মোকাররামুছ সাকলান
মোকাররামুছ সাকলান

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ: আইনি অযোগ্যতা ও ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘনের প্রশ্ন

মোকাররামুছ সাকলান : সম্প্রতি মোঃ মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন সামনে এসেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার কিছুদিন আগে তাঁর মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল (Reschedule) করা হয়েছে।

এই তথ্যটি যদি বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর বিধানের আলোকে বিবেচনা করা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—এই নিয়োগ আদৌ আইনি দৃষ্টিতে টেকসই কি না।

আইনটি একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লে মনে হয়, এই নিয়োগটি আইনের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে (Ultra Vires) করা হয়েছে কি না—সেই প্রশ্ন উত্থাপনের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার অনুযায়ী অযোগ্যতার যে নিয়ম আছে, তার নিরিখে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এ স্পষ্টভাবে বলা আছে, কোন কোন ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি গভর্নরের পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার অযোগ্য হবেন।

এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো—কেউ যদি সরকার, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধে খেলাপি হন, তাহলে তিনি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

(9) No person shall hold office as Governor or Deputy Governor … (d) has defaulted in payment of dues of the Government or of any banking company or any financial institutions.

এই বিধানের পেছনে যুক্তিটা খুবই পরিষ্কার। একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান ব্যক্তির আর্থিক সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নাতীত হতে হবে। তাই আইন প্রণেতারা সচেতনভাবেই ব্যাংক ঋণে খেলাপি ব্যক্তিদের এই পদে বসার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখানে ব্যবহৃত ভাষা খুবই বিস্তৃত। আইনে শুধু বর্তমান খেলাপিদের কথা বলা হয়নি; বরং বলা হয়েছে যিনি “has defaulted”, অর্থাৎ কোনো সময়ে খেলাপি হয়েছেন। এই শব্দগুচ্ছের স্বাভাবিক অর্থ হলো—অতীতে খেলাপি হওয়ার ঘটনাও এর মধ্যে পড়তে পারে।

দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮৯ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের মালিকই বর্তমান গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।

সাধারণত কোনো ঋণ যদি নিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়, তাহলে সেটি পুনঃতফসিল করার প্রয়োজন হয় না। পুনঃতফসিলের সুযোগ সাধারণত তখনই দেওয়া হয়, যখন ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন অথবা ঋণটি চাপের মধ্যে পড়ে।

অর্থাৎ, ঋণ পুনঃতফসিলের ঘটনা থেকেই বোঝা যায় যে কোনো না কোনো পর্যায়ে ঋণ পরিশোধে সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

যদি সত্যিই দেখা যায় যে হেরা সোয়েটার্সের ঋণটি পুনঃতফসিলের আগে খেলাপি অবস্থায় ছিল, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের বিধান অনুযায়ী সেটি সরাসরি আইনি অযোগ্যতার মধ্যে পড়তে পারে।

এখন দেখা যাক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে নিয়োগের প্রশ্ন কখন দেখা দেয়। আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—সরকারি কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই আইনের নির্ধারিত সীমার মধ্যেই কাজ করতে হবে।

যখন কোনো আইনে স্পষ্টভাবে বলা থাকে যে নির্দিষ্ট ধরনের ব্যক্তি কোনো পদে থাকতে পারবেন না, তখন সেই শর্ত উপেক্ষা করে করা নিয়োগ আইনগতভাবে অবৈধ হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা অবশ্যই সরকারের আছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা সীমাহীন নয়। এটি একটি আইনি ক্ষমতা, এবং সেই ক্ষমতা ব্যবহার করতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের বিধান মেনে।

যদি আইনে স্পষ্টভাবে বলা থাকে যে ঋণ খেলাপি ব্যক্তি এই পদে থাকতে পারবেন না, তাহলে সেই শর্ত অমান্য করে করা নিয়োগকে আইনের ভাষায় শুরু থেকেই অবৈধ (Void Ab Initio) বলা হতে পারে।

স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আইনি অযোগ্যতার প্রশ্নের বাইরেও একটি নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ঋণ শ্রেণিবিন্যাস, পুনঃতফসিল নীতি, ব্যাংকিং শৃঙ্খলা—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত নীতিনির্ধারণের দায়িত্ব এই প্রতিষ্ঠানের।

এখন যদি সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তি নিজেই কিছুদিন আগে একটি ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা নিয়ে থাকেন, তাহলে সেখানে স্বাভাবিকভাবেই স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এখন সবার আগে প্রয়োজন একটি আইনি পর্যালোচনা। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ অবশ্যই আইনের বিধান মেনে হতে হবে।

যখন কোনো নিয়োগ নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে আইনি প্রশ্ন ওঠে, তখন সেটিকে শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি আইনি বিষয়, যার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রয়োজন।

এখানে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি—

১। হেরা সোয়েটার্স লিমিটেডের ঋণ কি পুনঃতফসিলের আগে খেলাপি ছিল?

২। সেই খেলাপি অবস্থা কি বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের অযোগ্যতার বিধানের মধ্যে পড়ে?

৩। নিয়োগ দেওয়ার আগে সরকার কি এই বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করেছে?

যদি দেখা যায় যে আইনগত শর্ত লঙ্ঘন হয়েছে, তাহলে সেই নিয়োগ আইনের চোখে টিকবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে কঠোর যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—ব্যাংক ঋণে খেলাপি ব্যক্তি এই পদে থাকতে পারবেন না।

যদি প্রমাণিত হয় যে বর্তমান গভর্নর অতীতে এমন একটি ঋণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা পরে পুনঃতফসিল করা হয়েছে, তাহলে তাঁর নিয়োগ বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং আইনের দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।

আইনের শাসন মানে শুধু আইন থাকা নয়; বরং সেই আইন বাস্তবে সমানভাবে প্রয়োগ হওয়া। দেশের যেকোনো নাগরিক এই প্রশ্ন উত্থাপন করে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।

লেখক : মোকাররামুছ সাকলান; আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।