ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৭ নভেম্বর, ২০২১ ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ
চৌধুরী তানবীর আহমেদ ছিদ্দিক

চৌধুরী তানবীর আহমেদ ছিদ্দিক: পাঁচটি মৌলিক চাহিদার প্রথমটিই হচ্ছে খাদ্য এবং দ্বিতীয়টি বস্ত্র। এই দুইটি চাহিদা মিটাতে মানুষকে এর যোগানদাতা তথা বিক্রেতার দ্বারস্থ হতে হয়,পাশাপাশি নিজেকে হতে হয় ভোক্তা। এই ভোক্তা-বিক্রেতা সম্পর্ক কেবল আদান-প্রদানের নয়, বরং মানব সভ্যতার এক অপার মহিমা যা আজ পর্যন্ত টিকিয়ে রেখেছে এই সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী।

ভোক্তা অধিকার এবং আইন

সভ্যতার শুরুতে একজনের কাছে চাল ছিল, আরেকজনের কাছে ডাল। এর কাছে মাছ, ওর কাছে মাংস। তখন বিনিময় হত এই পণ্যের বিনিময়ে ঐ পণ্য। ধীরে ধীরে চালু হল মুদ্রার প্রচলন। শুরু হল ব্যবসা-বাণিজ্য। ব্যবসায়ী টাকার বিনিময়ে পণ্য বিক্রি করত আর ভোক্তা টাকা দিয়ে পণ্য কিনত। শুরু হল সভ্যতার অগ্রযাত্রা। এভাবেই চলছিল। তবে, দুষ্টচক্র দেরিতে হলেও সব জায়গায়ই প্রবেশ করে। শুরু হল ওজনে কম দেওয়া, পণ্যে ভেজাল মেশানো, গুণগত মান কমিয়ে দেওয়া, মেয়াদউত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি ইত্যাদি ইত্যাদি।

অপরাধ যেখানে আইন সেখানে। পণ্যে ভেজাল বা ব্যবসায় দুই নম্বরি যাই বলা হোক, সেটা যখন থেকে শুরু হল, তখন জনগণকে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করতে বিভিন্ন দেশে আইন প্রণয়ন শুরু হয়ে গেল। আমাদের দেশেও সময়ে সময়ে অনেক আইন প্রণয়ন হয়েছে। বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ, ১৯৫৯, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৩ , ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ ইত্যাদি ইত্যাদি। অন্যান্য আইনের তুলনায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ সবচেয়ে বেশী আলোচিত এবং যুগোপযোগী। ভোক্তার অধিকার এবং যথাযথ প্রতিকার সম্বন্ধে এই আইনটি ভীষণ প্রশংসনীয়।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯

আইনের জগতে একটি পুরনো বিতর্ক প্রচলিত আছে এমন যে, আইন আগে নাকি রাজনীতি আগে? কারো কারো ধারণা আইন আগে এসেছে, আর আইনের প্রয়োগ কিংবা আইনের দুর্বলতা নিয়েই মত বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং ফলাফল হিসেবে রাজনীতির জন্ম হয়। আবার অনেকের ধারণা, রাজনীতি আগে এসেছে এবং রাজার রাজ্যে প্রজাদের শাসনের জন্য যেসব নীতি ছিল, সেগুলোই পরবর্তীতে আইন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। অনেকটাই ডিম আগে নাকি মুরগী আগের মত। এই বিতর্কের কোন শেষ সমাধান নাই। সঠিক উত্তরটা যাই হোক না কেন এ বিতর্ক থেকে এটা স্পষ্ট যে, আইনের কারণে রাজনীতি হোক আর রাজনীতির কারণে আইন হোক, দুইটাই (আইন এবং রাজনীতি) কিন্তু প্রজা তথা দেশের জনগণের জন্য। রাজা তথা সরকার তার জনগণের সুবিধার্থেই আইন প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করেন। এক্ষেত্রে আইন প্রণয়ন যেমন জরুরী, তেমনি ঐ আইনটি বাস্তবায়নও সরকারের জন্য দরকারি। আইন যেমন যুগোপযোগী হতে হবে, তেমনি আইনের বাস্তবায়নও হতে হবে বাস্তবসম্মত। অনেক সময়ই দেখা যায়, অনেক সুন্দর আইন প্রণয়ন করা সত্ত্বেও বাস্তবায়নের অভাবে দেশের জনগণ প্রকৃত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। আবার, অনেক দুর্বল আইনের বাস্তবায়নের ফলে ভোগান্তির স্বীকার হয় সাধারণ জনগণ। তাই, আইন এবং আইনের বাস্তবায়ন দুইই হওয়া উচিত সময়োপযোগী।

