আখতার জাবেদ : বরিশালে যা ঘটেছে, তা শুধু একটি জামিন আদেশকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক আইনি সংস্কৃতি, পেশাগত শালীনতা এবং বিচারিক মর্যাদাবোধের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ।
২০১৮ সালের একটি মারামারির ঘটনার প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর একটি মামলা দায়ের হয়। মামলার কয়েকজন আসামি ইতোমধ্যে জামিনে আছেন। সেই মামলার একজন অভিযুক্ত আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। তিনি একজন আইনজীবী; এক সময় বরিশাল আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সম্পাদক ছিলেন, সংসদ সদস্যও ছিলেন, বর্তমানে বয়স্ক ও গুরুতর অসুস্থ। মামলার ফ্যাক্টস বিবেচনায় তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ জামিনযোগ্য ধারার অন্তর্ভুক্ত।
জামিনযোগ্য ধারায় জামিন পাওয়া কোনো করুণা নয়; এটি আসামির আইনগত অধিকার। রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত মতাদর্শ কিংবা সামাজিক অবস্থান—কোনোটিই এখানে বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। আদালত যদি জামিনযোগ্য ধারায় জামিন না দেয়, তবে সেটিই হবে আইনের ব্যত্যয়; সেটিই হবে এক ধরনের অপরাধ।
সুতরাং বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পিআর তথা তদন্ত রিপোর্ট দাখিল পর্যন্ত আসামিকে জামিন দিয়েছেন—যে কোনো ন্যায়বোধের মানদণ্ডেই এটি একটি যুক্তিসংগত ও আইনসম্মত আদেশ। আদালতের আদেশে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে তার জন্য উচ্চতর আদালতে যাওয়ার সাংবিধানিক ও আইনগত অবারিত সুযোগ রয়েছে—মহানগর দায়রা আদালত, হাইকোর্ট ডিভিশন, এমনকি আপিলেট ডিভিশন পর্যন্ত।
আরও পড়ুন : বরিশালে এজলাসে ঢুকে হট্টগোলের ঘটনায় আইনজীবী সমিতির সভাপতি আটক
কিন্তু তার পরিবর্তে যা ঘটেছে, তা আমাদের পেশার জন্য লজ্জাজনক, আইনের শাসনের জন্য গভীর উদ্বেগজনক। আদালতের এজলাসে ভাঙচুর, পেশিশক্তির প্রদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট বিচারককে চরমভাবে অপমান—এসব কেবল অশোভন নয়, দেশের পুরো বিচারব্যবস্থার প্রতি সরাসরি অবমাননা। যে বিচারক জামিন মঞ্জুর করেছেন, তাঁকে আমি ব্যক্তিগতভাবেই জানি; বিচারিক সততা, যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা, ন্যায়পরায়ণতা ও সৎসাহসের মানদণ্ডে তিনি বিচার বিভাগের এক অমূল্য রত্ন। তাঁকে অপদস্থ করা মানে পুরো বিচারব্যবস্থাকেই আঘাত করা।
আইনজীবীদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে—এটি গণতান্ত্রিক বাস্তবতা। কিন্তু আদালতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের একমাত্র পরিচয় হওয়া উচিত “আইনজীবী”, ন্যায়ের সহযোদ্ধা। তেমনি বিচারপ্রার্থীও আদালতে দাঁড়ালে কেবলই বিচারপ্রার্থী; তার দল, মত বা বিশ্বাস সেখানে প্রাসঙ্গিক নয়। ধর্ম, বর্ণ, জাতি কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে জামিন মঞ্জুর বা নামঞ্জুর করার কোনো সুযোগ একজন বিচারকের নেই, এবং থাকা উচিতও নয়। কারণ আদালত মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল; এখানে আবেগ নয়, আইন কথা বলে।
এই ঘটনাকে কেউ কেউ “প্রতিবাদ” বলছেন। তাঁদের বিনীতভাবে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, এজলাস ভাঙচুর কোনো আইনি যুক্তি নয়; এটি যুক্তির দেউলিয়াপনা, পেশাগত দেউলিয়াপনা, আদর্শিক দেউলিয়াপনা। আদালতে যদি হাতের জোরেই কথা বলতে হয়, তবে আইন পড়ার প্রয়োজন কী? আইনজীবীর গাউন কি তাহলে কেবল একটি পোশাক, নাকি একটি নৈতিক দায়িত্ব?
আরও পড়ুন : ‘সাবেক প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতি করার চক্রান্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার’
তবে এটিও সত্য যে, সব আইনজীবী এমন নন। দেশে অসংখ্য বিবেকবান, মেধাবী ও নীতিবান আইনজীবী আছেন, যারা আইনের শাসনে বিশ্বাস করেন এবং আদালতের মর্যাদা রক্ষায় সর্বদা সচেষ্ট। আজকের ঘটনায় তাঁদের অনেকেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছেন—তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা রইল। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, গুটিকয়েক তথাকথিত আইনজীবী পরিচয়ে “মাস্তান টাইপ” ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের দায়ভার পুরো আইনজীবী সমাজ কেন নেবে?
আপনারা যাঁরা সত্যিকার অর্থে ‘বিজ্ঞ’—নামের আগে যে বিশেষণটি গর্বের সঙ্গে লেখা হয়—অন্তত সেই শব্দটির মর্যাদা রক্ষার্থে হলেও আরও সোচ্চার হোন, বিবেকবান হোন।
দেশে নতুন একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে জনকল্যাণে সরকার কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তাতে আমজনতা আশান্বিত হচ্ছে। তবে জনগণ আশা করছে, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা এবং বিচারিক মর্যাদা রক্ষায় তাঁরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন।
সুপ্রিম কোর্টসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি বিনীত প্রত্যাশা— এই ঘটনার বিরুদ্ধে কার্যকর, দৃষ্টান্তমূলক ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। কারণ বিচারকের সম্মান ব্যক্তিগত নয়; এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বোধের সম্মান। আদালতের মর্যাদা রক্ষা করা কোনো পক্ষের এজেন্ডা নয়; এটি সমগ্র জাতির দায়িত্ব।
শেষে একটি কথা—আইন যদি বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে আর এজলাসে পেশিশক্তি কথা বলে, তবে ন্যায়বিচার আদালতে নয়, ইতিহাসের পাতায় আশ্রয় নেবে। আমরা কি সত্যিই সেই দিন দেখতে চাই?
লেখক : সিনিয়র সিভিল জজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

