জিয়াবুল আলম
অ্যাডভোকেট জিয়াবুল আলম

আইনজীবীর ডোপ টেস্ট: আদালতের ক্ষমতার সীমা কোথায়?

চট্টগ্রাম আদালতে একজন আইনজীবীর ডোপ টেস্ট করানোর নির্দেশ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর জামিন শুনানির সময় আইনজীবীর কথাবার্তা ও আচরণ আদালতের কাছে অস্বাভাবিক মনে হওয়ার পর তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডোপ টেস্ট করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা সাধারণত শুরু হয়—আইনজীবী সেদিন কীভাবে কথা বলেছেন, তাঁর আচরণ কেমন ছিল, আদালত কেন এমন মনে করলেন। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে এর চেয়েও মৌলিক প্রশ্ন আছে। সেটি হলো—একজন আইনজীবীর আচরণ অস্বাভাবিক মনে হলে তাঁকে ডোপ টেস্ট করানোর সুনির্দিষ্ট ক্ষমতা আদালত কোন আইন থেকে পেলেন?

এটি কোনো ব্যক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার প্রশ্ন নয়। এটি বিচারিক ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের প্রশ্ন।

সন্দেহ থেকে কি ক্ষমতা সৃষ্টি হয়?

আদালতে কোনো ব্যক্তির আচরণ অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। তিনি অসুস্থ হতে পারেন, শারীরিকভাবে দুর্বল হতে পারেন, ঘুমের ঘাটতিতে থাকতে পারেন, কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় থাকতে পারেন কিংবা অন্য কোনো কারণে স্বাভাবিক আচরণ করতে নাও পারেন।

তাই অস্বাভাবিক আচরণ মানেই মাদক গ্রহণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

কিন্তু আদালতের পর্যবেক্ষণ যদি ডোপ টেস্টের নির্দেশে পরিণত হয়, তখন বিষয়টি আর শুধু আদালতের শৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যে থাকে না। তখন একজন ব্যক্তির শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ, তা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ এবং পরীক্ষার ফলকে সম্ভাব্য আইনগত ব্যবস্থার ভিত্তি করার প্রশ্ন সামনে আসে।

অর্থাৎ এখানে দুটি পৃথক বিষয় আছে—আচরণ সম্পর্কে বিচারকের সন্দেহ এবং শারীরিক পরীক্ষা করানোর আইনগত ক্ষমতা।

প্রথমটি থেকে দ্বিতীয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হয় না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন কী বলছে?

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ২৪ ধারা।

ধারা ২৪(১)-এ বলা হয়েছে, এই আইনের অধীন কোনো তদন্ত অথবা তল্লাশি পরিচালনাকালে কোনো অফিসারের যথেষ্ট কারণ থাকলে কোনো ব্যক্তি তাঁর শরীরের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে মাদকদ্রব্য লুকিয়ে রেখেছেন—এমন বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ করে তাঁকে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম, এন্ডোস্কপি, কোলনস্কপি কিংবা রক্ত, মলমূত্রসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর জন্য নিজেকে সমর্পণের নির্দেশ দিতে পারেন।

এখানে আইন হঠাৎ করে কাউকে পরীক্ষা করানোর অবাধ ক্ষমতা দেয়নি। বরং কয়েকটি শর্ত দিয়েছে—তদন্ত বা তল্লাশি থাকতে হবে, যথেষ্ট কারণ থাকতে হবে, সেই কারণ লিপিবদ্ধ করতে হবে এবং ক্ষমতাটি নির্দিষ্ট অফিসারের সঙ্গে যুক্ত।

একই ধারার ২৪(৪)-এ বলা হয়েছে, মাদকাসক্ত ব্যক্তি শনাক্ত করার প্রয়োজনে বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ডোপ টেস্ট করা যাবে। ডোপ টেস্ট পজিটিভ হলে ধারা ৩৬(৪) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

অর্থাৎ আইনে ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা অবশ্যই আছে।

কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্ন—আইনে ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা আছে—এটি এক কথা; আর আদালতের একজন বিচারকের হাতে আদালতকক্ষে উপস্থিত একজন আইনজীবীর ডোপ টেস্ট করানোর স্বতন্ত্র ক্ষমতা আছে—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।

ধারা ২৪-এর ভাষা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আইনের ক্ষমতা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে শুধু কোনো একটি শব্দ নয়, পুরো ধারার কাঠামো দেখতে হয়।

