একই বিরোধ নিয়ে আগের একাধিক রিট ও আপিল বিভাগের কার্যক্রমের তথ্য গোপন করে নতুন করে রিট দায়ের করায় এক আইনজীবীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন হাইকোর্ট।
নির্ধারিত ১৫ দিনের মধ্যে জরিমানার অর্থ হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা না দিলে পাবলিক ডিমান্ডস রিকভারি অ্যাক্ট অনুযায়ী তা আদায়ের উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে অর্থঋণ আদালতের একতরফা রায় ও ডিক্রি জারি কার্যক্রমের বিরুদ্ধে জারি করা রুল খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। রুল জারির সময় দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশও প্রত্যাহার ও বাতিল করা হয়েছে।
বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২ সেপ্টেম্বর এ রায় দেন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
জরিমানার মুখে পড়া আইনজীবীর নাম এ কে এম আসিফুল হক। তিনি রিটকারীদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করছিলেন।
ঢাকা অর্থঋণ আদালত-১-এর বিচারকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিবাদী করে মেসার্স মৌসুমী ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. নজমুল হাসানসহ অন্যরা এই রিট আবেদন করেন।
আদালতে রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এ কে এম আসিফুল হক ও সাগরিকা ইসলাম। বিবাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. মনিরুল ইসলাম ও মো. শফিকুল ইসলাম।
উদ্দেশ্য ছিল অর্থ আদায় বাধাগ্রস্ত করা: হাইকোর্ট
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, একই আইনজীবী এর আগেও এ বিষয়ে রিট দায়ের করেছিলেন। কিন্তু সেই তথ্য গোপন করে বর্তমান রিটটি দায়ের করা হয়েছে।
আদালতের মতে, পূর্ববর্তী মামলার কার্যক্রমের তথ্য গোপনের উদ্দেশ্য ছিল মামলার কার্যক্রম বিলম্বিত করা এবং ব্যাংকের ডিক্রিকৃত অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা। এতে নিলামে সম্পত্তি কেনা ব্যক্তির অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
জনগণের বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় আটকে রাখার অসৎ উদ্দেশ্যে রিটটি দায়ের করা হয়েছিল বলেও অভিমত দিয়েছেন আদালত।
আদালত বলেন, তথ্য গোপনের অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে প্রমাণিত হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল জারি মামলার অগ্রগতি ও ব্যাংকের পাওনা টাকা আদায় বিলম্বিত করা এবং বৈধ নিলামে কেনা বিবাদীর সম্পত্তি ভোগের অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করা।
এ কারণে আবেদনকারীদের আইনজীবীর ওপর কস্ট ধার্য করে রুল খারিজ করা হয়েছে।
১৫ দিনের মধ্যে জরিমানার অর্থ জমার নির্দেশ
এই পর্যবেক্ষণের পর আদালত আইনজীবীর ওপর ১০ হাজার টাকা টোকেন কস্ট ধার্য করে রুল খারিজ করেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ বাতিল করেন।
নির্ধারিত ১৫ দিনের মধ্যে অর্থ জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট শাখাকে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের নজরে আনতে বলা হয়েছে।
রায়ের অনুলিপি অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতে পাঠানোর নির্দেশও দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আপিল বিভাগে আবেদন
জরিমানার বিষয়ে রিটকারীদের আরেক আইনজীবী সাগরিকা ইসলাম বলেন, হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে গত ১০ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে।
