ঐ নতুনের কেতন উড়ে!
অবশেষে প্রতীক্ষার প্রহর ঘুচলো; রুদ্ধ দুয়ারে আছড়ে পড়ল এক চিলতে অলৌকিক আলো। ভয় ছিল, ঝিনুকের রক্তক্ষরণে তিলে তিলে গড়া যে অমূল্য মুক্তো, তা বুঝি কোনো ‘উলুবনে’ পড়ে রয়! কিন্তু প্রকৃতির ন্যায়বিচারে সেই মুক্তো আজ খুঁজে পেয়েছে তার যোগ্য সিংহাসন।
তপ্ত মরুর বুকে স্ফটিকস্বচ্ছ পানির নহর কিংবা পৌষের হাড়কাঁপানো শীতে এক চিলতে আগুনের ওম যেমন পরম প্রাপ্তি, আজকের এই সংবাদটিও ঠিক তেমনই এক প্রশান্তি। ঋতুরাজ বসন্তের ফুলে ফুলে যখন মৌমাছিরা বিভোর, তখন আকাশের নীলিমা যেন আজ আরও গাঢ়। আজ সেই দিন, যখন মা-প্রজাপতি তার সদ্যজাত সন্তানের কপালে গভীর অনুরাগে কী যেন এঁকে দেয়! লোকে যাকে ‘কাজল’ বলে থাকে। নয়নের কাজল যেন আজ হৃদয়ে গাঁথে!
আমি আমাদের অতি চেনা সেই ‘কাজল’-এর কথাই বলছি, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। আমাদের এই প্রিয় আঙিনায় বেড়ে ওঠা এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আজ বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে রাষ্ট্রের বিচারিক দিগন্তকে আলোকিত করতে আসীন। স্বাগতম হে ন্যায়বিচারের অগ্রদূত, স্বাগতম আমাদের প্রিয় কাজল স্যার! আজকের এই আনন্দঘন লগ্নে আপনাকে জানাই আমাদের প্রাণের অন্তঃস্থল থেকে নিরন্তর অভিবাদন, ফুলেল শুভেচ্ছা। কবির ভাষায়…
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
‘ভয় নাই, ওরে ভয় নাই
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।
বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে, যখন জুলাই-আগস্টের রক্তস্নাত বিপ্লবের ফলস্বরূপ ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর দেশ এক নতুন সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষায় বিভোর, হয়ত জটিল, কঠিন আইনি সমস্যা আসন্ন! ঠিক তখন বাংলাদেশের ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল বা রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস (কাজল) কে নিয়োগ দিয়েছেন। তাঁর এই নিয়োগ কেবল একটি পেশাগত পদায়ন নয়; এটি দীর্ঘদিনের ত্যাগ, মেধা ও নিষ্ঠার এক অনন্য স্বীকৃতি।
দেশের প্রথম অ্যাটর্নি জেনারেল এম. এইচ. খন্দকার থেকে শুরু করে সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, মাহমুদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার রফিকুল হক, এ. জে. মোহাম্মদ আলী এবং সদ্য বিদায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান-এর উত্তরসূরি হিসেবে ব্যারিস্টার কাজলের আগমন আইন অঙ্গনে ধ্রুবতারার মতো এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের উদয়সম, যেন ফিনিক্স পাখির নতুন পথ চলা।
শেকড়ের টান: মহেশপুরের ধূলিকণা থেকে রাজপথের অগ্রসেনা!
ব্যারিস্টার কাজলের জীবনকে বিশ্লেষণ করলে কবি জসীমউদ্দীন-এর সেই চিরন্তন কবিতা মনে পড়ে-
মাঠের পরে মাঠ চলেছে, মাঠের নাহি শেষ,
সবুজ ঘাসে ঘাস মিশিয়ে রঙিন হল দেশ।
ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার সেই উর্বর মাটির সন্তান তিনি। মফস্বলের শান্ত জনপদ থেকে উঠে এসে মেধার জোরে তিনি আজ দেশের সর্বোচ্চ আইনি মঞ্চের কেন্দ্রে। মহেশপুরের সেই ধূলিকণা মাখা শৈশবই হয়তো তাঁকে শিখিয়েছে সাধারণ মানুষের কষ্ট বুঝতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে। তাঁর এই উত্থান প্রমাণ করে যে, নিষ্ঠা ও সততা থাকলে প্রান্তিক জনপদ থেকেও রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেওয়া যায়। লিগ্যাল ম্যাক্সিম “স্যালাস পপুলি ইস্ট সুপ্রিমা লেক্স” বা জনগণের কল্যাণই হোক সর্বোচ্চ আইন, তাঁর প্রেরণার মূলমন্ত্র।
ঐতিহ্যের স্মারক ও মেধার স্বাক্ষর
শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি রেখে গেছেন তাঁর মেধার দীপশিখা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের কৃতি শিক্ষার্থী হিসেবে শুরু হওয়া এই যাত্রা পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের লিঙ্কন’স ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল অর্জন এবং ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইনি ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে বৈশ্বিক পূর্ণতা পায়। ১৯৮৮ সালে যশোর বোর্ডের মেধা তালিকায় ৮ম স্থান অর্জন করা সেই মেধাবী তরুণটি আজ প্রজ্ঞার শিখরে আরোহণ করেছেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য-এর সেই অমর পঙ্ক্তিটি এখানে বড় প্রাসঙ্গিক-
এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান…
তবে তিনি কেবল স্থান করে নিতে আসেননি, তিনি এসেছেন স্থানটিকে তাঁর কর্ম ও প্রজ্ঞা দিয়ে মহিমান্বিত করতে; আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে আর ছড়িয়ে দিতে সৃষ্টিসুখের উল্লাস!
