ধর্মীয় বিষয়ে স্পর্শকাতর মন্তব্য: শেরপুরের জেলা জজকে প্রত্যাহার
বিচারক (প্রতীকী ছবি)

তালতলী শিশু পার্ক দখলমুক্ত করতে জাস্টিস অব দ্য পিস বিচারক শরিয়ত উল্লাহ’র স্ব-প্রণোদিত আদেশ

বরিশাল ব্যুরো | বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর ‘ত্রিশ গোডাউন’ ঘাটের পর এবার কাউনিয়া থানাধীন তালতলী শিশু পার্কটি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করতে ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী এক পদক্ষেপ নিয়েছেন বরিশালের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবং ‘জাস্টিস অব দ্য পিস’ এস, এম, শরিয়ত উল্লাহ।

টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে স্ব-প্রণোদিত (Suo Motu) হয়ে তিনি এই আদেশ জারি করেছেন।

বরিশাল মহানগরের কাউনিয়া থানাধীন আড়িয়াল খাঁ নদের পাড়ে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন ‘তালতলী শিশু পার্কটি’ একদল অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ দখলে চলে যাওয়ার খবর নজরে আসার পর নজিরবিহীন আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে আদালত। গতকাল ৩ জুন (বুধবার) বরিশালের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও ‘জাস্টিস অব দ্য পিস’ জনাব এস, এম, শরিয়ত উল্লাহ ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC), ১৮৯৮-এর ২৫ ধারা অনুযায়ী স্ব-প্রণোদিত হয়ে মিস কেস নং-০৩/২০২৬ রুজু করে এই আদেশ প্রদান করেন।

আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়, গত ৩০ মে ২০২৬ তারিখে একাত্তর টিভিতে “ব্যবসায়িদের দখলে শিশু পার্ক” শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। উক্ত সংবাদে দেখা যায়, আড়িয়াল খাঁ নদের কোলঘেঁষা এই শিশুপার্কটিতে এখন আর শিশুরা খেলাধুলা করতে পারে না। ৩-৪ বছর ধরে পার্কটি দখল করে সেখানে খেলনার পরিবর্তে বিশাল বালু-পাথরের স্তূপ ও মাছের ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। জেলা পরিষদের প্রশাসকও সংবাদে স্বীকার করেছেন যে, শিশুদের বিকাশের জন্য পার্কের উপযুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই।

বিচারক তাঁর আদেশে উল্লেখ করেন, সরকারি জমিতে নির্মিত এই পার্কে শিশুদের বিনোদনের পরিবর্তে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রচলিত আইনের চরম লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনস্বার্থে আদালত স্ব-প্রণোদিত হয়ে এই হস্তক্ষেপ করলেন।

আদালত সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে দেশের প্রচলিত একাধিক আইনের অধীনে কড়া নির্দেশনা জারি করেছেন:

  • ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উচ্ছেদ: সংশ্লিষ্ট অফিসার ইনচার্জ (ওসি, কাউনিয়া থানা)-কে এই আদেশ প্রাপ্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিশু পার্কের স্থানে থাকা সমস্ত অবৈধ স্থাপনা, বালু, পাথর বা বাণিজ্যিক মালামাল অপসারণপূর্বক আদালতকে লিখিতভাবে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

  • ডিসির মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের অনুসন্ধান: অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার (এডিসি) পদমর্যাদার নিচে নন, এমন একজন যোগ্য কর্মকর্তা দিয়ে পুরো ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধান পূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বরিশালের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আগামী ২২ জুন, ২০২৬ তারিখের মধ্যে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাকে নিম্নোক্ত ৫টি বিষয়ের সুনির্দিষ্ট উত্তরসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে:

১. শিশুপার্কের স্থানটি সরকারি সম্পত্তি কি-না?

২. কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পার্কটির উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করছেন কি-না?

৩. শিশুপার্কের স্থানে কেউ বালু-পাথর, মাছ বা অন্যবিধ কোনো ব্যবসা পরিচালনা করছেন কি-না?

৪. প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কারা এই অবৈধ দখলের সাথে জড়িত বা সম্পৃক্ত?

৫. সরকারি স্বার্থ ও সম্পত্তি রক্ষার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে?

আদালতের আদেশে কঠোরভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এর আগেও এই পার্ক থেকে অবৈধ বাজার উচ্ছেদ করা হলেও পুনরায় তা দখল করা হয়েছে। এই অভিযোগ সঠিক হয়ে থাকলে তা দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) ২৬৮, ৪২৭, ৪৩১, ৪৪১ ধারা সহ ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩’ এর ৭, ১০, ১১ ও ১২ ধারা অনুযায়ী মারাত্মক শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাকে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬১ ধারা অনুযায়ী সাক্ষীদের জবানবন্দি রেকর্ড, অপরাধের স্থান ও সময় এবং জড়িতদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানাসহ খসড়া মানচিত্র প্রস্তুত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

উক্ত আদেশের অনুলিপি সদয় অবগতির জন্য বরিশাল মহানগর দায়রা জজ, চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কমিশনার (বিএমপি), জেলা পরিষদ প্রশাসক ও কাউনিয়া থানার ওসির নিকট প্রেরণ করা হয়েছে।