বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা চাকরি থেকে অপসারণের মতো গুরুতর শাস্তি দিতে হলে তা অবশ্যই সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’ কর্তৃক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অনুমোদিত হতে হবে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। বোর্ডের অনুমোদনের আগে কোনো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি নিজ উদ্যোগে শিক্ষককে বরখাস্ত বা চাকরি থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে না বলেও স্পষ্ট করেছেন আদালত।
অসদাচরণের অভিযোগে এক কলেজ শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্তে শিক্ষা বোর্ডের অনাপত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দেওয়া রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ দেন হাইকোর্ট।
‘মোহা. আখতারুজ্জামান বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলায় এ গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন আদালত।
গত ৭ জুলাই বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ও বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় দেন। সম্প্রতি রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে। মামলার মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবির।
রায় ঘোষণার সময় রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. কামরুজ্জামান। কলেজ শিক্ষকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. জহিরুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আনিসুর রহমান খান ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুলতান মাহমুদ বান্না।
কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়ে বরখাস্ত বেআইনি
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, বেসরকারি কলেজের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা অপসারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রবিধানমালা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
কোনো শিক্ষককে অভিযোগের বিষয়ে যথাযথভাবে কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়ে কিংবা কেবল মৌখিক বা মোবাইল ফোনের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করে তড়িঘড়ি করে বরখাস্ত করা সম্পূর্ণ আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও বেআইনি বলেও উল্লেখ করেন আদালত।
হাইকোর্ট আরও বলেন, গুরুতর শাস্তি হিসেবে কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা অপসারণের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’কে বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। এরপর বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া কোনো শিক্ষককে সরাসরি বরখাস্ত বা অপসারণ কার্যকর করা যাবে না।
যে কারণে কলেজ শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছিল
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা পল্লী একাডেমির প্রধান শিক্ষিকা জাকিয়া বেগম গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল মনসুরের বিরুদ্ধে অনৈতিক বা অসদাচরণের অভিযোগ করেন।
অভিযোগে বলা হয়, ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষক আবুল মনসুর জাকিয়া বেগমের বাড়িতে যান। প্রথমে তার মেয়েকে একটি বই ফেরত দেওয়ার কথা বলে সেখানে যাওয়ার পর অসৎ উদ্দেশ্যে আবার ফিরে এসে তার ছোট মেয়ের পাশে বসেন এবং তার মাথা ও হাতে স্পর্শ করেন বলে অভিযোগ করা হয়।
এ ছাড়া তিনি তৃতীয়বারও ওই বাড়িতে প্রবেশের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় কলেজের অধ্যক্ষ ২০১৪ সালের ১৭ নভেম্বর শিক্ষক আবুল মনসুরকে শোকজ নোটিশ দেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, ওই প্রথম শোকজে অভিযোগের তারিখ হিসেবে ৭ নভেম্বর উল্লেখ করা হয়েছিল এবং শিক্ষককে তিন দিনের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।
পরদিন দেওয়া জবাবে আবুল মনসুর বাড়িতে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে কোনো অসৎ উদ্দেশ্য বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
শিক্ষকের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় কলেজের গভর্নিং বডি ২৯ নভেম্বর পাঁচটি নির্দিষ্ট প্রশ্নসংবলিত দ্বিতীয় শোকজ নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ৬ ডিসেম্বর দেওয়া জবাবেও শিক্ষক তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
ছয় দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন
এরপর গভর্নিং বডির সভাপতি ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মোহা. আখতারুজ্জামানের মৌখিক বা মোবাইল ফোনের নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর কলেজের অধ্যক্ষ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ওই তদন্ত কমিটি নিয়মবহির্ভূতভাবে মাত্র ছয় দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিল করে।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত গভর্নিং বডির সভায় শিক্ষক মো. আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্তটি ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর দেখানো হয়।
পরে বরখাস্তের সিদ্ধান্তের অনুমোদনের জন্য ১৬ ফেব্রুয়ারি তা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’তে পাঠানো হয়।
বরখাস্তের সিদ্ধান্ত বাতিল করে শিক্ষককে পুনর্বহালের নির্দেশ
২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সভায় ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটি গভর্নিং বডির বরখাস্তের প্রস্তাব নামঞ্জুর করে।
একই সঙ্গে শিক্ষক মো. আবুল মনসুরকে সব বকেয়া বেতন-ভাতাসহ পদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেয় কমিটি।
২৮ মে একটি মেমোর মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। পরে কলেজ কর্তৃপক্ষ ওই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন করলেও শিক্ষা বোর্ড জানায়, আপিল ও সালিশ কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কোনো আইনগত বিধান নেই।
এরপর শিক্ষা বোর্ডের ওই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও গভর্নিং বডির সভাপতি মোহা. আখতারুজ্জামান।
রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।
হাইকোর্টে রুল খারিজ
চূড়ান্ত শুনানি শেষে চলতি বছরের ৭ জুলাই হাইকোর্ট রুলটি খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে আগে দেওয়া স্থগিতাদেশও বাতিল করা হয়।
তবে মামলাটি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক মো. আবুল মনসুর অবসর গ্রহণের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছে যাওয়ায় তাকে আগের পদে পুনর্বহাল করার সুযোগ নেই বলে রায়ে উল্লেখ করেন আদালত।
এ কারণে তাকে পুনর্বহালের পরিবর্তে বরখাস্তের তারিখ থেকে অবসর গ্রহণের তারিখ পর্যন্ত প্রাপ্য বকেয়া বেতন-ভাতা, চাকরিসংক্রান্ত অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এবং প্রযোজ্য সব অবসরোত্তর ও পেনশন সুবিধা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
‘আপিল ও সালিশ কমিটির অনুমোদন ছাড়া বরখাস্ত নয়’
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে বলেন, আপিল ও সালিশ কমিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শিক্ষা বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া কোনো শিক্ষককে সরাসরি বরখাস্ত বা অপসারণ কার্যকর করা যায় না।
আদালত বলেন, গচিহাটা কলেজ কর্তৃপক্ষ বোর্ডের অনুমোদন পাওয়ার আগেই নিজেদের সিদ্ধান্তে শিক্ষকের বরখাস্ত কার্যকর করে শিক্ষা বোর্ডের আইনগত এখতিয়ারকে অগ্রাহ্য করেছে। এ ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বেআইনি।
আদালত আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ইতোমধ্যে অবসরের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছে যাওয়ায় তাকে বর্তমানে পূর্বের পদে পুনর্বহাল করার সুযোগ নেই। তবে বরখাস্তের তারিখ থেকে অবসরে যাওয়ার তারিখ পর্যন্ত তার প্রাপ্য সব বকেয়া বেতন-ভাতা, চাকরিজনিত সুযোগ-সুবিধা এবং পেনশনের যাবতীয় পাওনা পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
রায়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