আইনজীবী অঙ্গনের প্রিয় মুখ ও সুযোগ্য নেতৃত্ব
আমেরিকান বিচারপতি অলিভার ওয়েন্ডেল হোমস বলেছিলেন, “দ্য লাইফ অফ ল’ হ্যাজ নট বিন লজিক; ইট হ্যাজ বিন এক্সপেরিয়েন্স”। ব্যারিস্টার কাজলের এই এক্সপেরিয়েন্স বা অভিজ্ঞতার ঝুলি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তিন যুগেরও বেশি পেশাগত জীবনে তিনি কেবল আদালতের কক্ষে মক্কেলের পক্ষে সুবক্তাই নন, বরং আইনজীবীদের অধিকার আদায়ে এক অতন্দ্র প্রহরী। পরপর তিনবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক নির্বাচিত হওয়া এবং বর্তমানে বার কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন প্রমাণ করে যে, সাধারণ আইনজীবীদের হৃৎস্পন্দন তিনি কতটা নিবিড়ভাবে বোঝেন।
আইনাঙ্গনে হাজারো অনুসারী হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা দিয়ে তাকে “ডাইনামিক” নেতা উপাধিতে ভূষিত করেন। জনগণের পক্ষে তিনি মাঠের রাজনীতিতেও সক্রিয় থাকেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে, বিনা দোষে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে; সইতে হয়েছে শারীরিক ও মানসিক নিগৃহ। কিন্তু একদিন ছিঁড়ে গেছে সব শিকল, ভেঙে গেছে সব বাঁধ! আজ আপনার এই নবযাত্রায় তাই মনে পড়ে-
“ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান,
আসিয়াছে আজ অরণি-রথী, জাগিছে নবীন প্রাণ।”
পেশাগত কৃতজ্ঞতা ও মেন্টরশিপের স্মৃতি
ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের এই নতুন অভিযাত্রায় আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে নিয়োজিত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীগণসহ সাধারণ আইনজীবীগণ ও সমাজের নানা শ্রেণী পেশার মানুষ আনন্দিত। সকলেই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছে, অভিনন্দিত করছে।
আমাদের এই বিশাল টিমের প্রায় প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে তাঁর প্রাজ্ঞ আইনি মেন্টরশিপের ছায়াতলে সমৃদ্ধ হয়েছি। আদালতের এজলাস থেকে শুরু করে রাজপথের লড়াকু কর্মসূচি, সামাজিক নানা আয়োজন কিংবা সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনের সেই নির্ঘুম রাতগুলো, প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা তাঁর পাশে থেকে কাজ করার এবং একজন দক্ষ আইনজীবীর প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব দেখার সুযোগ পেয়েছি।
তাঁর সেই সাহসী নেতৃত্ব এবং পেশাগত দিকনির্দেশনা আমাদের প্রত্যেকের ক্যারিয়ারে এক অমূল্য পাথেয় হয়ে আছে। তাঁর এই নতুন ভূমিকায় আমাদের শেখার সুযোগ হয়তো বহুগুণ বাড়ল! তাঁর সান্নিধ্যে আমরা নিজেদের গড়ে তুলব এবং রাষ্ট্রের সেবায় সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করব।
বিশ্ব আইনি ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার ও অনুপ্রেরণা
ব্যারিস্টার কাজল এক কঠিন সময়ে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন! বর্তমান ও অনুমানকৃত ভবিষ্যতের পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাঁকে দেশে-বিদেশে খ্যাত আইনবিদদের ইতিহাসের মোড় ঘুরানোর নজিরগুলি সহায়তা করতে পারে। আমেরিকার রবার্ট এফ কেনেডি যেমন বর্ণবাদ ও অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের শক্তিকে ন্যায়ের পক্ষে ব্যবহার করেছিলেন; কিংবা ভারতের ফালি এস নারিমান যেভাবে সংবিধানের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করেছেন; কিংবা মিশরের আব্দেল মেগুইদ মাহমুদ যেভাবে আরব বসন্ত উত্তর সময়ে মানবাধিকার রক্ষা এবং বিচারিক স্বাধীনতার পক্ষে লড়েছেন; কিংবা ফ্রান্সের রেনে ক্যাসিন যেভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সার্বজনীন মানবাধিকারের পক্ষে লড়েছেন, কিংবা যুক্তরাজ্যের মাস্টার অব দ্য রোলস লর্ড ডেনিং, যিনি আইনের আক্ষরিক অর্থের চেয়ে ‘ন্যায্যতা’ বা ইকুইটিকে প্রাধান্য দিয়ে বিখ্যাত হয়েছেন, ব্যারিস্টার কাজলের কাছে জাতির প্রত্যাশা ঠিক তেমনই। তিনি কি পারবেন তাঁর অগ্রজ সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ-এর মতো আকাশচুম্বী নিরপেক্ষতা কিংবা জীবন্ত সংবিধান খ্যাত মাহমুদুল ইসলাম-এর মতো গভীর সাংবিধানিক পাণ্ডিত্য কিংবা এ. জে. মোহাম্মদ আলীর অকাট্য যুক্তির সমন্বয়ে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে?
আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর সাহস ও মেধা তাঁকে সেই প্রবাদপ্রতিম অগ্রজদেরও ছাড়িয়ে যেতে সহায়তা করবে। বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ব্রিটিশ বিচারক লর্ড ডেনিং-এর কলমে ড. থমাস ফুলারের সেই অমর বাণী “বি ইউ এভার সো হাই, দ্যা ল’ ইজ অ্যাবাভ ইউ” বা “আপনি যতই উচ্চপদস্থ বা শক্তিশালী হোন না কেন, আইন আপনার উপরে” এই নীতি বাস্তবায়নে ব্যারিস্টার কাজলের হাত ধরে বাংলাদেশ বিচার বিভাগ নতুন প্রাণ পাবে, নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে আর তিনি হয়ে উঠবেন আইনাঙ্গনের নতুন প্রমিথিউস! এছাড়াও আইন পেশায় মেশিন লার্নিং, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আশীর্বাদকে গ্রহণ এবং এর অপপ্রয়োগের অভিশাপকে রুখে দিতে তাঁকে অত্যন্ত দূরদর্শী ও সাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে।
ন্যায়বিচারের নিপুণ কারিগর: আইনি লড়াইয়ের এক ধ্রুপদী অধ্যায়
জুলাই-আগস্টের সেই ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যখন বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে এক পশলা মুক্তির হাওয়া বইতে শুরু করে, তখনই ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল তাঁর প্রজ্ঞা ও মেধার পূর্ণ স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই সন্ধিক্ষণে তিনি হয়ে ওঠেন সংবিধান ও ন্যায়বিচারের এক অতন্দ্র প্রহরী।
ষোড়শ সংশোধনীর জটিল ‘রিভিউ’ মামলা থেকে শুরু করে পঞ্চদশ সংশোধনীর ঐতিহাসিক শুনানি, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর আইনি ব্যাখ্যা ছিল যেন এক একটি নিপুণ শিল্পকর্ম। বিশেষ করে ডক্টর ইউনূস সরকারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের বিপক্ষে তাঁর অকাট্য যুক্তি ও সাবমিশন আইনজীবী মহলে কেবল প্রশংসিতই হয়নি, বরং তা এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
আরও পড়ুন : বিচার বিভাগের ওপর শ্বেতপত্র প্রকাশ: দলীয় দুর্বৃত্তায়নকে ‘মূল শত্রু’ বলছে বাংলাদেশ ল অ্যালায়েন্স
তবে তাঁর পাণ্ডিত্যের এক অনন্য শিখর দেখা গেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনীর রিভিউ মামলায়। সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের রায়ের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা আইনগত ত্রুটিগুলো তিনি যখন আদালতের সামনে সূক্ষ্মভাবে ব্যবচ্ছেদ করছিলেন, তখন পুরো আদালতকক্ষ যেন এক জীবন্ত পাঠশালায় পরিণত হয়েছিল। ‘রিভিউ’-এর পরিধি এবং ‘জাজমেন্ট’-এর প্রকৃত সংজ্ঞা নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ বিচারকগণ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন।
২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ-এর বিশেষ আমন্ত্রণে সফররত নেপালের প্রধান বিচারপতি জনাব প্রকাশ মান সিং রাউত এর বিশেষ উপস্থিতিতে তিনি যখন তাঁর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করছিলেন, তখন তা কেবল একটি আইনি লড়াই ছিল না, তা ছিল বাংলাদেশের আইনি মেধার এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
শুধু সাংবিধানিক লড়াই-ই নয়, গণতন্ত্রের অতন্ত্র প্রহরী বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ডা. জোবায়দা রহমান এবং জননেতা তারেক রহমানের পক্ষে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা, গ্রেনেড হামলা মামলা, অস্ত্র মামলা, দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ সংক্রান্ত মামলা, ভাষণ প্রচার সংক্রান্ত মামলা, নির্বাচন সংক্রান্ত মামলাসহ অসংখ্য প্রতিকূল আইনি লড়াইয়ে তাঁর অসীম সাহস ও আইনি দক্ষতা আজ ইতিহাসের পাতায় অম্লান। তাঁর প্রতিটি সাবমিশন যেন ছিল শোষিতের পক্ষে এক-একটি শাণিত তরবারি আর ইনসাফ প্রতিষ্ঠার এক দৃঢ় ঢাল। এছাড়াও আদালতের আহ্বানে ‘অ্যামিকাস কিউরি’ হিসেবে কিংবা জনসচেতনতায় জাতীয় গণমাধ্যমে আইনি মতামত প্রকাশ করার মতো পরিশ্রমী কাজেও তিনি সর্বদা যুক্ত থাকেন।
