পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদে
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদে

দুবাইয়ে গ্রেফতার সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ: ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করছে দুদক

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা |অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিং মামলার আসামি সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ওপর ভিত্তি করে দুবাই সিটি পুলিশ এই হাইপ্রোফাইল আসামিকে গ্রেফতার করে।

আজ রোববার (১৪ জুন) পুলিশ সদর দফতরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলায় আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তায় বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করেছে দুবাই সিটি পুলিশ। বর্তমানে তিনি দুবাই পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাঁকে দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবে দুদক।

রেড নোটিশ জারির প্রেক্ষাপট

দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার একটি আদালত বেনজীরের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। এরপর গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে বেনজীরের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করতে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হয়। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি বা অপরাধের অভিযোগের কারণে দ্রুত পদক্ষেপ হিসেবে গত ১০ এপ্রিল তাঁর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে ইন্টারপোল।

বেনজীর ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে মামলার ক্রোনোলজি

সাবেক এই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের আইনি অভিযানের প্রধান মাইলফলকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ১৮ এপ্রিল, ২০২৪: বেনজীর আহমেদের সম্পদ অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। সংস্থাটির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে থাকা বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ।

  • ০৪ মে, ২০২৪: দুদকের অনুসন্ধান ও আইনি প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই সপরিবার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান বেনজীর আহমেদ।

  • ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৪: সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও তার স্ত্রী-সন্তানদের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা দায়ের করেন দুদকের উপ-পরিচালক হাফিজুল ইসলাম।

  • ০৮ জানুয়ারি, ২০২৫: আদালত বেনজীরের স্ত্রী জিশান মির্জা ও ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের আয়কর নথি জব্দের আদেশ দেন।

  • ১৩ জানুয়ারি, ২০২৫: বেনজীর আহমেদ ও তার বড় মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীরের আয়কর নথি জব্দের আদেশ দেন আদালত।

  • ৩০ নভেম্বর, ২০২৫: তদন্ত শেষে সাবেক আইজিপির বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন এবং মানি লন্ডারিংয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা হাফিজুল ইসলাম।

  • মে, ২০২৬: অবৈধ সম্পদ অর্জনের একটি মামলায় বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন (Charge Frame) করেন, যার মধ্য দিয়ে এই মামলায় তাঁর অনুপস্থিতিতেই আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।

চার্জশিটে দুদকের চাঞ্চল্যকর গাণিতিক ফাইন্ডিংস

তদন্ত শেষে আদালতে দাখিল করা দুদকের অফিশিয়াল অভিযোগপত্রে বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির যে খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে, তা নিচে ক্রমান্বয়ে প্রকাশ করা হলো:

বেনজীর আহমেদ তাঁর দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর সম্পদ ও ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে নিবিড় তদন্তে তাঁর নামে প্রকৃতপক্ষে ৭ কোটি ৫২ লাখ ৬৮ লাখ ৯৮৭ টাকার স্থাবর এবং ৮ কোটি ১৫ লাখ ৩১ হাজার ২৬৪ টাকার অস্থাবর সম্পদের অকাট্য সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, অনুসন্ধানে তাঁর মোট ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের সন্ধান মিলেছে।

এর বিপরীতে তাঁর বৈধ আয়ের উৎস হিসেবে পাওয়া গেছে মাত্র ৬ কোটি ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ৬৬৮ টাকা। পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় বাদে তাঁর নিট সঞ্চয় দাঁড়ায় ৪ কোটি curiosity ৫৬ লাখ ৫৬ হাজার ৬৭৫ টাকা। ফলে সুনির্দিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদ তাঁর বৈধ আয়ের চেয়ে ১১ কোটি ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৬ টাকার অতিরিক্ত জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন।

অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সাবেক এই আইজিপি এসব কালোটাকার অবৈধ উৎস, প্রকৃতি ও মালিকানা সম্পূর্ণ গোপন করার অসৎ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, বেনামি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও যৌথ মূলধনী প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ, স্থানান্তর ও রূপান্তর করে মানি লন্ডারিংয়ের গুরুতর অপরাধ সংগঠন করেছেন।

আদালত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেহেতু ইতিমধ্যেই বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে ট্রায়াল শুরু হয়েছে, তাই দুবাই পুলিশের হাত থেকে তাঁকে ‘এক্সট্রাডিশন ট্রিটি’ বা ইন্টারপোলের আইনি ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতে সোপর্দ করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।