ধারা ২৪(১) তদন্ত বা তল্লাশির প্রেক্ষাপটে শারীরিক পরীক্ষার ক্ষমতা দিয়েছে। সেখানে ‘অফিসার’-এর কথা বলা হয়েছে। আবার ২৪(৪) ডোপ টেস্টের ক্ষেত্রে ‘বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতি’র কথা বলেছে।

কিন্তু আদালতে একজন আইনজীবীর আচরণ অস্বাভাবিক মনে হওয়ার কারণে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিজ উদ্যোগে তাঁকে ডোপ টেস্ট করানোর একটি সাধারণ ক্ষমতা এই ধারায় সরাসরি লেখা নেই।

এখানেই এখতিয়ারের প্রশ্ন।

আইন যখন কোনো বিশেষ ক্ষমতা বিশেষ পরিস্থিতি ও নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়, তখন সেই ক্ষমতাকে আদালতের সাধারণ ক্ষমতা হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে আরও সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি প্রয়োজন।

বিচার করা আর তদন্ত করা এক নয়

আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় একটি মৌলিক পার্থক্য আছে—তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা এবং বিচারিক আদালতের ক্ষমতা এক নয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীন অপরাধের বিচার এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত করে। আইনটির ৪৪ ধারাও মাদকদ্রব্য অপরাধের বিচার এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতের ওপর ন্যস্ত করেছে।

কিন্তু কোনো আদালত একটি অপরাধের বিচার করেন বলেই সেই অপরাধের তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রত্যেকটি অনুসন্ধানমূলক ক্ষমতা আদালতের হাতে চলে আসে না।

তল্লাশি, জব্দ, তদন্ত, শারীরিক পরীক্ষা, নমুনা সংগ্রহ এবং বিচার—প্রতিটি কাজের আইনগত উৎস পৃথক হতে পারে।

তাই ‘আদালত মাদক মামলা বিচার করেন’—এই যুক্তি থেকে ‘আদালত যেকোনো ব্যক্তির ডোপ টেস্ট করাতে পারেন’—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো আইনগতভাবে সরলীকরণ হবে।

আদালতের শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা কি যথেষ্ট?

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখাটি রয়েছে।

আদালত অবশ্যই তাঁর কার্যক্রমের শৃঙ্খলা রক্ষা করবেন। কোনো আইনজীবী আদালতের কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করলে বা আদালতের নির্দেশ অমান্য করলে আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা আদালতের রয়েছে।

কিন্তু আদালতের শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা এবং ব্যক্তির শরীরে মেডিকেল বা ফরেনসিক পরীক্ষা করানোর ক্ষমতা একই ক্ষমতা নয়।

একজন আইনজীবীর আচরণে সমস্যা থাকলে আদালত তাঁকে সতর্ক করতে পারেন, শুনানি স্থগিত করতে পারেন, আদালতের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন এবং প্রযোজ্য আইনে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারেন।

কিন্তু ডোপ টেস্ট একটি শারীরিক পরীক্ষা। এর মাধ্যমে ব্যক্তির শরীর থেকে নমুনা নেওয়া হয়। সেই নমুনার ভিত্তিতে তাঁর মাদক গ্রহণের বিষয়টি অনুসন্ধান করা হয়।

সুতরাং এর জন্য আলাদা আইনগত ভিত্তি প্রয়োজন।

অন্তর্নিহিত ক্ষমতা কি সবকিছুর উত্তর?

বিচারিক ক্ষমতার আলোচনায় প্রায়ই ‘inherent power’ বা অন্তর্নিহিত ক্ষমতার কথা আসে।

কিন্তু inherent power কোনো সীমাহীন ক্ষমতা নয়।

Ghulam Mohammad v. Mozammel Khan, 19 DLR (SC) 439 মামলায় বলা হয়েছিল, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ক ধারার inherent jurisdiction কোনো বিকল্প বা অতিরিক্ত jurisdiction নয়; এটি ন্যায়বিচারের স্বার্থে সংরক্ষিত ক্ষমতা, যেখানে অন্য কোনো কার্যকর পদ্ধতি নেই বা আইনে তার ব্যবস্থা করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়েও ওই নীতিটি উদ্ধৃত হয়েছে।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। ৫৬১ক ধারার inherent jurisdiction হাইকোর্ট বিভাগের বিশেষ এখতিয়ারের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এই নীতিকে সরাসরি ব্যবহার করে অধস্তন ফৌজদারি আদালতের হাতে নতুন ধরনের শারীরিক পরীক্ষা করানোর ক্ষমতা সৃষ্টি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত স্বতঃসিদ্ধ নয়।