সাফল্যের নেপথ্যে: সহধর্মিণী ও কন্যাদের ত্যাগের মহিমা
একটি প্রাচীন প্রবাদ আছে “প্রতিটি সফল পুরুষের নেপথ্যে একজন মহীয়সী নারীর অবদান থাকে।” ব্যারিস্টার কাজলের এই বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের পেছনে তাঁর সহধর্মিণী এবং দুই কন্যার ত্যাগের অবদান অনস্বীকার্য। একজন আইনজীবীর জীবন মানেই সময়ের সাথে নিরন্তর যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে তাঁর পরিবার ছায়ার মতো পাশে থেকেছে; দিনের পর দিন তাঁর অনুপস্থিতিকে হাসিমুখে মেনে নিয়েছে। আজকের এই সাফল্য কেবল তাঁর একার নয়, বরং তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী ও দুই কন্যার দীর্ঘদিনের ধৈর্য, দোয়া ও অনুপ্রেরণার শ্রেষ্ঠ ফসল।
বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশ ও জনপ্রত্যাশা
গীতিকার মোহিনী চৌধুরীর লেখা কালজয়ী গানের কথা… যেন ব্যারিস্টার কাজলের হৃদয়ে গাঁথা!
মুক্তির মন্দির সোপানতলে
কত প্রাণ হলো বলিদান
লেখা আছে অশ্রুজলে…
জুলাই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে, মানুষ চায় ইনসাফ, বৈষম্য নিরসন, মানুষ চায় মুক্তি। আইনাঙ্গনের মানুষ তাঁকে ‘দ্য ডিসিপ্লিনড রেবেল’ বলেও অভিহিত করেন যে নামে বৃটেনের লর্ড ডেনিংকে সম্মানিত করা হয়! আজ ও আগামীর বাংলাদেশে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। জনপ্রত্যাশার এই সুবিশাল চাপ তাঁর কাঁধে রয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ায় তাঁর অংশগ্রহণ ইতিমধ্যেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তিনি জানেন “অডি অলটেরাম পার্টেম” বা উভয় পক্ষের কথা শোনা হলো প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি এবং প্রজাতন্ত্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে এটিই তাঁর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তিনি একজন মানুষ, মানুষের পক্ষে থাকবেন, লড়বেন সিংহের মতো আর তাতেই জিতে যাবে মানবতা! আমাদের জাতীয় ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের সেই রুদ্র হুঙ্কার আজ তাঁর কর্মে প্রতিফলিত হতে চায়:
মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল
আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম
রণ-ভূমে রণিবে না
পরিশেষে: ভয় শূণ্য চিত্তের নবদিগন্ত
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলিতে লিখেছিলেন…
চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সেই ভয়শূন্য চিত্তের অধিকারী একজন মানুষ। ঝিনাইদহের মহেশপুরের সন্তান, বিদেশে অর্জিত প্রজ্ঞা নিয়ে আজ গোটা বাংলাদেশের বিচার অঙ্গনে একজন সংস্কারক, আইনি স্থপতি বা আইনের অভিভাবক। তাঁর হাত ধরে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় কেবল সরকারের পক্ষেই লড়বে না, বরং ন্যায়বিচারের সপক্ষে এক শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে আবির্ভূত হবে, এটাই আজ সমগ্র জাতির একান্ত কামনা।
স্বাগতম, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল! ১৮তম অ্যাটর্নি জেনারেল ফর বাংলাদেশ। আপনার, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার সুফল পেতে অধীর অপেক্ষায় আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।
লেখক: অ্যাডভোকেট মীর হালিম, অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেল ফর বাংলাদেশ।

