কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | সাতক্ষীরা জেলার উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার বাসিন্দাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ ও পর্যাপ্ত সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে একটি আইনি নোটিশ (লিগ্যাল নোটিশ) পাঠানো হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট’-এর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের তিন আইনজীবী ডাকযোগে এই নোটিশ পাঠান।
ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের পক্ষে গতকাল সোমবার (২৯ জুন) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব, ব্যারিস্টার মোঃ কাওছার এবং আইনজীবী মারুফ হোসেন তমাল যৌথভাবে এই আইনি নোটিশটি প্রেরণ করেন।
নোটিশটি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি), জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক এবং সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর পাঠানো হয়েছে।
নোটিশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি পাওয়া বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ধারণের মৌলিক অধিকারের অংশ এবং এই অধিকার নিশ্চিত করা সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
নদী সাঁতরে এক কলসি পানি: শ্যামনগরের বাস্তব চিত্র
আইনি নোটিশে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুপেয় পানির বর্তমান চরম সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রায় ৩০ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে এবং তীব্র লবণাক্ততার কারণে অধিকাংশ নলকূপ সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর গত ৪ মে ২০২৬ তারিখের একটি বিশেষ প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে নোটিশে বলা হয়, স্থানীয় নারী ও শিশুরা মাত্র এক কলসি খাবার পানির জন্য মাইলের পর মাইল পথ হেঁটে, এমনকি নদী সাঁতরে পানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত এই উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানের তথ্য উল্লেখ করে নোটিশে বলা হয়েছে, উপজেলার প্রায় প্রতিটি এলাকার মানুষ জেলেখালীর একটিমাত্র পানির ট্যাপের ওপর নির্ভরশীল। ধুমঘাটের বাসিন্দা শেফালি রানী মণ্ডলের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, তিনি প্রতিদিন তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে ও নদী সাঁতরে দিনে দুবার পানি সংগ্রহ করতে আসেন। শুধু পানি আনতেই তাঁর দিনের একটি বড় অংশ কেটে যায়, যার ফলে সন্তানের যত্ন ও সংসারের স্বাভাবিক কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই পানি সংকটের সামাজিক পরিণতিও ভয়াবহ; পানির কষ্টের কারণে বহু বিবাহ ভেঙে যাচ্ছে এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ছেড়ে পানির লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছে।
কোলরিজের কবিতা ও আইনি বাধ্যবাধকতা
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, পানির অধিকার কেবল বাংলাদেশের সংবিধানেই নয়, আন্তর্জাতিক আইনেও সমানভাবে সুরক্ষিত। নোটিশে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষগুলোর বছরের পর বছর ধরে চলে আসা চরম নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এই সংকট আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়; প্রতি বছর একই সময়ে সংকট তীব্র হবে জেনেও কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধান গড়ে তোলা হয়নি, যা রাষ্ট্রের সামগ্রিক ব্যর্থতারই প্রমাণ।
নোটিশে ইংরেজ কবি স্যামুয়েল টেলর কোলরিজের বিখ্যাত কবিতার পঙক্তি উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে— “চারদিকে শুধু পানি, কিন্তু পান করার মতো একফোঁটাও নেই” (Water, water, everywhere, nor any drop to drink)। শ্যামনগরের মানুষের বর্তমান নির্মম বাস্তবতা ঠিক এটাই।
৭ দিনের আলটিমেটাম ও হাইকোর্টে রিটের হুঁশিয়ারি
নোটিশের বিষয়টি নিশ্চিত করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব বলেন, “ইতিপূর্বে মাননীয় বিচারপতি মো: আশরাফুল কামাল এবং বিচারপতি কাজী ওয়ালিউল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ একটি রিট আবেদনের চূড়ান্ত রায়ে নিরাপদ ও পানযোগ্য পানি পাওয়ার অধিকারকে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক এবং সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বাংলাদেশে নাগরিকদের পানি প্রাপ্তির মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় আমাদের এই নোটিশটি প্রথম আইনি পদক্ষেপ।”
নোটিশে গ্রহীতাদের অবিলম্বে শ্যামনগর উপজেলার বাসিন্দাদের জন্য নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানীয় জল সরবরাহের দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। নোটিশ প্রাপ্তির আগামী ৭ (সাত) কার্যদিবসের মধ্যে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে একটি সুনির্দিষ্ট রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলে নোটিশে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