বিশেষ আইনে যখন ডোপ টেস্টের নিজস্ব বিধান রয়েছে, তখন সেই বিধানের সীমা অতিক্রম করে inherent power-এর বিস্তৃত প্রয়োগ আরও সতর্কতার দাবি রাখে।

সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ

বিষয়টি সাংবিধানিক প্রশ্নও তৈরি করে।

সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ওপর ক্ষতিকর ব্যবস্থা আইনানুযায়ী না হলে নেওয়া যাবে না। ৩২ অনুচ্ছেদেও আইনানুযায়ী ছাড়া জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

এর অর্থ এই নয় যে ডোপ টেস্ট সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ।

বরং সাংবিধানিক প্রশ্নটি আরও মৌলিক—একজন ব্যক্তির দেহে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের আইনগত ভিত্তি কী?

আদালতের আদেশ হলে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ বিচারিক আদেশের শক্তি শুধু বিচারকের পদমর্যাদা থেকে আসে না; আসে আইনপ্রদত্ত এখতিয়ার থেকে।

‘বিচারকের সন্দেহ’ আইনগত ক্ষমতার বিকল্প নয়

বিচারকের পর্যবেক্ষণ বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বিচারকের সন্দেহ কোনো statutory power নয়।

কেউ অস্বাভাবিক আচরণ করছেন—এটি একটি factual observation হতে পারে।

তাঁকে ডোপ টেস্ট করানো—এটি একটি coercive legal measure।

দুটির মাঝখানে আইনের অনুমোদন থাকা প্রয়োজন।

সুতরাং চারটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি—

  • কোন আইনে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে?
  • কোন কর্তৃপক্ষ সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন?
  • কোন পরিস্থিতিতে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে?
  • কোন নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরীক্ষা করতে হবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে শারীরিক পরীক্ষা করানোর আদেশের এখতিয়ারগত ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

আইনজীবী বলে বিশেষ সুবিধা নয়, বিশেষ অসুবিধাও নয়

এখানে আরেকটি নীতি মনে রাখা দরকার।

আইনজীবী আদালতের কর্মকর্তা নন—এমন সরলীকরণও ঠিক নয়; আবার আইনজীবী আদালতের সামনে দাঁড়ালেই তাঁর ব্যক্তিগত অধিকার বিলীন হয়ে যায়—এমন ধারণাও গ্রহণযোগ্য নয়।

আইনজীবী আদালতের বিচারকার্যে সহযোগী। তাঁর পেশাগত আচরণের ওপর আদালতের নিয়ন্ত্রণ আছে। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণও আইনের সীমার মধ্যে।

অন্যদিকে কোনো আইনজীবী যদি সত্যিই মাদকাসক্ত হন বা মাদক গ্রহণ করে আদালতে আসেন, সেটিও অবশ্যই আইনগতভাবে গুরুত্ব পাওয়ার বিষয়। কিন্তু সেই সত্য নির্ধারণের পথও আইনসম্মত হতে হবে।

আইন প্রয়োগের নামে আইনকে পাশ কাটানো যায় না।

শেষ প্রশ্নটি ক্ষমতার

পূর্ণাঙ্গ আদেশ এবং সেখানে উল্লেখিত আইনগত ভিত্তি না দেখে নির্দিষ্ট আদেশকে চূড়ান্তভাবে অবৈধ বলা সতর্কতার বাইরে হবে। একইভাবে, ‘বিচারক আদেশ দিয়েছেন, সুতরাং ক্ষমতা ছিল’—এই যুক্তিও আইনের শাসনের জন্য যথেষ্ট নয়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ২৪ ধারায় ডোপ টেস্টের বিধান রয়েছে। কিন্তু সেই বিধান তদন্ত, তল্লাশি, অফিসারের ক্ষমতা এবং বিধি-নির্ধারিত পদ্ধতির কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে।

তাই আদালতের সাধারণ শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা থেকে একজন আইনজীবীর ডোপ টেস্ট করানোর স্বতন্ত্র ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হয়েছে—এমন কথা বলার আগে নির্দিষ্ট আইনগত উৎস দেখানো প্রয়োজন।

বিচারব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় বিচারকের প্রতিটি আদেশকে প্রশ্নাতীত ঘোষণা করা নয়; বরং নিশ্চিত করা যে প্রতিটি আদেশ আইন, এখতিয়ার ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

কারণ আইনের শাসনে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু— আদালত কী আদেশ দিয়েছেন? প্রশ্নটি আরও গভীর— কোন আইন আদালতকে সেই আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর যত স্পষ্ট হবে, বিচারিক ক্ষমতার মর্যাদা ততই সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক: জিয়াবুল আলম, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।