আদালতে চলমান কোনো বিচারিক কার্যধারায় দাখিলকৃত রেজিস্টার্ড বা আনরেজিস্টার্ড দলিল, সোলেনামা, জবানবন্দি কিংবা অন্য কোনো লিখিত দলিলকে জাল, কৃত্রিম বা মিথ্যা দাবি করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে পৃথক ফৌজদারি মামলা দায়ের করার একটি প্রবণতা আমাদের বিচারব্যবস্থায় কমবেশি পরিলক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের মামলা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এবং বছরের পর বছর বিচারাধীন অবস্থায় থেকে যায়। প্রশ্ন হলো—বিচারিক কার্যধারার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত কোনো দলিল জালিয়াতির অভিযোগ উত্থাপিত হলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কি ইচ্ছামতো পৃথক ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে পারেন, নাকি এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধিতে নির্ধারিত বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে?
এখানে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৫ ও ৪৭৬ ধারার বিধান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনো অপরাধ যদি বিচারিক কার্যধারায় সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়, অথবা কোনো দলিল আদালতের কার্যধারায় দাখিল বা উপস্থাপনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে এবং সেই দলিলকে কেন্দ্র করে জালিয়াতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়, তাহলে বিষয়টি সবসময় সাধারণ ফৌজদারি মামলার মতো বিবেচনা করার সুযোগ থাকে না। আইন নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে অভিযোগ দায়েরের একটি বিশেষ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৭৬ ধারার মূল তাৎপর্য এখানেই। সংশ্লিষ্ট আদালতের নিকট যদি প্রতীয়মান হয় যে, বিচারিক কার্যধারার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং সে অপরাধের বিচারার্থে অভিযোগ দায়ের করা প্রয়োজন, তাহলে আদালত প্রাথমিক অনুসন্ধান বা প্রয়োজনীয় তদন্তমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট লিখিত অভিযোগ প্রেরণ করতে পারেন। অর্থাৎ, এমন ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগে পৃথক মামলা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আইন আদালতকে একটি বিশেষ ভূমিকা অর্পণ করেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। বিচারিক কার্যধারার বাইরে সংঘটিত কোনো দলিল জালিয়াতির অভিযোগ এবং কোনো বিচারিক কার্যধারায় দাখিল, উপস্থাপন বা ব্যবহৃত দলিলকে কেন্দ্র করে জালিয়াতির অভিযোগ—এই দুই পরিস্থিতি আইনগতভাবে অভিন্ন নয়। বিশেষ করে যখন অভিযোগিত অপরাধটি বিচারিক কার্যধারার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৫ ধারার নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত, তখন আদালতের অনুমোদিত ও নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৫ ধারার বিধান মূলত এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে ফৌজদারি মামলা দায়েরের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট আদালতের অভিযোগের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করে। আর ৪৭৬ ধারা সেই অভিযোগ দায়েরের পদ্ধতিগত কাঠামো প্রদান করে। ফলে ১৯৫ ধারার বিধান প্রযোজ্য এমন কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে সরাসরি ব্যক্তিগত অভিযোগের মাধ্যমে মামলা পরিচালনা করা হলে, সেই মামলার গ্রহণযোগ্যতা ও cognizance গ্রহণের বৈধতা নিয়ে গুরুতর আইনগত প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
এখানে আরও একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কেবল কোনো দলিল আদালতে দাখিল করা হয়েছে বলেই প্রতিটি পরবর্তী জালিয়াতির অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৪৭৬ ধারার আওতায় পড়বে, এমনটি বলা যায় না। অপরাধটি কখন সংঘটিত হয়েছে, দলিলটি কখন তৈরি বা জাল করা হয়েছে, আদালতের কার্যধারার সঙ্গে অপরাধটির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক কী, এবং অভিযোগটি ১৯৫ ধারায় উল্লিখিত কোনো অপরাধের মধ্যে পড়ে কি না—এসব বিষয় নির্ধারণ করেই সঠিক আইনগত পদ্ধতি নির্বাচন করতে হবে।