বাংলাদেশসহ গোটা উপমহাদেশের সিংহভাগ আইনই ইংরেজদের তৈরি করে দিয়ে যাওয়া। ইংরেজদের মত এতটা দূরদর্শিতা এবং মানসম্মত আইন প্রণেতা এখনো উপমহাদেশের জন্মায়নি বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। কিন্তু বাংলাদেশের আইন প্রণেতারা হয়ত ধীরে ধীরে সেই কথাকে মিথ্যে প্রমাণের চেষ্টা করছেন। আইনের সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে দেশে তৈরি অনেক অসাধারণ আইন সাধারণ জনগণের না উপকারে আসছে, না প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’ আইনটি একটি বাস্তব উদাহরণ; যেখানে দেশের আইন প্রণেতাদের দক্ষতা প্রকাশের পাশাপাশি খোলাসা হচ্ছে সরকারের গুড ইনটেনশন। একটা কথা প্রচলিত আছে যে, লেখককে চিনতে চাইলে ঐ লেখকের বই পড়। বই পড়লেই ঐ লেখক সম্বন্ধে একটা সুষ্ঠু ধারণা চলে আসবে। কেননা, একজন মানুষের চিন্তা-ভাবনা-চেতনা তার লেখনীতে প্রকাশ পায়। ঠিক তেমনি, একটি রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকারের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্বন্ধে জানতে হলে ঐ সরকারের তৈরি আইন, রুলস, রেগুলেশনস, অর্ডার এইসব পড়ে উপলব্ধি করতে হয়।

কেননা, সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করবেনই নিজের সৃষ্ট আইন দিয়ে। তাই, সরকারের তৈরি আইনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সরকারের ইনটেনশন। ভোক্তা অধিকার তেমনি একটি আইন যা সরকারের এমন একটি ইনটেনশনের বহিঃপ্রকাশ করে যাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, দেশের জনগণের ব্যবহার্য কমবেশি সকল পণ্যে নামমাত্র ভেজাল কিংবা কোন ভোক্তা সামান্য অনিয়মের শিকার হোক-তার কোন সুযোগ নাই।

অভিযোগ দায়ের প্রক্রিয়া

ভোক্তা হিসেবে যখন কোন পণ্য দ্বারা ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’ এর অধীন ভেজাল বা অন্য কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে এই আইনের অধীনেই অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা যাবে। তবে এর জন্য আইনে কিছু সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ভোক্তা অধিকারবিরোধী কোনো কাজ সংঘটিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাকে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (১ কারওয়ান বাজার) অথবা প্রতিটি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বরাবর অভিযোগ করতে হবে। এ অভিযোগ অবশ্যই লিখিত হতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতারক বিক্রেতার বিরুদ্ধে মুঠোফোনে খুদে বার্তা (এসএমএস), ফ্যাক্স, ই-মেইল বা অন্য কোনো উপায়ে অভিযোগকারীর পূর্ণাঙ্গ নাম, বাবা ও মায়ের নাম, ঠিকানা, ফোন, ই-মেইল, ফ্যাক্স (যদি থাকে) এবং পেশা উল্লেখ করে আবেদন করতে পারেন প্রতারিত ক্রেতা বা ভোক্তারা। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই অভিযোগ গ্রহণ করা হবে। তবে কেনাকাটার প্রমাণ হিসেবে অভিযোগকারীর কাছে দোকানের রসিদ থাকতে হবে। ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ বা নকল পণ্য বিক্রিসহ বিভিন্ন অভিযোগের ক্ষেত্রে পণ্যের নমুনাসহ প্রয়োজনীয় তথ্যাদি যতদূর সম্ভব দিতে হবে।

মিথ্যা বিজ্ঞাপন

অনেক সময় ক্রেতাদেরকে পণ্য কেনার জন্য আকৃষ্ট করতে বিক্রেতারা বিভিন্ন লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। বিজ্ঞাপন লোভনীয় হয়েও যদি সত্য হয় তবে সমস্যা নেই। কিন্তু মিথ্যা বিজ্ঞাপন হয়ে থাকলে, ক্রেতা তথা ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই, ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’ -এর ধারা ৪৪ এ মিথ্যা বিজ্ঞাপনদাতার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান সম্বন্ধে বলা হয়েছে। সেখানে হুবহু বলা হয়েছে,

