আইন ও আদালত
আইন ও আদালত

পাবলিক পলিসি কি আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার বাইরে?

কামাল হোসেন মিয়াজী : বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে মামলা দায়ের করলে প্রায়শই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়—চ্যালেঞ্জকৃত সিদ্ধান্তটি (impugned action) যদি সরকারের কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত বা public policy-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে আদালত কি ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে সে বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে কোনো আদেশ দিতে পারেন? এ থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উদ্ভব হয়—সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বা public policy-সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত কি সত্যিই আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার (judicial review) সম্পূর্ণ বাইরে? একটি সাংবিধানিক আদালতে সরকারের কোনো নীতিগত সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মামলা করা বা সেই মামলা পরিচালনা করা কি আদৌ নিষিদ্ধ? সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার পরিধি এবং সীমা কী—এই প্রশ্নগুলোর সাংবিধানিক ও আইনগত অবস্থান স্পষ্ট করাই এই লেখার উদ্দেশ্য।

রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকার বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করবে—এটা স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত। অর্থনীতি, উন্নয়ন, অবকাঠামো, প্রশাসন, সম্পদ বণ্টন, শিল্প ও শিক্ষাসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারকে নিয়মিত নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোনো নীতি কতটা কার্যকর, উপযোগী বা জনকল্যাণমুখী—এই মূল্যায়ন মূলত সরকারের নীতিনির্ধারণী এখতিয়ারের বিষয়। আদালত সাধারণত সরকারের এই নীতিগত পছন্দের স্থলাভিভিক্ত হন না।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পার্থক্য রয়েছে। কোনো সিদ্ধান্তকে “policy decision” আখ্যা দেওয়া হলেই তা বিচারিক পর্যালোচনার বাইরে চলে যায় না। Judicial review-এর ক্ষেত্রে আদালত সাধারণত policy-এর যৌক্তিকতা, কার্যকারিতা বা কাম্যতা যাচাই করেন না; বরং বিচারক দেখেন—সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছিল কি না, সিদ্ধান্তটি আইন ও সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছাচারিতা, অযৌক্তিকতা বা malafide (অসৎ অভিপ্রায়) ছিল কি না।

বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিক নজির

Bangladesh v. Md. Ataur Rahman, 9 SCOB [2017] AD 1 মামলায় আপিল বিভাগ সরকারের Warrant of Precedence-কে নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করলেও শুধু “policy” হওয়ার কারণে বিচারিক পর্যালোচনা থেকে সরে দাঁড়াননি। এই সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট করে দেয়—”policy” কোনো জাদুমন্ত্র নয়, যার উচ্চারণমাত্রেই সরকারি সিদ্ধান্ত আদালতের এখতিয়ারের বাইরে চলে যায়।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অভিমত

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক অবস্থানও একই মৌলিক নীতিকে সমর্থন করে। Census Commissioner v. R. Krishnamurthy মামলায় আদালত policy-making-কে মূলত executive ও legislature-এর domain হিসেবে স্বীকার করেছেন এবং বলেছেন যে বিচার বিভাগের পর্যালোচনার বিষয় হলো কোনো সিদ্ধান্তের আইনগত বৈধতা ও সাংবিধানিকতা; সিদ্ধান্তটির প্রজ্ঞা, যৌক্তিকতা বা কার্যকারিতা বিচার করা তার এখতিয়ারের বিষয় নয়।

State of Orissa v. Gopinath Dash মামলায় বলা হয়েছে, policy matter-এ আদালত executive-এর বিচারের স্থলাভিভিক্ত হবেন না; কোনো সিদ্ধান্ত বা কার্যক্রম যদি আইনগত বিধান বা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হয়, তবে তা বিচারিক পর্যালোচনা ও প্রয়োজনে বিচারিক হস্তক্ষেপের আওতায় আসতে পারে।