অন্যদিকে, ১৯৫ ধারার আওতাভুক্ত কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে আইননির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এমন ব্যক্তির মাধ্যমে মামলা পরিচালিত হলে, যিনি আইন অনুসারে অভিযোগকারী হিসেবে নির্ধারিত নন, তখন মামলার গ্রহণযোগ্যতা ও বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে। বিশেষত অভিযোগ গ্রহণের পর্যায়, cognizance-এর বৈধতা এবং পরবর্তী চার্জ গঠনের পর্যায়ে এ ধরনের আপত্তি যথাযথভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। তবে কোনো নির্দিষ্ট মামলায় অভিযোগটি খারিজ, আসামিকে অব্যাহতি বা discharge-এর উপযুক্ত কি না, তা সংশ্লিষ্ট অপরাধ, অভিযোগের প্রকৃতি এবং মামলার কার্যধারার পর্যায় বিবেচনা করেই নির্ধারণ করতে হবে; বিষয়টি সব ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়।
আইনের এই প্রক্রিয়াগত সুরক্ষার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উদ্দেশ্য রয়েছে। বিচারিক কার্যধারায় ব্যবহৃত দলিলকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে প্রত্যেক পক্ষ যদি নিজের উদ্যোগে পৃথক ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে পারে, তাহলে মূল বিচারিক কার্যধারার পাশাপাশি একাধিক ফৌজদারি মামলা সৃষ্টি হয়ে বিচারপ্রক্রিয়াকে জটিল ও দীর্ঘায়িত করার আশঙ্কা থাকে। একই দলিলের সত্যতা, জালিয়াতি বা ব্যবহার নিয়ে একাধিক ফোরামে সমান্তরাল কার্যধারা চললে বিচারিক শৃঙ্খলা ও প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
এ কারণেই আইন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আদালতের ওপর বিষয়টি প্রাথমিকভাবে যাচাই করার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। আদালত যদি মনে করেন যে, বিচারিক কার্যধারায় স্বার্থে বা ন্যায়বিচারের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, তাহলে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অভিযোগ দায়েরের উদ্যোগ নিতে পারেন। এর ফলে একদিকে যেমন মিথ্যা বা হয়রানিমূলক ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, অন্যদিকে প্রকৃত জালিয়াতির ঘটনাও যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ায় বিচারের আওতায় আনা যায়।
সুতরাং, বিচারিক কার্যধারায় দাখিলকৃত কোনো দলিল জাল—এমন অভিযোগ উঠলেই সেটিকে সাধারণ দলিল জালিয়াতির মামলা হিসেবে দেখার পরিবর্তে প্রথমেই দেখতে হবে—অভিযোগিত অপরাধের প্রকৃতি কী, তা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৫ ধারার আওতাভুক্ত কি না এবং হলে ৪৭৬ ধারায় নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে কি না।
আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ন্যায়বিচার, বিচারিক শৃঙ্খলা এবং ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার অপব্যবহার রোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা। যথাযথ ক্ষেত্রে ১৯৫ ও ৪৭৬ ধারার বিধান কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে একই ঘটনা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ও দীর্ঘস্থায়ী পৃথক মামলা দায়েরের প্রবণতা অনেকাংশে হ্রাস পেতে পারে এবং বিচারিক সময় ও রাষ্ট্রীয় সম্পদেরও সাশ্রয় হবে।
অতএব, বিচারিক কার্যধারায় দাখিলকৃত দলিলকে কেন্দ্র করে জালিয়াতির অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি কেবল “দলিলটি জাল কি না”—এখানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং “অভিযোগটি কোন পদ্ধতিতে, কার মাধ্যমে এবং কোন আইনি বিধানের অধীনে উত্থাপিত হয়েছে”—এই প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আইনসম্মত সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করাই পারে অপ্রয়োজনীয় মামলার বিস্তার রোধ করে বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর, সুশৃঙ্খল ও ন্যায়সংগত করতে।
লেখক: রাজীব কুমার দেব, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ।