“কোন ব্যক্তি কোন পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতা সাধারণকে প্রতারিত করিলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদণ্ড, বা অনধিক দুই লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন”

সুতরাং, এখনই মিথ্যা বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে নিজে এবং সমাজকে এই সব প্রতারকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার করা জরুরী।

বিচার-কার্যক্রম
‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’ আইনের অপরাধসমূহ প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিচার্য হবে। কোন পক্ষ যদি প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের রায়ে সংক্ষুব্ধ হয় তবে উক্ত রায়ের ৬০ দিনের মধ্যে স্থানীয় সেশন জজের আদালতে আপীল দায়ের করতে পারবেন। তাছাড়া, এই আইনের ফৌজদারী কার্যক্রমের পাশাপাশি দেওয়ানী প্রতিকারেরও ব্যবস্থা রয়েছে। ভোক্তা চাইলে দেওয়ানী প্রতিকারও নিতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে যুগ্ম জেলা জজের আদালতে বিচার কার্য পরিচালিত হবে।

দণ্ড
আইনের অধীনে সবগুলো অপরাধের শাস্তির স্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। শাস্তির বিধানও যথেষ্ট নমনীয়। কমও নয়, আবার অতিরিক্তও নয়। সবচেয়ে সময়োপযোগী হয়েছে এর বিচার চলাকালীন বাধা নিষেধ সমূহ। এই আইনের অধীন প্রতিটি অপরাধ জামিনযোগ্য, আমলযোগ্য, আপোষযোগ্য।

অগ্রগতি
ইতিমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দেশের ৭ বিভাগে এবং ৯ জেলায় কার্যালয় স্থাপন করেছে। ধীরে ধীরে বাকি জেলা গুলোতেও কার্যালয় স্থাপনের কাজ চলছে। এই অধিদপ্তরের হাত ধরেই ধীরে ধীরে দেশের রুট লেভেলে ভোক্তা অধিকার সম্বন্ধে সচেতনতা ছড়িয়ে পড়ছে। সারাদেশে ইতিমধ্যে সাধারণ জনগণ এই আইনের সুবিধা সম্বন্ধে অবহিত হতে শুরু করেছে। অভিযোগও আসতে শুরু করেছে এবং সেই প্রেক্ষিতে মামলার প্রস্তুতিও আশানুরূপ। আশা করা যাচ্ছে, ভোক্তারা যত বেশী এই আইন সম্বন্ধে অবগত হবেন, ততই পণ্যে ভেজাল মুক্ত হবে এবং প্রতারণা বন্ধ হবে।

সীমাবদ্ধতা
আইনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে ইংরেজিতে বলা হয় Black hole আর বাংলায় ফাঁকফোকর। তবে, আইনের সকল সীমাবদ্ধতা আইন প্রণেতাদের জ্ঞান ঘাটতির কারণে হয়, এটা সত্য নয়। অনেক সময় অনেক রাষ্ট্র তাদের সাম্প্রতিক বা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির কথা চিন্তা করেই তাদের আইনকে খানিকটা ছাড় দিয়ে তৈরি করে। কেননা, আইন একটা বানিয়ে ফেললেই হয় না। আইন তৈরির চেয়ে আইনের প্রয়োগ কয়েক হাজারগুণ কঠিন কাজ। শত শত আইন তৈরি হয়ে পড়ে আছে, অথচ প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই, খানিকটা ছাড় বা সাদামাটা আইনও যদি প্রয়োগ করা সম্ভব হয়, তবে সেটাই শ্রেয়। তবে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন কোন মতেই সাদামাটা বা দুর্বল আইন নয়। সরকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার শতভাগ অভিপ্রায় এই আইনে ফুটে উঠেছে। আইন হিসেবে আইনের সার্থকতা সম্পূর্ণরূপে অর্জন করেছে। কিন্তু, কিছু কিছু ধারায় কিছু সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়েছে। সেটা নিছক সরকার হয়ত বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে সংযুক্ত করেন নি, নয়ত এই বিষয়ে আরও অনেকগুলো আইন থাকায় এই আইনে আনা হয় নি।

