প্রধান বিচারপতির বিশেষ উদ্যোগ : সোয়া দুই ঘণ্টায় হাইকোর্টের নয় বেঞ্চে ৩১৯০ মামলা নিষ্পত্তি
মামলা ফাইল (প্রতীকী ছবি)

হাইকোর্টে রিট নিষ্পত্তির হার বেড়েছে, ব্যক্তিস্বার্থের মামলা বন্ধের তাগিদ অ্যাটর্নি জেনারেলের

চলতি বছরে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে নতুন রিট মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে এবং ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে করা রিটের প্রবণতা কমানো গেলে মামলার চাপ আরও কমবে বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। সাম্প্রতিক হাইকোর্টের কার্যতালিকাতেও বিপুলসংখ্যক রিট মামলা নিষ্পত্তি ও শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত থাকার বিষয়টি দেখা যায়।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আদালতে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছেন। বিচারিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গেলে রিট মামলার সংখ্যাও কমে আসবে।

তিনি বলেন, “আদালতে যদি শৃঙ্খলা থাকে, তাহলে প্রকৃতপক্ষে মানুষ ন্যায়বিচার পায়।”

দ্বিতীয় প্রান্তিকে নিষ্পত্তি হয়েছে ৯ হাজার ৫৯০ রিট

সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি।

জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে নতুন রিট মামলা দায়ের হয় ৪ হাজার ১১২টি। এ সময়ে নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ২১৩টি রিট মামলা।

এরপর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত তিন মাসে নতুন রিট মামলা দায়ের হয় ৪ হাজার ৭২৯টি। বিপরীতে এ সময়ে নিষ্পত্তি হয় ৯ হাজার ৫৯০টি রিট মামলা। অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকে নতুন করে দায়ের হওয়া মামলার তুলনায় নিষ্পত্তির সংখ্যা ছিল প্রায় দ্বিগুণ।

জুনের শেষে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টি।

ব্যক্তিস্বার্থে ‘জনস্বার্থের মামলা’ নিয়েও প্রশ্ন

হাইকোর্টে লক্ষাধিক রিট মামলা বিচারাধীন থাকার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অনেক ক্ষেত্রে জনস্বার্থে মামলা বা পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশনের (পিআইএল) নামে ব্যক্তি স্বার্থে রিট করা হচ্ছে।

তাঁর মতে, এসব মামলার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য আত্মপ্রচার। তিনি বলেন, অনেকে রিট মামলা করার পরপরই গণমাধ্যমের সামনে উপস্থিত হন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত।

আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত মানার ওপর জোর

অ্যাটর্নি জেনারেল সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় হাইকোর্ট বিভাগের জন্য বাধ্যতামূলক।

তিনি বলেন, কোন ধরনের মামলা হাইকোর্ট গ্রহণ করতে পারে বা পারে না—এ বিষয়ে আপিল বিভাগের একাধিক রায়ে নির্দেশনা রয়েছে। তাঁর উদাহরণ, প্রাইভেট ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট পিটিশন গ্রহণযোগ্য নয়—এমন সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে রয়েছে।

তবু সময়ে সময়ে বিভিন্ন হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রাইভেট ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট গ্রহণ করে আদেশ দেওয়ায় বিচারিক ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের বিষয়গুলোতে বিচারিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গেলে রিট মামলার সংখ্যা কমবে।

ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে সরাসরি রিট নয়

ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়েও সরাসরি হাইকোর্টে রিট করার প্রবণতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

তিনি বলেন, জমি দখল, জমির সীমানা, বিল-বাঁওড়সহ ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়েও সরাসরি রিট পিটিশন করা হচ্ছে। অথচ এ ধরনের বিরোধের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনি ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিম্ন আদালতে মামলা করে প্রতিকার চাইতে পারেন।

নিম্ন আদালতের প্রচলিত পদ্ধতি এড়িয়ে সরাসরি হাইকোর্টে আসার কারণে রিট মামলার সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

সংবিধানে পাঁচ ধরনের রিট

বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্টে বিভিন্ন ধরনের রিট করার সুযোগ রয়েছে। প্রচলিত পাঁচ ধরনের রিট হলো—

হেবিয়াস করপাস: কোনো ব্যক্তিকে আইনগত কারণ ছাড়া আটক রাখা হলে তাঁকে আদালতের সামনে হাজির করার নির্দেশ চেয়ে এ রিট করা যায়।

ম্যান্ডামাস: কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী যে দায়িত্ব পালনে বাধ্য, তা পালন না করলে সেই দায়িত্ব পালনের নির্দেশ চেয়ে এ রিট করা যায়।

সার্টিওরারি: কোনো বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনবহির্ভূতভাবে আদেশ দিলে তা বাতিলের জন্য এ রিট করা যায়।

প্রহিবিশন: কোনো বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনগত ক্ষমতার বাইরে কোনো মামলা পরিচালনা করতে শুরু করলে সেই কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ চেয়ে এ রিট করা যায়।

কো-ওয়ারেন্টো: কোনো ব্যক্তি আইনগত যোগ্যতা ছাড়া সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করলে ওই পদে তাঁর অধিকার বা বৈধতা যাচাইয়ের জন্য এ রিট করা হয়।

জনস্বার্থের রিটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

‘মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জনস্বার্থে রিটের আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়। ওই রায়ের পর জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট করার সুযোগ পায়।

গত কয়েক দশকে জনস্বার্থে করা বিভিন্ন রিট মামলার মাধ্যমে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য, নারী-শিশু ও প্রান্তিক মানুষের অধিকারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা এসেছে।

রিটের রায় ও আদেশের মাধ্যমে দেশের নদ-নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, নদী দখলদার উচ্ছেদ, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ, পাহাড় কাটা প্রতিরোধ এবং দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের জন্য মানবিক ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার নজির রয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির করা রিটের রায় বা আদেশের সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ভোগ করেছে।