অ্যাডভোকেট শামস আর্ক
অ্যাডভোকেট শামস আর্ক

নাঈম হাসানের ঘটনা: সাময়িক বরখাস্ত নয়, চাই স্বাধীন তদন্ত সংস্থা ও আইনের বাধ্যতামূলক প্রয়োগ

অ্যাডভোকেট শামস আর্ক : বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পিনার নাঈম হাসানের সঙ্গে চট্টগ্রামে পুলিশের কথিত হামলা ও হয়রানির ঘটনা আবারও একটি পুরোনো প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে—পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে বিচার করবে কে?

ঘটনার পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) দুই সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে এবং তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সিএমপি কমিশনার প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশও করেছেন। নিঃসন্দেহে এগুলো তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলোএগুলো কি ন্যায়বিচারের সমার্থকনাকি জনরোষ প্রশমনের একটি পরিচিত প্রশাসনিক রুটিন?

প্রথমেই একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সাময়িক বরখাস্ত কোনো শাস্তি নয়। এটি কেবল তদন্তকালীন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা। ফলে কোনো পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা মানেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বা তিনি জবাবদিহির আওতায় এসেছেন—এমন নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে বহু ক্ষেত্রে সাময়িক বরখাস্তই যেন শেষ খবর হয়ে যায়এরপর তদন্তের অগ্রগতিদায় নির্ধারণ কিংবা শাস্তির প্রশ্ন আর আলোচনায় থাকে না।

নাঈম হাসানের ঘটনা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে আনে। তিনি একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার। তার পরিচিতি আছে, তার উপর গণমাধ্যমের নজর আছেক্রিকেট বোর্ড তার পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একই ঘটনা যদি কোনো সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে ঘটততাহলে কি একই রকম দ্রুত তদন্তক্ষমা প্রার্থনা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ দেখা যেতএই প্রশ্ন এখন সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে।

আরও পড়ুন : বিচার বিভাগে বরাদ্দ বাড়লেও সংকট কাটাতে অপ্রতুল

বাংলাদেশে ২০১৩ সালে প্রণীত হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু (নিবারণ) আইন ছিল রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি যুগান্তকারী আইন। আইনটির মূল দর্শন ছিল সহজ—রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা থাকবেকিন্তু সেই ক্ষমতার অপব্যবহার হলে দায়ও থাকবে। আইনটি নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুকে পৃথক ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলোপুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে বিভাগীয় তদন্তে। অথচ নির্যাতনবেআইনি আটক বা ক্ষমতার অপব্যবহার যদি সত্যিই ঘটে থাকেতাহলে সেটি কেবল বিভাগীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়সেটি একটি সম্ভাব্য ফৌজদারি অপরাধ। সেই কারণে গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু (নিবারণ) আইনসহ প্রাসঙ্গিক ফৌজদারি আইনের অধীনে মামলা রেকর্ড ও স্বাধীন তদন্তের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার প্রশ্ন এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো তদন্তের কাঠামো। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করছে পুলিশই। স্বাভাবিকভাবেই এখানে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন ওঠে। তদন্তকারী ও অভিযুক্ত একই প্রতিষ্ঠানের সদস্য হলে জনগণের পক্ষে সেই তদন্তের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে আস্থা রাখা কঠিন। বিচার শুধু হওয়া যথেষ্ট নয়বিচার হয়েছে—এটিও জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে।

আরও পড়ুন : বার কাউন্সিলের এমসিকিউ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন ব্যারিস্টার জাইমা রহমান

বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে এই কারণেই স্বাধীন তদারকি ও তদন্ত ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছে। যুক্তরাজ্যে Independent Office for Police Conduct (IOPC) পুলিশের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগহেফাজতে মৃত্যু এবং গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করে। সংস্থাটি পুলিশের অংশ নয় এবং তাদের কাজের মূল উদ্দেশ্য জনআস্থা বজায় রাখা।

ভারতেও বহু আলোচিত মামলায় আদালত স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। বিশেষ করে Prakash Singh v. Union of India (2006) মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পুলিশ সংস্কারের জন্য স্বাধীন অভিযোগ কর্তৃপক্ষ (Police Complaints Authority) গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। আদালতের যুক্তি ছিলপুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য পুলিশের বাইরের একটি বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো প্রয়োজন।

বাংলাদেশেও এখন সময় এসেছে একটি স্বাধীন পুলিশ জবাবদিহিতা কমিশন বা স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠনের বিষয়ে জাতীয় আলোচনা শুরু করার। এই সংস্থা পুলিশ সদর দপ্তর বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকবেনিজস্ব তদন্ত কর্মকর্তাফরেনসিক সক্ষমতা ও প্রসিকিউশন ব্যবস্থা থাকবেএবং সরাসরি সংসদ বা সুপ্রিম কোর্টের নিকট জবাবদিহি করবে। হেফাজতে মৃত্যুনির্যাতনগুমগুরুতর ক্ষমতার অপব্যবহার ও বেআইনি বলপ্রয়োগের অভিযোগ বাধ্যতামূলকভাবে এই সংস্থার নিকট তদন্তের জন্য যাবে।

নাঈম হাসানের ঘটনা হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই সংবাদ শিরোনাম থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো এই ঘটনা উত্থাপন করেছেসেগুলো হারিয়ে যাবে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ জনগণের নিরাপত্তার জন্যজনগণের ওপর কর্তৃত্ব করার জন্য নয়। আর সেই কারণেই পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা রক্ষার সর্বোত্তম উপায় হলো দায়মুক্তি নয়জবাবদিহিতা।

নাঈম হাসানের জন্য ন্যায়বিচার গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলাযেখানে পরবর্তী নাঈম হাসানকে তার পরিচয় প্রমাণ করে ন্যায়বিচার চাইতে না হয়।

লেখক : অ্যাডভোকেট শামস আর্ক; জ্যেষ্ঠ আইন কর্মকর্তা (ইনচার্জ); দৈনিক প্রথম আলো।