তাঁর দাবি, ক্লায়েন্টের দেওয়া ভুল তথ্যের কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাই আপিল বিভাগে এই জরিমানা বা কস্ট বহাল থাকবে না বলে তাঁরা আশা করছেন।
মামলার পেছনের ঘটনা
রায়ের বিবরণ থেকে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক প্রায় ২৫ কোটি ৬৩ লাখ ৮০ হাজার ৬৭২ টাকা আদায়ের জন্য আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা করেছিল। পরে ২০২১ সালের ৭ মার্চ মামলাটি একতরফাভাবে ডিক্রি হয়।
এরপর ডিক্রির টাকা আদায়ের জন্য ওই বছরের ৬ জুন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অর্থঋণ জারি মামলা করে। সেখানে প্রায় ২৭ কোটি ১৬ লাখ ১৩ হাজার ৫২৩ টাকা দাবি করা হয়।
পরে ওই একতরফা রায় ও ডিক্রির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন ঋণগ্রহীতারা।
রিটকারীদের দাবি ছিল, তাঁদের যথাযথভাবে সমন জারি ও তামিল না করেই অর্থঋণ আদালত একতরফা রায় ও ডিক্রি দিয়েছেন। এ ছাড়া অর্থ ডিক্রি হিসেবে দেওয়া রায়ে বন্ধকি সম্পত্তি অন্তর্ভুক্ত করা এবং পরে সেই সম্পত্তিকে জারি মামলার তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করাও আইনসম্মত হয়নি বলে দাবি করেন তাঁরা।
তবে হাইকোর্ট এসব যুক্তি গ্রহণ করেননি।
বিশেষ আইনের বিধানই প্রাধান্য পাবে
রায়ে হাইকোর্ট স্পষ্ট করে বলেছেন, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ একটি বিশেষ আইন। এই আইনের বিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্য থাকলে দেওয়ানি কার্যবিধির বিধান নয়, বরং বিশেষ আইনের বিধানই প্রাধান্য পাবে।
আদালত জানান, অর্থঋণ আদালত আইনের ৮(২)(খ) ধারায় বন্ধক বা জামানত রাখা সম্পত্তির বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে ঋণ আদায়ের জন্য বন্ধকি সম্পত্তিকে জারি কার্যক্রমের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা নেই।
সমন যথাযথভাবে তামিল হয়েছে: আদালত
সমন জারির বিষয়ে আদালত বলেন, মামলা দায়েরের পর সাধারণ প্রক্রিয়ার পাশাপাশি রেজিস্টার্ড ডাকযোগে সমন পাঠানো হয়েছিল। তা তামিল না হয়ে ফেরত আসার পর আদালতের নির্দেশে পত্রিকায় সমন প্রকাশ করা হয়।
ফলে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সমন যথাযথভাবে তামিল হয়েছে বলেই গণ্য হবে। আবেদনকারীরা আদালতে হাজির না হওয়ায় অর্থঋণ আদালত একতরফা রায় দিয়েছেন, যা আইনসম্মত বলে উল্লেখ করেন হাইকোর্ট।
আগের তিন রিটের তথ্য গোপন
শুনানিকালে একই বিষয়ে আবেদনকারীদের আগের একাধিক মামলা করার তথ্য গোপনের বিষয়টি আদালতের নজরে আসে।
হাইকোর্ট দেখতে পান, এর আগে আবেদনকারীরা একই জারি কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তিনটি পৃথক রিট করেছিলেন। এর মধ্যে একটিতে রুল খারিজ হয় এবং অন্য দুটি রিট অনুপস্থিতি বা মামলা পরিচালনায় ব্যর্থতার কারণে খারিজ হয়।
এ ছাড়া একটি আদেশের বিরুদ্ধে আবেদনকারীরা আপিল বিভাগে সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল দায়ের করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান রিটে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। আগের রিটগুলোও বর্তমান রিটের একই আইনজীবীর মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছিল।
আদালত বলেন, পূর্ববর্তী মামলার কারণে আবেদনকারীদের একতরফা রায় ও ডিক্রির বিষয়ে আগে থেকেই জানা ছিল। ফলে তাঁদের জন্য অর্থঋণ আদালত আইনের ১৯ ধারায় প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ ছিল।
সেই বিকল্প ও কার্যকর প্রতিকার গ্রহণ না করে সরাসরি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট দায়ের করা হয়েছে এবং সেখানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন হাইকোর্ট।

