ফিরোজ উদ্দিন তপু : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ৮০(১) অনুচ্ছেদ এবং কার্যপ্রণালী বিধি-২(১)(ঠ) অনুসারে আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে আনীত প্রস্তাবকে বিল হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অর্থাৎ বিল হলো আইনে পরিণত হওয়ার পূর্ব অবস্থা। সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধিতে ফাইন্যান্স বিলের (Finance Bill) কোনো সংজ্ঞা প্রদান করা হয়নি এবং ফাইন্যান্স বিল (Finance Bill) বলতে আক্ষরিক অর্থে কোনো বিলের অস্তিত্ব সংবিধান এবং কার্যপ্রণালী বিধিতে পাওয়া যায় না। মূলত ফাইন্যান্স বিল (Finance Bill) বলতে সরকারের আর্থিক প্রস্তাবাবলিকে কার্যকরকরণ এবং কতিপয় আইন সংশোধনকল্পে আনীত বিলকে বোঝায়, যা সংবিধানের ৮৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি অর্থে ‘প্রত্যেক অর্থ বৎসর সম্পর্কে উক্ত বৎসরের জন্য সরকারের অনুমিত আয় ও ব্যয় সংবলিত একটি বিবৃতি’।
আবার কার্যপ্রণালী বিধির ১১১ বিধি অনুসারে সংবিধানের ৮৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত বার্ষিক আর্থিক বিবৃতিকে ‘বাজেট’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। অর্থ বিল (Money Bill) বলতে সংবিধানের ৮১(১) এর দফা-(ক) হতে (চ) বর্ণিত বিষয়সমূহের সকল বা যেকোনো একটি সম্পর্কিত বিধানাবলী সংবলিত বিল এবং অর্থ বিলের সহিত অন্যান্য বিল যেমন, মূল্যসংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, আয়কর আইন এবং কাস্টমস আইনের সংশোধন সম্পর্কিত যা প্রজাতন্ত্রের বাজেটে প্রতিফলিত রূপের বৈধকরণের দৃশ্যায়ন।
সংবিধানের ৯০ অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্দিষ্টকরণ বিল (Appropriation Bill) বলতে সংবিধানের ৮৯ অনুচ্ছেদের অধীন মঞ্জুরীদানের পর সংযুক্ত তহবিল হতে ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় সকল অর্থ নির্দিষ্টকরণের বিধান সংবলিত বিলকে বোঝায়। আবার ৯১ অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল (Appropriation (Supplementary) Bill) বলতে প্রজাতন্ত্রের নির্দিষ্ট কর্মবিভাগের অনুমোদিত ব্যয় অপর্যাপ্ত হলে বা বার্ষিক আর্থিক বিবৃতিতে অন্তর্ভুক্ত হয় নাই অথবা মঞ্জুরিকৃত অর্থের অধিক ব্যয় হলে উক্ত অপর্যাপ্ত ব্যয় বা অধিক ব্যয় সংযুক্ত তহবিল হতে নির্বাহের জন্য আনীত বিল।
এই তিনটি বিলে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য ও কারণ উল্লেখ থাকে। এইরূপ প্রত্যেকটি বিলে অর্থ ব্যয়ের প্রশ্ন জড়িত বিধায় এই বিলগুলো একটি অর্থ বিল (Money Bill) এবং সংবিধানের ৮২ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো বিলে অর্থ ব্যয়ের প্রশ্ন জড়িত থাকলে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সুপারিশের প্রয়োজন হয়।
প্রত্যেক অর্থ বছরে সংসদে পাসের পর অর্থ বিল মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য প্রেরণ করা হলে সংবিধানের ৮১ অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রত্যেক অর্থ বিলের সহিত মাননীয় স্পিকারের স্বাক্ষর সংবলিত সার্টিফিকেট থাকে। এ ব্যাপারে স্পিকারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত এবং আদালতে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় না। উপরোক্ত বিলসমূহের বৈশিষ্ট্য, সংসদে উত্থাপন ও পাসের ধরণ আলাদা এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।
নির্দিষ্টকরণ বিল (Appropriation Bill), নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল (Appropriation (Supplementary) Bill) এবং অর্থ বিল (Money Bill) মাননীয় মন্ত্রী (অর্থমন্ত্রী) সংসদে উত্থাপন করেন বিধায় এই বিলগুলো সরকারি বিল (Public Bill) এবং বিলগুলো একসাথে অর্থমন্ত্রণালয় হতে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্য সংসদে প্রেরণ করা হয়। কার্যপ্রণালি বিধি এর বিধি ১১১(৩)-তে উল্লিখিত ‘বাজেট’, বিধি ১২৬(১)-এর শর্তাংশে উল্লিখিত ‘নির্দিষ্টকরণ বিল (Appropriation Bill)’ এবং ১২৭(৬) বিধিতে উল্লিখিত ‘অর্থবিল (Money Bill)’ কোনো কমিটিতে প্রেরণ করা যায় না; অর্থাৎ এই বিলসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোনো কমিটিতে প্রেরণের সুযোগ নেই।
