কামাল হোসেন মিয়াজী: বাংলাদেশে আমরা সাধারণভাবে ‘সরকারি চাকরি’ কথাটি বেশ বিস্তৃত অর্থে ব্যবহার করি। কেউ মন্ত্রণালয় বা সরকারি দপ্তরে চাকরি করেন, আবার কেউ বিসিআইসি (BCIC), বিএডিসি (BADC), পেট্রোবাংলা বা এর অধীনস্থ কোম্পানি, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (PDB) কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয়, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। প্রচলিত অর্থে এঁদের সবাইকে আমরা সরকারি চাকরিজীবী বলি। কিন্তু আইনের চোখে তাঁদের সবার পরিচয় এক নয়। বিশেষ করে ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তি’ এবং ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি’—এই দুটি ধারণা সব ক্ষেত্রে এক নয়।
এই দুইয়ের মধ্যে ফারাকটা জানা জরুরি এই জন্য যে, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে চাকরি সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় এই পার্থক্যটি প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আবেদনকারী প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি, নাকি কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কর্মচারী—এর ওপর নির্ভর করতে পারে তাঁর চাকরি কোন আইন বা বিধি দ্বারা পরিচালিত হবে, তিনি কোন সুবিধা দাবি করতে পারবেন এবং কোন পথে তাঁর প্রতিকার চাইতে হবে। তাই বিষয়টি কেবল সংজ্ঞার পার্থক্য নয়; সঠিক আইনগত অধিকার ও প্রতিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এর বাস্তব গুরুত্ব রয়েছে।
বিষয়টি বুঝতে সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে দেওয়া ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম’-এর সংজ্ঞাটি দেখা প্রয়োজন। সেখানে ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম’ বলতে ‘অসামরিক বা সামরিক ক্ষমতায় বাংলাদেশ সরকার-সংক্রান্ত যে কোনো কর্ম, চাকরি বা পদ এবং আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্ম বলিয়া ঘোষিত হইতে পারে এইরূপ অন্য কোনো কর্ম’ বোঝানো হয়েছে। এখানে ‘বাংলাদেশ সরকার-সংক্রান্ত’ কথাটিই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ এই নয় যে সরকার কোনো প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেছে, অর্থায়ন করছে বা নিয়ন্ত্রণ করছে বলেই সেই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রত্যেকে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত হয়ে যাবেন। সংশ্লিষ্ট কর্ম, পদ বা দপ্তরটির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের আইনগত সম্পর্কের প্রকৃতি কী, এ ক্ষেত্রে কে নিয়োগ দেয়, কে অপসারণ করতে পারে, চাকরিটি কোন আইন বা বিধি দ্বারা পরিচালিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট পদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণের প্রকৃতি কী—এসব বিষয় প্রাসঙ্গিক। তাই সরকারের অধীন কোনো পদে চাকরি করা এবং সরকারের প্রতিষ্ঠিত বা নিয়ন্ত্রিত কোনো সংস্থা বা করপোরেশনে চাকরি করা আইনগতভাবে সব সময় এক বিষয় নয়। কোনো ব্যক্তির চাকরিকে ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম’ বলতে হলে শেষ পর্যন্ত দেখতে হবে তাঁর কর্ম, পদ বা দপ্তরটি সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদের অর্থে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, অথবা কোনো আইন সেটিকে প্রজাতন্ত্রের কর্ম হিসেবে ঘোষণা করেছে কি না।
একটি সহজ উদাহরণে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সরাসরি সরকারের একটি পদে চাকরি করছেন। তাঁর নিয়োগ, চাকরির শর্ত, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা ও অবসর সরকারি চাকরির কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। তিনি নিঃসন্দেহে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি।
অন্যদিকে, ধরা যাক একজন কর্মকর্তা বিসিআইসির নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামোর একটি পদে সরাসরি নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁর নিয়োগ দিয়েছে বিসিআইসি এবং তাঁর চাকরি পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব চাকরি প্রবিধান অনুযায়ী। বিসিআইসি একটি রাষ্ট্রীয় বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান—শুধু এই কারণে সেই কর্মকর্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানের অর্থে ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি’ হয়ে যাবেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তাঁর প্রকৃত আইনগত অবস্থান নির্ধারণের জন্য (উপযুক্ত আদালতে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রতিকার পেতে হলে) সংশ্লিষ্ট আইন, চাকরি প্রবিধান, পদের উৎস এবং নিয়োগের প্রকৃতি দেখতে হবে।
এখানে একটি সহজ সূত্র মনে রাখা যেতে পারে—কোথায় চাকরি করেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আইনগতভাবে কার চাকরি করেন।
এই পার্থক্যের ব্যবহারিক গুরুত্ব সবচেয়ে সহজে বোঝা যায় সরকারি সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে। ধরা যাক, সরকার কোনো আইন, বিধি, প্রজ্ঞাপন বা পরিপত্রে বলল—‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিগণ অমুক বিশেষ সুবিধা পাবেন।’ তখন কোনো রাষ্ট্রীয় বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী শুধু এই যুক্তিতে সেই সুবিধা দাবি করতে পারবেন না যে তাঁর প্রতিষ্ঠানটি সরকারি। প্রথমে দেখতে হবে, তিনি আইনগত অর্থে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কি না এবং সংশ্লিষ্ট আইন বা প্রজ্ঞাপনটি তাঁর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য কি না।
বেতন-ভাতা, বিশেষ ভাতা, পেনশন, গ্র্যাচুইটি, পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা, ছুটি কিংবা অন্য কোনো চাকরিগত সুবিধার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন উঠতে পারে। সরকার তার নিজস্ব কর্মচারীদের কোনো সুবিধা দিলে সেই সুবিধা রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সব সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে—এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আইন বা চাকরি প্রবিধানে সেই সুবিধা গ্রহণ (adopt) করার ব্যবস্থা থাকতে পারে; প্রতিষ্ঠানটির উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ সরকারি সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করতে পারে; অথবা সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনেই এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। অধিকারটি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট আইনগত ব্যবস্থার ওপর।
এই বিষয়ে ২০১৯ সালে আপিল বিভাগ প্রদত্ত Civil Appeal Nos. 48–54 of 2017 এবং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো নিষ্পত্তি শেষে common judgment-এ এই পার্থক্যের বাস্তব দিকটি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। সেখানে সরকারি কর্মচারী এবং আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বিভিন্ন করপোরেশনের কর্মচারীদের চাকরি ও অবসর-সুবিধার প্রশ্ন বিবেচিত হয়। আপিল বিভাগ সুস্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করেন যে, দুই শ্রেণির কর্মচারীর নিয়োগের ধরন, দায়িত্ব, চাকরির শর্ত ও সুযোগ-সুবিধা এক নয়। আদালত বলেন, সরকারি কর্মচারীদের কোনো সুবিধা দেওয়া হয়েছে অথচ করপোরেশনের কর্মচারীদের তা দেওয়া হয়নি—শুধু এই কারণে বৈষম্যের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় না। সংশ্লিষ্ট করপোরেশন বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের অধিকার তাঁদের নিজ নিজ আইন ও চাকরি বিধি বা প্রবিধান অনুসারেই নির্ধারিত হবে।
সংবিধানের ১১৭ অনুচ্ছেদের ভাষাও এই পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। সেখানে একদিকে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের চাকরির শর্তের কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও বিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের চাকরির বিষয় আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে Administrative Tribunals Act, 1980-এ ব্যবহৃত হয়েছে—“person in the service of the Republic or of any statutory public authority”। অর্থাৎ আইন নিজেই প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি কে পাশাপাশি, কিন্তু পৃথকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারের সৃষ্টি, সরকার তার অর্থায়ন করে, তার পরিচালনায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কিংবা প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ জনসেবা প্রদান করে—এসব কারণে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্ত বা নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন রিট মামলা চলতে পারে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রিট মামলা চলে কি না এবং সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি’ কি না—এ দুটি ভিন্ন আইনগত প্রশ্ন।
কোনো ব্যক্তির প্রকৃত চাকরিগত পরিচয় নির্ধারণে তাই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে—পদটি সৃষ্টি করেছে কে, নিয়োগ দিয়েছে কে, কোন আইন বা চাকরি প্রবিধান তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা কার হাতে এবং সর্বোপরি তাঁর কর্ম বা পদটি বাংলাদেশ সরকারের কর্ম বা পদ, নাকি পৃথক কোনো সংবিধিবদ্ধ বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্ম বা পদ।
একইভাবে আইন, বিধি, প্রজ্ঞাপন বা পরিপত্রে কোনো সুবিধা দেওয়া হলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, বিশেষভাবে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন রিট মামলায়—সুবিধাটি কাদের জন্য দেওয়া হয়েছে? সেখানে যদি বলা হয় ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিগণ’, তাহলে সেই সাংবিধানিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। আর যদি বলা হয় ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ’, তাহলে সুবিধাটির পরিধি স্বাভাবিকভাবেই বিস্তৃত হবে। অর্থাৎ একটি প্রজ্ঞাপনে ব্যবহৃত কয়েকটি শব্দই কখনো কখনো বহু কর্মচারীর চাকরিগত ও আর্থিক অধিকারের সীমা নির্ধারণ করে দিতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধান ও চাকরি-আইনের কাঠামো থেকে তাই একটি বিষয় পরিষ্কার—‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী’ এবং ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি’ সমার্থক নয়। একজন ব্যক্তি সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেও সেই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কর্মচারী হতে পারেন; আবার একজন সরকারি কর্মকর্তা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করেও প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত থাকতে পারেন। যেমন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি প্রেষণে (deputation) বিসিআইসিতে (BCIC) দায়িত্ব পালন করেন, তাঁর কর্মস্থল তখন বিসিআইসি। কিন্তু তাঁর মূল সরকারি পদ ও চাকরির সম্পর্ক যদি বহাল থাকে, তাহলে শুধু কর্মস্থল পরিবর্তনের কারণে তাঁর প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি হিসেবে আইনগত পরিচয় হারিয়ে যায় না।
পার্থক্যটি তাই কেবল শব্দের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে একজন কর্মচারীর চাকরি কোন আইন বা প্রবিধান দ্বারা পরিচালিত হবে, তিনি কোন সরকারি সুবিধা দাবি করতে পারবেন, তাঁর চাকরিসংক্রান্ত বিরোধের উপযুক্ত প্রতিকার কী এবং কোন আইনি পথে সেই প্রতিকার চাইতে হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু—‘আপনি কোথায় চাকরি করেন?’ নয়; আইনের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—‘আপনি আইনগতভাবে কার চাকরি করেন এবং কোন আইন আপনার চাকরিকে নিয়ন্ত্রণ করে?’
লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

