সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জে জাতীয় আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) কার্যক্রমে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই—এই সাত মাসে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে ২ হাজার ২০৮টি বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে, যা বিগত ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১১ গুণ বেশি।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে যেখানে ২০১টি বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছিল, ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২০৮টিতে। অর্থাৎ এক বছরে নিষ্পত্তির সংখ্যা বেড়েছে ২ হাজার ৭টি, যা প্রায় ৯৯৯ শতাংশের এক বিশাল প্রবৃদ্ধি।
‘লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ কার্যকর হওয়ার পর নির্দিষ্ট শ্রেণির বিরোধে প্রাক-মামলা মধ্যস্থতা বা প্রি-কেস মিডিয়েশন কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় এই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
প্রি-কেস আবেদনে বিশাল সাফল্য ও অর্থ আদায়
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়:
-
প্রি-কেস আবেদন: ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে জমা পড়া ২৮৫টি আবেদন বেড়ে ২০২৬ সালের একই সময়ে হয়েছে ২ হাজার ৮০৮টি।
-
প্রি-কেস মীমাংসা: গত বছরের ৯৪টি মীমাংসার বিপরীতে চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫৪টিতে।
-
অর্থ আদায়: মীমাংসার মাধ্যমে ২০২৫ সালে ২ লাখ ৬৩ হাজার ৮৬৩ টাকা আদায় হলেও, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ লাখ ৮৮ হাজার টাকায়।
-
পোস্ট-কেস নিষ্পত্তি: গত বছর কোনো পোস্ট-কেস মীমাংসা না হলেও চলতি বছর ৪৩টি পোস্ট-কেস বিরোধ সমাধান হয়েছে।
আইনি সহায়তা, পরামর্শ ও সচেতনতা বৃদ্ধি
২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাইয়ের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে লিগ্যাল এইডের অন্যান্য সেবার পরিধিও অনেক বেড়েছে:
-
আইনগত সহায়তা প্রাপ্তি: সেবাগ্রহীতার সংখ্যা ২২৯ জন থেকে বেড়ে ৯০৫ জনে উন্নীত হয়েছে।
-
আইনি পরামর্শ গ্রহণ: ৮৬১ জন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৫৫ জনে।
-
মোট উপকারভোগী: ৬৮৭ জন থেকে একলাফে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৯৮২ জন।
-
সচেতনতামূলক কার্যক্রম: মাত্র ৪টি সচেতনতামূলক সভার জায়গায় এ বছর ৪৯টি সভার আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে অংশ নিয়েছেন ২ হাজার ৮৫ জন মানুষ।
হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য আশার আলো
সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর ও দূরবর্তী প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য আদালতে না গিয়ে ফ্রিতে ও দ্রুততম সময়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করার এই ব্যবস্থা বিশেষ ভূমিকা রাখছে। জমি-জমা, সম্পত্তি, পাওনা টাকা, উত্তরাধিকার, বিবাহ, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলায় দুস্থ ও অসচ্ছল ব্যক্তিদের বিনামূল্যে আইনি সেবা দেওয়া হচ্ছে।
লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সুফল পাওয়া সেবাগ্রহীতা রাফিনা বিবি ও সজল মিয়া জানান, দীর্ঘদিনের জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ খুব অল্প সময়ে ও বিনামূল্যে সমাধান হওয়ায় তারা ন্যায়বিচার পেয়েছেন।
জুনিয়র স্পেশাল মিডিয়েটর অ্যাডভোকেট নূর আলম ও স্পেশাল মিডিয়েটর অ্যাডভোকেট আব্দুল হক জানান, কর্মকর্তা ও বিচারকদের আন্তরিকতার কারণে অসহায় বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত ও মানসম্মত সেবা পাচ্ছেন।
সুনামগঞ্জ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সিনিয়র সিভিল জজ) মো. জুনাইদ বলেন, “প্রাক-মামলা মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলা দায়েরের আগেই অনেক বিরোধ নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও অর্থ বেঁচে যাচ্ছে, আবার আদালতের ওপরও মামলার চাপ কমছে। এ ছাড়া মিডিয়েশনের মাধ্যমে সম্পাদিত চুক্তি আইনগতভাবে বলবৎযোগ্য হওয়ায় মানুষ ADR-এর ওপর আস্থা রাখছে।”
উল্লেখ্য, সুনামগঞ্জ জেলা লিগ্যাল এইড অফিস বর্তমানে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