বিলসমূহের মধ্যে উল্লিখিত তিনটি বিল প্রত্যেক অর্থ বছরের ৩০ জুনের মধ্যে সংসদ সদস্যগণের ভোটে সংসদে পাস করার বাধ্যবাধকতা বিদ্যমান এবং বিল প্রত্যাহারের সুযোগ নেই। রেওয়াজ অনুসারে নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল (Appropriation (Supplementary) Bill) যেদিন সংসদে উত্থাপন করা হয় সেইদিনই মাননীয় সংসদ সদস্যগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে প্রথমে পাস করা হয়, তারপর অর্থ বিল (Money Bill) এবং সবশেষে নির্দিষ্টকরণ বিল (Appropriation Bill) সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয়।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮০(৩) অনুসারে মহামান্য রাষ্ট্রপতির নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল (Appropriation (Supplementary) Bill), নির্দিষ্টকরণ বিল (Appropriation Bill) এবং অর্থ বিল (Money Bill) অথবা এর কোনো বিশেষ বিধান পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি ৩০ জুনের মধ্যে নির্দিষ্টকরণ বিল (Appropriation Bill) এবং অর্থ বিল (Money Bill)-এ সম্মতি প্রদান করে থাকেন। ইন্ডিয়ার লোকসভার কার্যপ্রণালি বিধির ২১৯ বিধি অনুসারে বাজেট সংশ্লিষ্ট বিলসমূহকে ফাইন্যান্স বিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে উপরোক্ত তথ্য বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়: সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধিতে ফাইন্যান্স বিল (Finance Bill) নামক আক্ষরিক কোনো শব্দের উল্লেখ ও ব্যবহার না থাকলেও নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল (Appropriation (Supplementary) Bill), নির্দিষ্টকরণ বিল (Appropriation Bill) এবং অর্থ বিল (Money Bill)-এর প্রায়োগিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রজাতন্ত্রের বাজেট ব্যবস্থাপনার বৈধতাদানের সমন্বিত রূপকে ফাইন্যান্স বিল (Finance Bill) বলা যায়।
এখন প্রশ্ন হলো, সংবিধানের ৮১ ও ৮২ অনুচ্ছেদের শর্তানুসারে কোনো সরকারি বা বেসরকারি বিলে অর্থ ব্যয়ের প্রশ্ন থাকলেই উক্ত বিলকে অর্থ বিল বলা যায়? সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো বিলে সংবিধানের ৮১ এবং ৮২ অনুচ্ছেদের শর্তাবলীর পূর্ণতা থাকলে সকল সরকারি এবং বেসরকারি বিলকে অর্থ বিল বলা যায়; যেমন—নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২৬। নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সরকারের অর্থ ব্যয়ের প্রশ্ন জড়িত এবং সংবিধানের ৮২ অনুচ্ছেদ অনুসারে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সুপারিশের প্রয়োজন হয় বিধায় বিলটি একটি অর্থ বিল। সেইসাথে এই বিলটি একটি সরকারি বিল এবং মন্ত্রী সংসদে উত্থাপন করে পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রিপোর্ট প্রদানের জন্য প্রস্তাব করতে পারেন। আবার বিলটি যদি বেসরকারি বিল হয় সেক্ষেত্রে বিলটি উত্থাপনের পর কার্যপ্রণালী বিধির ২২৩ বিধি অনুসারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বেসরকারি বিল সম্পর্কিত কমিটিতে প্রেরণ করা যায়। কার্যপ্রণালি বিধির ৯০ বিধি অনুসারে যেকোনো পর্যায়ে অনুমতি সাপেক্ষে বিল প্রত্যাহার করা যায়।
ফাইন্যান্স বিলকে কখনই বেসরকারি বিল বলা যায় না! কারণ এই বিলের উত্থাপনকারী মাননীয় অর্থমন্ত্রী এবং তিনি ব্যতীত অন্যকোনো সংসদ সদস্য বাজেট বা ফাইন্যান্স বিল সংসদে উত্থাপন করার নজির নেই এবং কার্যপ্রণালি বিধির ১১১(২) বিধি অনুযায়ী তিনি যেমন উপযোগী মনে করেন তেমন করে বাজেট উত্থাপন করেন।
ফাইন্যান্স বিল যথা—নির্দিষ্টকরণ বিল (Appropriation Bill), নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল (Appropriation (Supplementary) Bill) এবং অর্থ বিল (Money Bill) সরাসরি অর্থ বিল। এই তিনটি বিলের শেষ পৃষ্ঠায় উল্লেখ থাকে—’ইহা একটি অর্থ বিল এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতির সুপারিশ পাওয়া গেছে’। পক্ষান্তরে, অন্যসব বিল ঘটনাচক্রে অর্থ বিল হিসেবে বিবেচিত হয় যদি বিলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রশ্ন জড়িত থাকে এবং বিলটি অর্থ বিল সে সম্পর্কে কোনো বিবৃতি বিলে উল্লেখ থাকে না। ফলে এটা বলা যায়: “সব ফাইন্যান্স বিলই (Finance Bill) অর্থ বিল কিন্তু সব অর্থ বিল (Money Bill) ফাইন্যান্স বিল না”।
লেখক: ফিরোজ উদ্দিন তপু; লেজিসলেটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট, আইন প্রণয়ন শাখা-১ ও আইন প্রণয়ন শাখা-৩ (সংযুক্তি), বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়। ইমেইল: firojlawru@gmail.com

