শরীয়তপুরের জাজিরায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে আলমাস হত্যা মামলার আসামি রুবেল কোতোয়ালকে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই মামলায় একই অবস্থানে থাকা কয়েকজন আসামি জামিন পাওয়া, আসামির পলায়ন বা সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার আশঙ্কার পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকা এবং বিচার-পূর্ব আটককে শাস্তি হিসেবে ব্যবহার না করার নীতির ভিত্তিতে আদালত এ আদেশ দেন।
বিচারপতি মো. খায়রুল আলম ও বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ ২০২৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর এ রায় দেন। সম্প্রতি এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। ফৌজদারি বিবিধ মামলা নং ৫১৯৬৪/২০২৬-এ রুল যথাযথ ঘোষণা করে আসামি রুবেল কোতোয়ালকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রুবেল কোতোয়াল শরীয়তপুরের জাজিরা থানার মামলা নং ০২, তারিখ ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর আসামি। মামলাটি জি.আর. নং ১৮০/২০২৫ হিসেবে নথিভুক্ত। দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩৪১, ৩০২, ৩৭৯, ২০১, ১১৪ ও ৩৪ ধারায় করা এ মামলায় জামিন চেয়ে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় হাইকোর্টে আবেদন করেন।
এর আগে শরীয়তপুরের অতিরিক্ত দায়রা জজ ২০২৬ সালের ৭ জুলাই ফৌজদারি বিবিধ মামলা নং ১০৯৯/২০২৬-এ তাঁর জামিন আবেদন নাকচ করেন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করে রুল পান রুবেল।
মামলার অভিযোগ কী
মামলার এজাহার অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জাজিরায় আলমাসের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ১ নম্বর আসামি মো. দানেশ সরদারের নেতৃত্বে ২৫ জন নামীয় ও ১০ থেকে ১৫ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বেআইনি সমাবেশ গঠন করে আলমাসের ওপর হামলা চালান। আলমাস এ মামলার বাদী লিপি বেগমের ভাই।
অভিযোগে বলা হয়, ২ নম্বর আসামি জহিরুল ইসলাম ওরফে সুমন সরদার চীনা কুড়াল দিয়ে আলমাসের মাথায় আঘাত করেন। ২১ নম্বর আসামি রুবেল কোতোয়াল রামদা দিয়ে মাথায় আঘাত করতে গেলে তা আলমাসের বাঁ কাঁধে লাগে। এতে তাঁর গুরুতর রক্তাক্ত জখম হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আরও কয়েকজন আসামি তাঁকে মারধর করেন বলে অভিযোগ করা হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়, ১০ নম্বর আসামি আলমাসের গলা থেকে আনুমানিক এক ভরি ওজনের, এক লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যমানের একটি সোনার চেইন ছিনিয়ে নেন। কয়েকজন আসামি তাঁকে পানির নিচে জোর করে ধরে রাখেন এবং ডুবিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বাদী ও অন্য সাক্ষীরা ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে ঘটনা দেখেছেন বলে এজাহারে দাবি করা হয়। পরে কয়েকজন আসামি পুকুর থেকে মরদেহ তুলে সাদা প্লাস্টিকের বস্তায় মুড়ে একটি ফাঁকা জমিতে পুঁতে রাখেন, যাতে আলামত গোপন করা যায়—এমন অভিযোগও আনা হয়। ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট রাত ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে পাঠায়। এরপর ২ সেপ্টেম্বর লিপি বেগম থানায় মামলা করেন।
আসামিপক্ষের যুক্তি
হাইকোর্টে রুবেল কোতোয়ালের পক্ষে আইনজীবী মো. শামসুল আলম যুক্তি দেন, এজাহার দায়েরে অস্বাভাবিক ও ব্যাখ্যাহীন বিলম্ব হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, বাদী যদি সত্যিই ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে থাকেন, তাহলে মরদেহ উদ্ধারের অপেক্ষা না করে দ্রুত পুলিশের কাছে যাওয়ার কথা ছিল। এ বিলম্ব মামলার অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বলে দাবি করেন তিনি।
আসামিপক্ষ আরও যুক্তি দেয়, অভিযোগে আলমাসকে পানির নিচে ধরে রেখে ডুবিয়ে হত্যার কথা বলা হলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘মাথায় আঘাতজনিত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের অবসাদ’ উল্লেখ করা হয়েছে। এ অসামঞ্জস্যের কারণে মামলার অভিযোগ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
আইনজীবী আরও বলেন, রুবেলের আগের জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর উল্লেখযোগ্য সময় পেরিয়ে গেছে এবং একই অবস্থানে থাকা কয়েকজন সহ-আসামি জামিন পেয়েছেন। মামলায় পুলিশ প্রতিবেদনও দাখিল হয়েছে; কিন্তু শিগগির বিচার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন আটক রাখার যৌক্তিকতা নেই বলে তাঁরা জামিন প্রার্থনা করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তি
রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মাসুদুল আলম দোহা জামিনের বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, জামিন পেলে আসামি পলাতক হতে পারেন, সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করতে পারেন কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারেন। এ কারণে এ পর্যায়ে তাঁকে জামিন দেওয়া উচিত নয় বলে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি দেয়।
নতুন পরিস্থিতিতে পুনরায় জামিন আবেদন বিবেচনার সুযোগ
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এর আগে রুবেল কোতোয়ালকে এ বিভাগ থেকে জামিন দেওয়া হলেও আপিল বিভাগ ওই আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট রুলটি আর এগিয়ে নেওয়া হয়নি বলে খারিজ হয়। তবে নতুন কোনো পরিস্থিতি বা ঘটনা দেখা দিলে পুনরায় জামিনের আবেদন বিবেচনার ক্ষেত্রে আইনগত বাধা থাকে না।
আদালত বলেন, জামিনের আবেদন একবার নাকচ হলেই পরবর্তী সব আবেদনের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় না। নতুন পরিস্থিতি বা পরবর্তী কোনো ঘটনা পুনর্বিবেচনার যৌক্তিকতা তৈরি করলে আদালত নতুন আবেদন বিবেচনা করতে পারেন।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, আসামি জামিন পেলে পলাতক হবেন, সাক্ষ্যপ্রমাণে হস্তক্ষেপ করবেন কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দেবেন—এমন আশঙ্কার পক্ষে নথিতে কোনো সুনির্দিষ্ট উপাদান পাওয়া যায়নি।
সহ-আসামিদের জামিন ও বিচার-পূর্ব আটক নিয়ে পর্যবেক্ষণ
আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতকে জানান, আগের জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর একই অবস্থানে থাকা এজাহারের ৭ নম্বর আসামি জাহাঙ্গীর ব্যাপারী ও ৪ নম্বর আসামি রিপন সরদারসহ কয়েকজন সহ-আসামি জামিন পেয়েছেন। আদালতে এ যুক্তি তুলে ধরে আসামিপক্ষ বলে, একই অবস্থানে থাকা আসামিদের জামিন পাওয়া রুবেলের আবেদন পুনর্বিবেচনার জন্য নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
আদালত ‘শফিক রহমান বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় আপিল বিভাগের দেওয়া নীতির উল্লেখ করেন। ওই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে কাউকে জামিন থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয় এবং বিচার শুরুর আগের আটক যেন শাস্তিমূলক রূপ না নেয়।
সংশ্লিষ্ট সব দিক—অভিযোগের ধরন, ইতিমধ্যে আটক থাকার সময়, একই অবস্থানে থাকা সহ-আসামিদের জামিন, পলায়ন বা সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার আশঙ্কার পক্ষে সুনির্দিষ্ট উপাদানের অনুপস্থিতি এবং আপিল বিভাগের উল্লিখিত নীতি—বিবেচনা করে হাইকোর্ট মনে করেন, রুবেল কোতোয়াল জামিন পাওয়ার মতো ভিত্তি দেখাতে পেরেছেন।
বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত জামিন
সবশেষে হাইকোর্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করে রুবেল কোতোয়ালকে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত জামিনে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন। এ জন্য শরীয়তপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সন্তুষ্টি অনুযায়ী জামিননামা দাখিল করতে হবে।
তবে জামিনের কোনো শর্তের অপব্যবহার করলে বা জামিনের সুযোগের অপব্যবহার করলে সংশ্লিষ্ট চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর জামিন বাতিল করতে পারবেন বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায় ও আদেশের অনুলিপি অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

