অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক : আপনি জমি কিনলেন, টাকা দিলেন, কিন্তু দলিলের টেকনিক্যাল কোনো ভুলের কারণে আপনার মালিকানা আজ ঝুঁকির মুখে। এখন উপায় কী? মামলা নাকি আপস? এর সহজ সমাধান হলো বহালকরণপত্র বা বহালকরণ দলিল। কোর্টে না গিয়েই কীভাবে আপনার জমির নথিপত্র পানির মতো পরিষ্কার করে নেবেন, সে বিষয়ে আজকের নিবন্ধ।
ধরুন, আপনি একজনের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে জমি কিনতে গেছেন, কিন্তু মূল মালিক হঠাৎ মারা গেলেন। এখন আপনি কী করবেন? মামলা করবেন? একদম না! এখানেই কাজ করবে ‘বহালকরণ দলিল’। মালিকের ওয়ারিশরা যদি সদিচ্ছা দেখান, তবে একটিমাত্র দলিলের মাধ্যমে আপনার কোটি টাকার সম্পত্তি নিষ্কণ্টক করা সম্ভব।
আবার আপনি জমি কিনেছেন, অনেক আগে জমি রেজিস্ট্রিও করেছেন কিন্তু দলিলের স্বত্বে বা মালিকানায় ত্রুটি রয়েছে—এটা নিয়ে আইন-আদালতে দৌড়াদৌড়ি ও পেরেশানি না নিয়ে আপনি সহজেই পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে পূর্বের দলিলকে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে পারবেন, এটাই হচ্ছে বহালকরণ দলিল। সহজ কথায়, যদি কোনো দলিলে পূর্বে কোনো আইনগত ত্রুটি থেকে থাকে, তবে পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতিতে সেই ত্রুটি স্বীকার করে নিয়ে এবং আগের দলিলটিকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে যে নতুন দলিলটি রেজিস্ট্রি করা হয়, তাকেই বহালকরণ দলিল বলা হয়। এটি মূল দলিলকে সংশোধন করে না, বরং আগের দলিলের কার্যকারিতাকে আইনিভাবে মজবুত ও নিষ্কণ্টক করে।
আরও পড়ুন : মাইকেল মধুসূদন দত্ত: ব্যারিস্টার হয়ে ওঠার গল্প এবং এ পেশায় তাঁর মূল্যায়ন
আরেকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে। ধরুন, আজ থেকে ১০ বছর আগে আপনি একটি জমি কিনেছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর জমির মালিক ছিলেন তখন ছোট শিশুটি। শিশুটির প্রয়োজনেই তাঁর মা অভিভাবক হিসেবে জমিটি আপনার কাছে রেজিস্ট্রি করে দেন। কিন্তু আইন অনুযায়ী শিশু সন্তানের পক্ষে মাকে জমি বিক্রি করতে হলে অবশ্যই আদালতের কাছ থেকে অভিভাবকত্ব ও সেল পারমিশন নিতে হয়। আইনগত কোনো জটিলতায় হোক কিংবা অজ্ঞতার কারণেই হোক, সেটা হয়নি। এখন সেই নাবালক সন্তান আজ সাবালক হয়েছে। সে এসে দাবি করল, “আমার মা যখন জমিটি বিক্রি করেছেন, আমি তখন ছোট ছিলাম এবং আমার কল্যাণে এই টাকা ব্যয় হয়নি। তাই আমি এই বিক্রি মানি না!”
ব্যাস! আপনার পায়ের তলার মাটি সরে যাওয়ার অবস্থা। জমিটি এখন হাতছাড়া হওয়ার মুখে। এখন আপনি কী করবেন? মামলা? কোর্ট-কাচারি? না! “বহালকরণ দলিল।” এই সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে একটি ‘বহালকরণ দলিলে’। আপনি যদি সেই সাবালক হওয়া ব্যক্তির সাথে কথা বলে তাঁকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন এবং সে যদি রাজি হয়, তবে সে একটি ‘বহালকরণ দলিল’ বা Confirmation Deed করে দেবে। সেখানে সে উল্লেখ করবে যে, “আমার শৈশবে আমার অভিভাবক আমার মঙ্গলের জন্যই জমিটি বিক্রি করেছিলেন। আজ আমি সাবালক হয়ে সেই পূর্বের সম্পাদিত দলিলটিকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছি এবং তা বহাল রাখছি।”
ব্যাস! একটিমাত্র দলিলের মাধ্যমে আপনার ১০ বছরের পুরনো সেই বিতর্কিত দলিলটি মুহূর্তেই নিষ্কণ্টক হয়ে গেল। এর জন্য আপনাকে আদালতের বারান্দায় বছরের পর বছর দৌড়াতে হলো না। এভাবে একটু সচেতন হলেই আমরা আইন-আদালতে সময়ক্ষেপণ থেকে রক্ষা পেতে পারি।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। ই-মেইল: seraj.pramanik@gmail.com

