ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, অন্তত দুজন স্থানীয় বাসিন্দার উপস্থিতি ছাড়া তল্লাশি ও জব্দের কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে তা বেআইনি বলে গণ্য হবে বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, তল্লাশির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় দুজন সম্মানিত বাসিন্দার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। এ বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করে পরিচালিত তল্লাশি ও জব্দের কার্যক্রম ফৌজদারি বিচারে বিবেচনার বাইরে রাখতে হবে।
‘রত্না খাতুন বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় দেওয়া এক রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে মাদক উদ্ধারের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় অধস্তন আদালতের দেওয়া সাজা বহাল রেখে আপিল খারিজের সিদ্ধান্ত বাতিল করে আসামি রত্না খাতুনকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
মামলার অভিযোগ
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ২৫ আগস্ট কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থানার কাছারিপাড়া গ্রামে রত্না খাতুনের বাড়িতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি দল অভিযান চালায়। অধিদপ্তরের কুষ্টিয়া সদর সার্কেলের পরিদর্শক মো. ফারুক সুলতান, অধিদপ্তরের কর্মী এবং পুলিশের চার সদস্য ওই অভিযানে অংশ নেন।
অভিযোগে বলা হয়, অভিযানের সময় রত্না খাতুনকে আটক করা হয় এবং নারী কনস্টেবল পাপিয়া সুলতানা তাঁর দেহ তল্লাশি করে একটি প্লাস্টিকের পাত্রে কাগজে মোড়ানো প্রায় তিন গ্রাম ওজনের ২৫টি পুরিয়া হেরোইন উদ্ধার করেন। পরে ঘটনাস্থলে জব্দতালিকা তৈরি করা হয়। রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য উদ্ধার করা মাদক থেকে একটি পুরিয়া নমুনা হিসেবে আলাদা করে সিলগালা করা হয়।
এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এর ১৯(১) ধারার সারণি ১(ক)-এর অধীনে মামলা করা হয়। তদন্ত শেষে পুলিশ অভিযোগপত্র দাখিল করে।
বিচারিক আদালতে দুই বছরের কারাদণ্ড
মামলাটি কুষ্টিয়ার তৃতীয় আদালতের যুগ্ম দায়রা জজের আদালতে বিচারাধীন ছিল। সেখানে পাঁচজন সাক্ষীকে জেরা করে রাষ্ট্রপক্ষ। আসামিপক্ষ কোনো সাক্ষী হাজির করেনি।
২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি বিচারিক আদালত রত্না খাতুনকে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে তাঁকে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এরপর তিনি কুষ্টিয়ার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে আপিল করেন। ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল ওই আদালত আপিল খারিজ করে বিচারিক আদালতের দণ্ড ও সাজা বহাল রাখেন। পরে দুই আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন রত্না খাতুন।
আসামিপক্ষের বক্তব্য
হাইকোর্টে আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. ইলিয়াস আহমেদ যুক্তি দেন, অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়াই রত্না খাতুনকে দণ্ডিত করা হয়েছে। এ ছাড়া মামলার অভিযোগকারী নিজেই তদন্ত করেছেন এবং জব্দতালিকার সাক্ষীরা মাদক উদ্ধারের ঘটনা সমর্থন করেননি বলে তিনি আদালতে তুলে ধরেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ আখতারুল ইসলাম দণ্ড ও সাজা বহাল রাখার পক্ষে যুক্তি দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বিচারিক আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ বিস্তারিতভাবে বিবেচনা করেই আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন এবং আপিল আদালতও যথাযথভাবে সেই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন।
তল্লাশি ও জব্দের ক্ষেত্রে ১০৩ ধারার বিধান অনুসরণের প্রশ্ন
রায়ে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, মামলার অভিযোগকারী মো. ফারুক সুলতান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক এবং তিনিই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অভিযানের আগে এ বিষয়ে কোনো সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল—এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি।
মামলার চার ও পাঁচ নম্বর সাক্ষী যথাক্রমে মাজহারুল ইসলাম মিন্টু ও মো. নজরুল ইসলাম জব্দতালিকায় স্বাক্ষর করার কথা স্বীকার করলেও তাঁদের কেউই মাদক উদ্ধারের ঘটনা সরাসরি প্রত্যক্ষ করার কথা বলেননি। তাঁদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, তাঁরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই তল্লাশি ও মাদক জব্দের ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রপক্ষ তাঁদের মধ্যে একজনকে বৈরী সাক্ষীও ঘোষণা করে।
আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারার বিধান বিশ্লেষণ করে বলেন, তল্লাশি ও জব্দের পুরো প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট এলাকার অন্তত দুইজন সম্মানিত বাসিন্দার উপস্থিতিতে সম্পন্ন করতে হয়। তল্লাশি ও জব্দের সময় স্থানীয় সাক্ষীরা উপস্থিত না থাকলে ওই ধারার বাধ্যতামূলক শর্ত পূরণ হয় না।
রায়ে বলা হয়, তল্লাশি ও জব্দের ক্ষেত্রে ১০৩ ধারার প্রথম ও দ্বিতীয় উপধারার বিধান বাধ্যতামূলক। এসব বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করে তল্লাশি ও জব্দ করা হলে তা বেআইনি হিসেবে বিবেচিত হবে এবং ফৌজদারি বিচারে সেই প্রমাণ বিবেচনার বাইরে রাখতে হবে।
মাদক উদ্ধারের প্রমাণ গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় খালাস
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মামলার জব্দতালিকার সাক্ষীদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে তাঁরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই কথিত হেরোইন উদ্ধার ও জব্দ করা হয়েছিল। ফলে তাঁদের উপস্থিতিতে তল্লাশি ও জব্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।
আদালত মনে করেন, তল্লাশি ও জব্দসংক্রান্ত প্রমাণ এবং জব্দতালিকা বিবেচনার বাইরে রাখলে রত্না খাতুনের দখল থেকে হেরোইন উদ্ধারের অভিযোগ প্রমাণ করার মতো অন্য কোনো পর্যাপ্ত উপাদান মামলায় অবশিষ্ট থাকে না। তাই রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
রায়ে আরও বলা হয়, আপিল আদালতের দায়িত্ব ছিল বিচারিক আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথ ও বিচারবুদ্ধিসম্পন্নভাবে মূল্যায়ন করে দণ্ড দিয়েছেন কি না, তা স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা। কিন্তু এ মামলায় আপিল আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের স্বতন্ত্র মূল্যায়ন না করেই বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত যান্ত্রিকভাবে বহাল রেখেছেন।
দণ্ড ও সাজা বাতিল, রত্না খাতুন খালাস
সব দিক বিবেচনায় হাইকোর্ট রিভিশন আবেদনটি মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের দেওয়া রায় এবং ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি বিচারিক আদালতের দেওয়া দণ্ড ও সাজা বাতিল করেন।
আদালত রত্না খাতুনকে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে খালাস দেন এবং তাঁর জামিননামা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি অধস্তন আদালতের নথিপত্র রায়ের অনুলিপিসহ অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

