চট্টগ্রাম ব্যুরো | চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী থানার চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত আইনজীবী শহীদ অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে আদালতে নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট শহিদুল আলম রাহাত। একই কার্যদিবসে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল উক্ত মামলার অন্যতম আসামি চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর জামিন আবেদন না মঞ্জুর করেছেন।
আজ সোমবার (২০ জুলাই ২০২৬) চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক ফজলে খোদা মোহাম্মদ নাজিরের আদালতে এই সাক্ষ্যগ্রহণ ও জামিন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আদালত সশরীরে উপস্থিত সাক্ষীর বিস্তারিত জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, আজ মামলাটির বিচারিক শুনানিকালে চার্জশিটভুক্ত অন্যতম আসামি সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী কারাগার থেকে ভার্চুয়ালি আদালতের বিচারে যুক্ত হন। আর মামলায় গ্রেপ্তারকৃত অপর ২৭ জন আসামিকে কারাগার থেকে কড়া পুলিশি নিরাপত্তা ও সর্বোচ্চ সতর্কতার মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালের এজলাসে হাজির করা হয়।
এজলাসে আবেগঘন পরিবেশ ও অশ্রুসিক্ত সাক্ষী
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ও চট্টগ্রাম আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অ্যাডভোকেট মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী জানান, আজ আদালতে শহীদ আইনজীবী আলিফকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনার ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের দ্বিতীয় সাক্ষী অ্যাডভোকেট শহিদুল আলম রাহাত বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে ডুকরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সাক্ষী রাহাতের এই করুণ জবানবন্দির সময় পুরো বিচারিক এজলাসে এক অত্যন্ত আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এজলাসে উপস্থিত রাষ্ট্রপক্ষ ও বাদীপক্ষের অনেক সাধারণ আইনজীবী ও সহকর্মীকেও সে সময় অশ্রুসিক্ত হতে দেখা যায়।
সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব সম্পন্ন হওয়ার পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা উক্ত সাক্ষীকে বিস্তারিত জেরা শুরু করেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী আরও জানান, সোমবারই রাষ্ট্রপক্ষের এই দ্বিতীয় সাক্ষীর জেরা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের পক্ষে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী সময় আবেদন করলে বিজ্ঞ আদালত তা মঞ্জুর করেন এবং আগামী ২০ আগস্ট ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ জেরার পরবর্তী তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করেন। একই সাথে আসামি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের পক্ষে উপস্থাপিত জামিনের আবেদন যুক্তিখণ্ডন শেষে না মঞ্জুর করেন আদালত।
মামলার প্রেক্ষাপট ও বিচারিক ইতিহাস
মামলার নথি ও এজাহার থেকে জানা যায়, বিগত ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম আদালত ভবন (কোর্ট হিল) এলাকায় সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর জামিন আবেদন নামঞ্জুরকে কেন্দ্র করে উগ্রবাদী সমর্থক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের সূচনা হয়। ওই সংঘর্ষের একপর্যায়ে আদালত চত্বরের কাছেই আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে কোতোয়ালী এলাকার রাস্তায় ঘিরে ধরে পৈশাচিকভাবে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এই মর্মান্তিক ও নজিরবিহীন ঘটনায় শহীদ আলিফের পিতা জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে নগরের কোতোয়ালী থানায় ৩১ জনের নাম উল্লেখ করে একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১ জুন তৎকালীন সিএমপির কোতোয়ালী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান চট্টগ্রাম আদালতের সংশ্লিষ্ট বিচারিক শাখায় চার্জশিট দাখিল করেন। তদন্ত কর্মকর্তা প্রাথমিক এজাহারভুক্ত ৩ জন (গগন দাশ, বিশাল দাশ ও রাজকাপুর মেথর) আসামির কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাঁদের অব্যাহতির আবেদন করেন এবং তদন্তে নতুন করে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ আরও ১০ জনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অপরাধের প্রমাণ মেলায় মোট ৩৮ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট প্রদান করেন।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট তৎকালীন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম আলাউদ্দিন মাহমুদের আদালত চার্জশিট গ্রহণকালে সুকান্ত দত্তসহ সর্বমোট ৩৯ জন আসামির বিরুদ্ধে বাদীর উপস্থিতিতে ফরমাল অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। মামলাটিতে বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃত ২৭ জন আসামি বিভিন্ন কারাগারে আটক রয়েছেন এবং অপর ১২ জন আসামি এখনও পলাতক রয়েছেন।

