প্রস্তাবিত ‘কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল’-এর জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। রাজধানী ঢাকা ও কেরানীগঞ্জের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত প্রাকৃতিক জলাধার ও বন্যা প্রবাহ এলাকা সংরক্ষণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের পৈতৃক ভিটেমাটি ও কৃষিজমি রক্ষার দাবিতে এ নোটিশ পাঠানো হয়।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন কেরানীগঞ্জের পশ্চিম সোনাকান্দা এলাকার ভূমির মালিক আব্দুল মতিন, মজিবর রহমান, রুফিযা বেগম ও পিয়ার আলীর পক্ষে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে এ ‘ডিমান্ডিং জাস্টিস নোটিশ’ পাঠান।
নোটিশটি মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (BEZA) নির্বাহী চেয়ারম্যান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (RAJUK) চেয়ারম্যান এবং ঢাকার জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো হয়েছে।
বন্যা প্রবাহ এলাকা রক্ষার দাবি
আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, কেরানীগঞ্জ বৃহত্তর ঢাকা মহানগরের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন পথ। এলাকাটি বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত।
নোটিশে আরও দাবি করা হয়েছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (DAP) ও পরিবেশগত মাস্টার প্ল্যানে কেরানীগঞ্জের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিস্তীর্ণ নিচু জমি ও জলাভূমিকে ‘মূল বন্যা প্রবাহ এলাকা’ (Main Flood Flow Zone) এবং ‘উপ-বন্যা প্রবাহ এলাকা’ (Sub-Flood Flow Zone) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও নদীর পানি বৃদ্ধির সময় এসব জলাশয় ও প্লাবনভূমির মাধ্যমে ঢাকা মহানগরের পানি প্রাকৃতিকভাবে নিষ্কাশিত হয় বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনজীবীর দাবি, এসব জলাভূমি বালু দিয়ে ভরাট করে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে কেরানীগঞ্জসহ রাজধানী ঢাকা দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। নোটিশে এ বিষয়টি সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত জীবনের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও দাবি করা হয়েছে।
সংবিধান ও জলাধার সংরক্ষণ আইনের উল্লেখ
নোটিশে সংবিধানের ১৮-ক অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও জলাভূমি রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে।
এ ছাড়া ‘মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সকল পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০’-এর ৫ ধারার উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে দাবি করা হয়েছে, চিহ্নিত প্রাকৃতিক জলাধার বা বন্যা প্রবাহ এলাকার শ্রেণি পরিবর্তন, ভরাট বা ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। একই আইনের ৮ ধারায় প্রাকৃতিক জলাধার বিনষ্ট করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলেও নোটিশে বলা হয়।
আগের অধিগ্রহণের জমি অব্যবহৃত থাকার অভিযোগ
কেরানীগঞ্জে পূর্ববর্তী জমি অধিগ্রহণের বিষয়টিও নোটিশে তুলে ধরা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, পাশের ‘বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’-এর জন্য বিপুল পরিমাণ উর্বর কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা হলেও সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৫ সালে অধিগ্রহণ করা আরও ৪০ দশমিক ৩১ একর জমি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না হওয়ার কথাও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনজীবীর দাবি, পূর্বে অধিগ্রহণ করা জমি অব্যবহৃত রেখে নতুন করে হাজার হাজার একর কৃষিজমি ও বসতভিটা অধিগ্রহণের উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৪২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
১৫ দিনের সময়
আইনি নোটিশে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রস্তাবিত কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত সব কার্যক্রম প্রত্যাহার ও বাতিল করার দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে ড্যাপে চিহ্নিত বন্যা প্রবাহ এলাকা ও প্রাকৃতিক জলাধারগুলো স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আবেদনকারীদের মৌলিক অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলে নোটিশে জানানো হয়েছে।

