নেভি-ব্লু রঙের ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর সোনালি রঙের হরফে লেখা LAW OF CONFESSION শিরোনামের নান্দনিক প্রচ্ছদে মোড়া বইটি প্রথম দেখাতেই কেন যেন বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ভালো লাগার অনুভূতি জাগাল। কথায় আছে, “আগে তো দর্শনধারী, তারপরে না হয় গুণ বিচারী।” হ্যাঁ, প্রথম দেখায় বইটির প্রচ্ছদ আমার মন কেড়ে নিল। কিন্তু বইটি পড়তে শুরু করার পর উপলব্ধি হলো, এর আকর্ষণ শুধু প্রচ্ছদে সীমাবদ্ধ নয়; বিষয়বস্তু, বিশ্লেষণ, উপস্থাপনা এবং লেখকের চিন্তার গভীরতাই বইটির প্রকৃত সৌন্দর্য।
আমরা যারা ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত, তাদের কাছে ‘দোষস্বীকারোক্তি’ (Confession) একটি অতি পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ আইনি পরিভাষা (Legal Term)। প্রতিদিনই পুলিশ আসামির দোষস্বীকারোক্তি (Confession) রেকর্ড করার জন্য বিজ্ঞ সিএমএম/সিজেএমের নিকট আবেদন করেন; বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আসামির দোষস্বীকারোক্তি রেকর্ড করেন; বিজ্ঞ আইনজীবী দোষস্বীকারোক্তি প্রত্যাখ্যানের আবেদন ড্রাফট করেন কিংবা দোষস্বীকারোক্তি সত্য (True) ও স্বপ্রণোদিত (Voluntary) হয়নি মর্মে যুক্তি উপস্থাপন করেন; বিজ্ঞ বিচারক দোষস্বীকারোক্তি ও আনুষঙ্গিক সাক্ষ্য বিচার-বিশ্লেষণ করে দোষী আসামিদের দণ্ড প্রদান করেন কিংবা আসামির দোষস্বীকারোক্তিটি স্বেচ্ছায় বিবৃত হয়নি বিবেচনা করে আসামিকে খালাস প্রদান করেন।
এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে বাংলাদেশে একটি স্বতন্ত্র, পূর্ণাঙ্গ ও systematic গ্রন্থের অভাব দীর্ঘদিনের। তাই এ ধরনের একটি বই প্রকাশিত হচ্ছে শুনে তা হাতে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করছিলাম। বইটি পড়তে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, লেখক কী অসাধারণ নিষ্ঠা ও সুনিপুণ ভাষায় একটি জটিল আইনগত বিষয়কে পাঠকের কাছে সহজ, সাবলীল ও বোধগম্য করে উপস্থাপন করেছেন!
Confession শুধু একটি শব্দ; অথচ এই একটি শব্দই অসংখ্য মামলায় মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা, দণ্ড কিংবা খালাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সত্য ও মিথ্যার প্রশ্ন, voluntariness-এর প্রশ্ন, পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের সীমা, Magistrate-এর দায়িত্ব, সাংবিধানিক অধিকার এবং সর্বোপরি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
আরও পড়ুন : আইনজীবীর ডোপ টেস্ট: আদালতের ক্ষমতার সীমা কোথায়?
