হাসানুর রহমান : রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি রাজস্ব, আর রাজস্ব আহরণের প্রধান উৎস কর। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য করের বিকল্প নেই। তবে একটি কার্যকর করব্যবস্থার সাফল্য শুধু কত রাজস্ব আদায় হলো, তার ওপর নির্ভর করে না, বরং সেটি কতটা ন্যায়সংগত, বাস্তবসম্মত এবং করদাতার অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তার ওপরও নির্ভর করে।
এই প্রেক্ষাপটে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ এবং অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে আনা সংশোধনী নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কর প্রশাসনের দৃষ্টিতে এটি ন্যূনতম রাজস্ব নিশ্চিত করার একটি কার্যকর ব্যবস্থা হলেও অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর কাছে এটি বাড়তি আর্থিক চাপের কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৩-এ টার্নওভার করের বিধান রয়েছে। অর্থ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে সংশোধিত ধারা ১৬৩(৬) অনুযায়ী, উপধারা (৩) অনুসারে নির্ধারিত কর যদি নির্ধারিত টার্নওভার করের চেয়ে কম হয়, তাহলে ব্যবসা বা পেশার মোট গ্রস প্রাপ্তি (Gross Receipts/Turnover)-এর ওপর নির্ধারিত হারে টার্নওভার কর পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ, আইন যেসব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করেছে, সেখানে প্রকৃত মুনাফার পরিবর্তে মোট বিক্রয় বা গ্রস প্রাপ্তিই কর নির্ধারণের ভিত্তি হবে।
সংশোধিত বিধান অনুযায়ী তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারকের ক্ষেত্রে টার্নওভার করের হার ৩ শতাংশ, কার্বনেটেড ও মিষ্টি পানীয় প্রস্তুতকারকের ক্ষেত্রে ২.৫ শতাংশ, মোবাইল ফোন অপারেটর ও এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১.৫ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি সংস্থা কর্তৃক সার, বীজ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের আমদানি ও বিক্রয়, কমিশন ব্যবসা, ডেলিভারি অর্ডার (DO) ব্যবসা এবং মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসাকে এই বিধানের বাইরে রাখা হয়েছে।
এই বিধানের পেছনে সরকারের উদ্দেশ্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মুনাফা নির্ধারণ করা কঠিন হয়। কেউ কেউ সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করেন না, আবার কেউ আয় গোপন বা অতিরঞ্জিত ব্যয় দেখিয়ে করযোগ্য আয় কমিয়ে ফেলেন। ফলে ন্যূনতম রাজস্ব নিশ্চিত করা এবং কর ফাঁকি প্রতিরোধের লক্ষ্যে টার্নওভারভিত্তিক করের বিধান রাখা হয়েছে। কর প্রশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার একটি উপায়।
তবে বাস্তব ব্যবসায়িক পরিবেশে এর প্রভাব সব ক্ষেত্রে একরকম নয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা সীমিত মূলধন নিয়ে পরিচালিত হয়। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ ব্যাংক সুদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে অনেক ব্যবসা খুব কম মুনাফায় কিংবা লোকসানে পরিচালিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রকৃত লাভের পরিবর্তে টার্নওভারের ওপর কর নির্ধারণ অনেক উদ্যোক্তার জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ধরা যাক, রহিম ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বছরে মোট বিক্রয় ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু পণ্য ক্রয়, দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, পরিবহন ব্যয়, ব্যাংক ঋণের সুদ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় পরিশোধের পর দেখা গেল প্রতিষ্ঠানটি ১ লাখ টাকা লোকসানে রয়েছে। সাধারণ আয়কর ব্যবস্থায় করযোগ্য আয় না থাকায় তার কর দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু ধারা ১৬৩-এর আওতায় প্রতিষ্ঠানটি যদি ১ শতাংশ টার্নওভার করের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে তাকে ৫০ হাজার টাকা টার্নওভার কর পরিশোধ করতে হতে পারে। অর্থাৎ, প্রকৃত মুনাফা না থাকলেও করের দায় সৃষ্টি হবে।
আরেকটি উদাহরণ ধরা যাক। একটি মুদি দোকানের বার্ষিক বিক্রয় ১ কোটি টাকা। বছরের শেষে ব্যবসায়ীর প্রকৃত মুনাফা হলো মাত্র ২ লাখ টাকা। যদি টার্নওভারের ওপর ১ শতাংশ কর প্রযোজ্য হয়, তাহলে তাকে ১ লাখ টাকা কর দিতে হবে। অর্থাৎ, অর্জিত মুনাফার অর্ধেকই কর হিসেবে চলে যাবে। এতে ব্যবসার কার্যকর মূলধন কমে যাবে এবং ভবিষ্যতে ব্যবসা সম্প্রসারণের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অবশ্য টার্নওভার করকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলাও সঠিক হবে না। ন্যূনতম কর নিশ্চিত করা, কর ফাঁকি প্রতিরোধ করা এবং কর প্রশাসনের কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে এর ভূমিকা রয়েছে। তবে কর ফাঁকি রোধের ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যাতে সৎ করদাতা ও প্রকৃত লোকসানগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন। করনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রাজস্ব আহরণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি করা।
এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকরা প্রকৃত লোকসানে থাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য যুক্তিসঙ্গত রেয়াত, কম মুনাফার ব্যবসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা অথবা নির্দিষ্ট শর্তে টার্নওভার কর পুনর্বিবেচনার সুযোগ বিবেচনা করতে পারেন। একই সঙ্গে ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ, স্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদন এবং কার্যকর নিরীক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে প্রকৃত আয় নির্ধারণ সহজ হবে এবং টার্নওভারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রয়োজনও কমে আসবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাই উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই করনীতি এমন হওয়া উচিত, যা একদিকে সরকারের রাজস্ব নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা ও সম্প্রসারণে উৎসাহিত করবে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ এবং অর্থ আইন, ২০২৬-এর সংশোধনী নিঃসন্দেহে রাজস্ব সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এর বাস্তব প্রয়োগে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার বাস্তবতা, প্রকৃত লাভ-লোকসান এবং করদাতার আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
করব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন রাষ্ট্র ন্যায্যভাবে রাজস্ব আহরণ করতে পারে এবং সৎ করদাতাও স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত হন। টার্নওভার কর যেন রাজস্ব সুরক্ষার কার্যকর হাতিয়ার হয়, কিন্তু প্রকৃত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য অযৌক্তিক বোঝায় পরিণত না হয় সেই ভারসাম্য নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সময়ের দাবি।
লেখক: হাসানুর রহমান, অ্যাডভোকেট ও আয়কর আইনজীবী, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা। ইমেইল: hasanur51@gmail.com