Manohar Lal Sharma v. Union of India মামলায় সরকারের অর্থনৈতিক নীতি—বিশেষত প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (Foreign Direct Investment—FDI)-সংক্রান্ত নীতির ক্ষেত্রে বিচারিক পর্যালোচনার পরিধি সরাসরি নির্ধারণ করা হয়েছে। আদালত সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, সরকারের নীতি প্রণয়ন মূলত নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় এবং আদালতের হস্তক্ষেপ কেবল তখনই সমীচীন, যখন সংশ্লিষ্ট নীতি সংবিধানবিরোধী, আইন বা বিধিবিধানের পরিপন্থী, স্বেচ্ছাচারী, অযৌক্তিক (irrational), অথবা ক্ষমতার অপব্যবহারের ফল বলে প্রতীয়মান হয়। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ test স্পষ্ট হয়: কোন পরিস্থিতিতে আদালত সরকারি নীতির ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারেন এবং কোন পরিস্থিতিতে করতে পারেন না—এই মামলাটি তার একটি সুস্পষ্ট ও প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত প্রদান করে, যা policy decision-এর ক্ষেত্রে judicial review-এর সীমা নির্ধারণে বিশেষভাবে সহায়ক।

কোন পরিস্থিতিতে ‘policy decision’ judicial review-এর আওতায় আসে?

মূলত পাঁচটি ক্ষেত্রে আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারেন:

  • প্রথমত: policy বা তার বাস্তবায়ন যদি arbitrary, irrational বা unreasonable হয়। সিদ্ধান্তটি যদি প্রাসঙ্গিক বিবেচনা উপেক্ষা করে গৃহীত হয় বা এমনভাবে প্রয়োগ করা হয় যা কোনো যুক্তিসংগত কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে পারে না—তাহলে কেবল “policy decision” বলে তা রক্ষা করা যায় না। আমাদের আদালত-এ “shocking arbitrariness” ও Wednesbury unreasonableness-এর মানদণ্ড এবং ভারতীয় jurisprudence-এ “manifestly arbitrary” ও “demonstrably arbitrary” (সুস্পষ্ট স্বেচ্ছাচারিতা)-এর মতো শব্দদ্বয় ব্যবহৃত হয়েছে।

  • দ্বিতীয়ত: policy যদি আইন বা সংবিধানের পরিপন্থী হয়। Executive policy-making (নির্বাহী বিভাগের নীতি প্রণয়ন) কোনোভাবেই statutory law (আইনগত বিধান) বা constitutional limitation (সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা)-এর ঊর্ধ্বে নয়। কোনো policy যদি statutory provision, মৌলিক অধিকার বা অন্য কোনো সাংবিধানিক বিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে আদালত তার বৈধতা পরীক্ষা করতে পারেন।

  • তৃতীয়ত: সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের যদি সেই policy গ্রহণ বা বাস্তবায়নের আইনগত ক্ষমতাই না থাকে। প্রতিটি executive authority-এর ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। কোনো কর্তৃপক্ষ statutory authority (আইনগতভাবে অর্পিত ক্ষমতা)-এর বাইরে গিয়ে policy গ্রহণ বা প্রয়োগ করলে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ judicial review-এর আওতায় পড়তে পারে।

  • চতুর্থত: সিদ্ধান্তটি যদি malafide বা bad faith দ্বারা প্রভাবিত হয়। সরকারি ক্ষমতা জনস্বার্থে অর্পিত। সেই ক্ষমতা যদি কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে, collateral purpose-এ বা bad faith-এ ব্যবহার করা হয়, তাহলে “policy” পরিচয় তাকে বিচারিক নিরীক্ষা থেকে রক্ষা করতে পারে না। Malafide-কে policy decision-এর ক্ষেত্রে judicial intervention (বিচারিক হস্তক্ষেপ)-এর স্বীকৃত ground হিসেবে গণ্য করা হয়।

  • পঞ্চমত: policy যদি সাংবিধানিক বা বিধিবদ্ধ অধিকারে বেআইনিভাবে হস্তক্ষেপ করে। Executive-এর discretion-এর প্রয়োগ সংবিধানের মৌলিক অধিকার-সংক্রান্ত বিধানসহ সামগ্রিক সাংবিধানিক কাঠামোর সীমার মধ্যে থাকতে হয়। কোনো policy বা তার বাস্তবায়ন যদি বৈষম্যমূলক বা মৌলিক অধিকারবিরোধী হয়, তাহলে judicial review-এর প্রশ্ন উঠতে পারে।

কখন আদালত হস্তক্ষেপ করবেন না?