প্রথমত, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ধারা ৩ এবং ৪ এর মধ্যে এই আইনের প্রয়োগ পরিধি কিছুটা সংকীর্ণ করা হয়েছে। ৩ ধারায় এই আইনকে একটি অতিরিক্ত আইন হিসেবে বিবেচিত করা হয়েছে। আপাতত বলবত আছে এমন কোন আইনকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন বা এই আইনের কোন ধারা ক্ষুণ্ণ করবে না এবং এই আইন অতিরিক্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। এই থেকে একটি বিষয় পরিলক্ষিত যে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনটি যতই যুগোপযোগী হোক না কেন, এই আইনটি একটি অতিরিক্ত আইন যা মূলত সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করবে। অন্য কোন আইনে যদি কোন ধারা স্পষ্ট না হয় বা কোন বিধান অনুপস্থিত থাকে, তবে এই আইনটির কোন ধারা কার্যকরের সম্ভাবনা তৈরি হবে, অন্যথায় নয়। আবার, চতুর্থ ধারায় সরকার চাইলে নির্দিষ্ট কোন সেবা বা এলাকাকে এই আইনের আওতা মুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, আমরা যেখানে জানি কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, সেখানে এই আইনের এই ধারা মোতাবেক চাইলেই নির্দিষ্ট কোন মহল বা অঞ্চলকে এই আইনের আওতামুক্ত তথা ঊর্ধ্বে বিবেচনা করা যেতে পারে। এটা সময়োপযোগী হলেও এই ধারার অপব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। এখানেই শেষ নয়। খাদ্য তদারকি ও পরিদর্শনে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাব, লজিস্টিকস ও যানবাহনের অভাব, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ঘাটতি, পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব, খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ-রক্ষনাবেক্ষনের সমস্যার কারণে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কর্মরতরা ইচ্ছা সত্ত্বেও দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করতে পারেন না।

এছাড়া নজরদারির কার্যক্রম শুধুমাত্র মহানগরীগুলোতে দৃশ্যমান হলেও উপজেলা বা গ্রাম পর্যায়ে তা মোটেই লক্ষ্য করা যায় না। অথচ খাদ্যে সুরক্ষা পাবার অধিকার দেশের সকল নাগরিকের সমানভাবে রয়েছে। খাদ্যে ভেজাল ও জনস্বাস্থ্যের হুমকি: নৈতিকতা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। এই শাস্তি বহির্বিশ্বের তুলনায় অনেক কম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধে যথোপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয়। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধে ভারতে যাবজ্জীবন,পাকিস্তানে ২৫ বছর কারাদন্ড, যুক্তরাষ্ট্রে সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ কঠোর আইনের অভাবের পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের সঠিক বাস্তবায়ন ভেজাল প্রতিরোধে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

জনসচেতনতা বৃদ্ধি

জনসাধারণের অনেকেই অলসতার জন্য বা আইনের সুবিধা পাওয়া যাবে না এই ভেবে অভিযোগ করেনা বা চিন্তা করেন এত বড় কোম্পানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে কোন ফায়দা হবে না। কিন্তু দেখা গেছে যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বেশ গুরুত্ব দিয়ে অভিযোগগুলো দেখেন। জনসাধারণকে আরো বেশি সচেতন এবং সাহসী হতে হবে। একে অন্যকে সাহস দিয়ে বলতে হবে, আইনের সুবিধা পান বা না পান প্রতারকের বিরুদ্ধে অন্তত অভিযোগ করতে হবে। সচেতনতার অভাব এবং না জানার ফলে বিক্রেতারা প্রতিনিয়ত প্রতারণা করে যাচ্ছে। আরো জেনে রাখা উচিত, কোনো ভোক্তা প্রতারিত হয়ে অভিযোগ করলেই প্রতিকার পাবেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অধিদপ্তরই মামলা করবে। মামলার খরচ, পণ্যের মান পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় কোনো কিছুই তাঁকে বহন করতে হবে না। সবকিছুই বহন করবে সরকার। সরকার কেবল চাইছে জনগণের সচেতনতা এবং জনগণের দায়িত্ব সরকারকে প্রতারণা সম্বন্ধে অবহিত করা।

আজ এই পর্যন্তই, যেতে যেতে শুধু একটা কথাই বলবো, সমাজ কখনো খারাপ মানুষের খারাপ কাজের জন্য ধ্বংস হয় না, ধ্বংস হয় ভালো মানুষের নীরবতার কারনে। সুতরাং, ভোক্তার সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপই পারে প্রতারনামুক্ত ভোক্তার অধিকার বাস্তবায়ন করতে।

লেখক: আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরসম্পন্ন