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

অভিযোগের বিষয়ে হারিজার বাবা মো. ইউসুফ হাওলাদারের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যাওয়ায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

মামলায় আনা অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।