লেখক বইটিতে দোষস্বীকারোক্তি (Confession)-এর ধারণা, প্রকৃতি, শ্রেণিবিভাগ, দার্শনিক ভিত্তি, ঐতিহাসিক বিকাশ, গ্রহণযোগ্যতা, সাক্ষ্যগত মূল্য, সাংবিধানিক দিক, দোষস্বীকারোক্তি রেকর্ড করার পদ্ধতি ইত্যাদি যাবতীয় খুঁটিনাটি দিক চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের confession-এর সাক্ষ্যগত মূল্যায়ন এবং কোন পরিস্থিতিতে একটি confession আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে কিংবা প্রত্যাখ্যাত হবে, সে বিষয়ে গ্রন্থটির আলোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের প্রায় তিন শত বিচারিক নজির (Precedent) আলোচনা করে লেখক বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, একজন আসামির দোষস্বীকারোক্তি (Confession) কীভাবে আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হতে পারে এবং কোন কোন দিক বিবেচনায় দোষস্বীকারোক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে আসামির নির্দোষিতা প্রতিষ্ঠা করে আসামিকে মিথ্যা ও অনিচ্ছাকৃত দোষস্বীকারোক্তি ও অভিযোগের দায় থেকে মুক্তি দেওয়া যায়। Confession-এর দণ্ডদায়ক শক্তি এবং তা প্রত্যাখ্যানের আইনগত ভিত্তি—উভয় দিকই গ্রন্থটিতে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে।
এই অমূল্য গ্রন্থটি লিখেছেন বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচারক জনাব শিহাবুল ইসলাম। যতদূর জানি, বইটি লেখকের রচিত প্রথম গ্রন্থ। প্রথম গ্রন্থ হিসেবেই বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁর সাহস, গবেষণার ব্যাপ্তি এবং বিষয়টির প্রতি গভীর অনুরাগ প্রশংসনীয়।
আরও পড়ুন : ‘নোট বাণিজ্য’ থেকে মুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস: রুহুল কুদ্দুস
বইটিতে দোষস্বীকারোক্তি (Confession) সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়কে যেভাবে সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে লেখক বইটিকে তাঁর জ্ঞান-অনুরাগের ‘প্রথম প্রেম’ গণ্য করে পাঠকের জন্য উপভোগ্য করার প্রাণান্তর চেষ্টা করেছেন। ইংরেজি ভাষায় লেখা হলেও বইটির ভাষা সরল, প্রাঞ্জল ও সহজবোধ্য। জেলা জজ পদমর্যাদার বিচারক জনাব শিহাবুল ইসলাম তাঁর লেখায় যেমন Confession-এর তাত্ত্বিক দিক তুলে ধরেছেন, তেমনি তাঁর বিচারিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার অসাধারণ প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।
বিচারাঙ্গনের এক অনুপম দিকপাল বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি জনাব হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর লেখা মুখবন্ধ (Foreword) বইটিতে নিঃসন্দেহে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।
আমার বিবেচনায় আইন জগতের ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক, লেখক, আইনজীবী, বিচারক ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য LAW OF CONFESSION একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আশা করা যায়, বাংলাদেশের আইনাঙ্গনের সকল প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারে বইটির উপস্থিতি সচেতন পাঠকদের জ্ঞানপিপাসা মেটাতে এবং Confession সংক্রান্ত আইন ও বিচারিক নীতিমালা সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে সহায়তা করবে।
বইটি প্রকাশ করেছে বুনইয়ান পাবলিকেশন্স। ৩৫৮ পৃষ্ঠার এই বইটির মূল্য মাত্র ৮০০ টাকা (কমিশন মূল্যে ৫০০ টাকা)। বইটি পরিবেশন করছে আমিন বুক হাউজ, ইউনিভার্সাল বুক হাউজ, রহিম ল বুক হাউজ, শামিম ল বুক হাউজ এবং মিঠু ল বুক হাউজে। এছাড়া প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বইটি অনলাইনে (যোগাযোগ: ০১৯০৭৩৫০৮৯৬) ক্রয়ের সুযোগ আছে।
সবশেষে, লেখক জনাব শিহাবুল ইসলামের প্রতি শুভকামনা রইল। তাঁর এই প্রথম গ্রন্থের মধ্য দিয়ে যে সৃষ্টিশীলতা, অধ্যবসায় ও গবেষণামনস্কতার পরিচয় পাওয়া গেল, তা অব্যাহত থাকুক। ভবিষ্যতে তাঁর কলম থেকে আইন ও বিচারাঙ্গনের জন্য আরও মূল্যবান ও গবেষণাসমৃদ্ধ গ্রন্থ উপহার পাব—এই প্রত্যাশা রইল।
লেখক : মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন; বিশেষ জজ (সিনিয়র জেলা জজ), বিশেষ জজ আদালত-৫, ঢাকা।