আদালত সাধারণত policy decision-এ হস্তক্ষেপ করবেন না যখন: policy-making সংশ্লিষ্ট executive বা legislative domain-এর মধ্যে থাকে; সিদ্ধান্তটি আইনসম্মত ও যুক্তিসঙ্গত; এবং তা কোনো সাংবিধানিক বা বিধিবদ্ধ সীমা অতিক্রম করেনি।

State of Odisha v. Orissa Trust of Technical Education এবং State of U.P. v. Chaudhari Ran Beer Singh মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যথাক্রমে executive policy-making-এ judicial restraint-এর প্রয়োজনীয়তা এবং policy matter-এ High Court-এর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের বিপদ নিয়ে সতর্ক করেছেন। Gopinath Dash মামলায়ও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে আদালত policy formulation-এ নিজেদের বিচারবুদ্ধি দিয়ে executive-এর সিদ্ধান্ত প্রতিস্থাপন করতে পারেন না।

মৌলিক নীতি যা মান্য হচ্ছে: Judicial review is not an appeal on the merits (বিচারিক পর্যালোচনা কোনো সিদ্ধান্তের গুণগত যথার্থতা বা মেরিট পুনর্বিবেচনার জন্য আপিলের বিকল্প নয়)।

আদালত প্রশ্ন করবেন না—”সরকারের policy-টি আরও ভালোভাবে কী করা যেত?” বরং প্রশ্ন করবেন—”সিদ্ধান্তটি কি আইনসম্মতভাবে, যুক্তিসঙ্গতভাবে এবং সাংবিধানিক সীমার মধ্যে গৃহীত হয়েছে?” এই পার্থক্যটি policy decision এবং administrative action উভয় ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্বপূর্ণ। আদালত নতুন policy তৈরি করবেন না; কিন্তু সরকার যদি policy বাস্তবায়নে আইন লঙ্ঘন করে, arbitrary বা discriminatory আচরণ করে, mala fide উদ্দেশ্যে ক্ষমতা ব্যবহার করে বা statutory limitation অতিক্রম করে—তাহলে সেই administrative action judicial review-এর বিষয় হতে পারে।

দুই দেশের jurisprudence-এ সামঞ্জস্য ও বৈশিষ্ট্য

বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের আদালত policy-making-এ judicial restraint-এর নীতি অনুসরণ করেন, তবে একই সঙ্গে স্বীকার করেন যে illegality (আইনগত অবৈধতা), unconstitutionality (অসাংবিধানিকতা), arbitrariness (স্বেচ্ছাচারিতা), মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন, authority-র অনুপস্থিতি বা malafide-এর কারণে policy decision judicial review-এর আওতায় আসতে পারে।

আগেই বলেছি আমাদের আদালত “shocking arbitrariness” ও “Wednesbury unreasonableness”-এর ভাষা ব্যবহার করেছে; ভারতীয় সিদ্ধান্তগুলোতে “manifestly arbitrary”, “demonstrably arbitrary” বা “irrational” formulation বেশি দেখা যায়। মৌলিক approach অভিন্ন হলেও judicial intervention-এর threshold প্রকাশের ধরনে দুই jurisdiction-এর মধ্যে কিছু স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। রাষ্ট্রকে public trustee হিসেবে বিবেচনার ধারণা, যা policy decision-এর বিচারিক নিরীক্ষায় একটি অতিরিক্ত স্তর যোগ করে। আমাদের আদালত এমন নীতি সমর্থন করে।

উপসংহার

কোনো writ petition কেবল এই কারণে খারিজ করা যায় না যে impugned decision একটি “matter of public policy”। আদালতকে প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে—challenge-টি আসলে কিসের। যদি প্রশ্ন হয়—”সরকারের এই policy-টিই কি সর্বোত্তম?”—তাহলে সেটি সাধারণত আদালতের বিষয় নয়। Policy formulation মূলত executive-এর domain এবং আদালত নিজেদের বিচারবুদ্ধি দিয়ে সরকারের policy choice প্রতিস্থাপন করবেন না।

কিন্তু যদি প্রশ্ন হয়—”সরকার কি এই policy গ্রহণ বা বাস্তবায়নে সংবিধান, আইন, statutory authority বা মৌলিক প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের সীমা অতিক্রম করেছে?”—তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে judicial review-এর বিষয়।

এটাই separation of powers ও judicial review-এর মধ্যে সঠিক ভারসাম্য। নীতি সরকারের। কিন্তু নীতির বৈধতা—সংবিধান ও আইনের প্রশ্ন।

আর সেই প্রশ্নে আদালতের দরজা বন্ধ থাকতে পারে না।

লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট