অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

যৌতুক মামলায় কেন বেশিরভাগ আসামি খালাস পান: আইনি বাস্তবতা

সিরাজ প্রামাণিক : বাংলাদেশে যৌতুক নিরোধ আইনের অধীনে দায়ের হওয়া অসংখ্য মামলায় দেখা যায়, বছরের পর বছর বিচার চলার পরও আসামি শেষ পর্যন্ত খালাস পেয়ে যান। এতে অনেকেই মনে করেন, আইন বুঝি দুর্বল বা আদালত নারীর পক্ষে নয়। বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন—সমস্যাটা আইনে নয়, মামলা প্রমাণের প্রক্রিয়ায়।

ফৌজদারি আইনের মূল নীতি হলো—সন্দেহাতীতভাবে (beyond reasonable doubt) অপরাধ প্রমাণ করতে হবে। সামান্যতম যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকলেও তার সুবিধা আসামি পাবেন। এটি করুণা নয়, বরং আসামির আইনি অধিকার।

বেশিরভাগ যৌতুক মামলায় সাক্ষী হন বাদীর ভাই, মামা, প্রতিবেশী বা নিকটাত্মীয়। আদালতের দীর্ঘদিনের অনুসৃত নীতি হলো—নিকটাত্মীয় বা স্বার্থযুক্ত সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হলেও তার জন্য স্বাধীন, নিরপেক্ষ সমর্থনকারী (corroborative) সাক্ষ্য প্রয়োজন। প্রতিবেশী, ব্যবসায়ী বা এলাকার নিরপেক্ষ কাউকে সাক্ষী না করলে মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে।

জেরায় প্রায়ই দেখা যায়, সাক্ষীরা কে, কখন, কোথায় যৌতুক দাবি করা হয়েছিল—তার তারিখ-সময় মনে করতে পারেন না। একে অপরের বক্তব্যের সঙ্গে মিলে না, এমনকি এজাহারের মূল বক্তব্য থেকেও সরে যান। এমন পারস্পরিক অসঙ্গতি মামলার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে।

ঘটনার পর যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা ছাড়া দীর্ঘ বিলম্বে মামলা করা হলে আদালত সেটিকে সন্দেহজনক হিসেবে দেখেন—কারণ বিলম্বে বাদীপক্ষের বক্তব্য সাজানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে ধরে নেওয়া হয়।

অনেক মামলায় দেখা যায়, অভিযোগ করা ঘটনার আগেই স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন এবং যথাযথভাবে (রেজিস্ট্রি ডাকযোগে, সঠিক ঠিকানায়) নোটিশ পাঠিয়েছেন। জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের অধীনে সঠিক প্রক্রিয়ায় রেজিস্ট্রি ডাকে পাঠানো চিঠি প্রাপকের কাছে যথাসময়ে জারি হয়েছে বলে গণ্য হয়—প্রাপক গ্রহণ না করলেও। এমন পরিস্থিতিতে তালাকের পরবর্তী সময়ে ‘স্বামীর বাড়িতে অবস্থানকালে যৌতুকের জন্য নির্যাতন’-এর অভিযোগ যুক্তিসংগত হয় না।

আসামিপক্ষকে তার বক্তব্য সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয় না—এটি যুক্তিসংগতভাবে সত্য হতে পারে, এমন সম্ভাবনা দেখাতে পারলেই পুরো প্রসিকিউশন কেসে সন্দেহ তৈরি হয়ে যায় এবং তার সুফল আসামি পান।

ভুক্তভোগীর জন্য

সত্যিকারের যৌতুক নির্যাতনের শিকার হলে ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে (বিলম্ব না করে) মামলা করা, সম্ভব হলে অন্তত একজন নিরপেক্ষ-স্বতন্ত্র সাক্ষী রাখা এবং ঘটনার তারিখ-সময়-স্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া মামলাকে অনেক শক্তিশালী করে।

অভিযুক্তের জন্য

নিরপরাধ হলে বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর পরিশোধ, নোটিশ প্রেরণ ইত্যাদির যাবতীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ ও যথাসময়ে আদালতে উপস্থাপন করাই আত্মপক্ষ সমর্থনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

আইন নারীর সুরক্ষার জন্যই তৈরি—কিন্তু ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় শক্তিশালী, সামঞ্জস্যপূর্ণ ও নিরপেক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে, আবেগ বা অভিযোগের তীব্রতার ভিত্তিতে নয়।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক।