সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়

ঘুষের অভিযোগে দণ্ডিত সাবেক রেকর্ড কিপারকে খালাস দিলেন হাইকোর্ট

ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে দণ্ডিত নীল বরণ ত্রিপুরাকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। অভিযোগ প্রমাণে যথেষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া তিন বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের রায় বাতিল করেছেন আদালত। ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে দণ্ডিত নীল বরণ ত্রিপুরার করা আপিল মঞ্জুর করে এ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. বশির উল্লাহর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বিভাগের একক বেঞ্চ এ রায় দেন। সোমবার (১২ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েব সাইটে এ রায় প্রকাশিত হয়েছে।

রায়ে আদালত বলেন, ফৌজদারি মামলায় কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করতে হলে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয়। কেবল সন্দেহ, দাপ্তরিক অনিয়ম কিংবা অভিযুক্তের পলাতক থাকার বিষয়টি দণ্ডাদেশের জন্য যথেষ্ট নয়।

মামলার বিবরণ

মামলার নথি অনুযায়ী, নীল বরণ ত্রিপুরা সুনামগঞ্জের ছাতক সেটেলমেন্ট অফিসে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রেকর্ড কিপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তাঁকে বগুড়া জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে বদলি করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়, দায়িত্ব পালনকালে তিনি জমির রেকর্ড সংশোধন ও আপিল দায়েরের নামে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ নেন। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া নোটিশ, আপিল নম্বর ও মামলার রসিদ ইস্যু করেন। এসব আপিলের অনেকগুলোরই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের রেজিস্টারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। জমির খতিয়ানে মিথ্যা নাম ও দাগ নম্বর সংযোজন এবং বিভিন্ন মামলার নথি সরিয়ে ফেলার অভিযোগও আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ছাতক থানায় ২০১০ সালের ১৪ এপ্রিল মামলা করেন তৎকালীন সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা এস ইউ এম রুহুল আমিন। পরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করে ২০১০ সালের ২৮ ডিসেম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করে।

বিচারিক আদালতে তিন বছরের কারাদণ্ড

মামলাটি সিলেটের বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন ছিল। ২০১২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর নীল বরণ ত্রিপুরার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

বিচার চলাকালে তিনি অনুপস্থিত থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ১৩ জন সাক্ষীকে পরীক্ষা করা হয়।

২০২২ সালের ৩০ মার্চ সিলেটের বিশেষ জজ আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ডবিধির ১৬১ ধারায় তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় আরও তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। পাশাপাশি তাঁকে ৬৯ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। তবে দুই ধারার সাজা একসঙ্গে কার্যকর হওয়ার নির্দেশ ছিল।

পরে ওই রায় ও দণ্ডের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ফৌজদারি আপিল করেন নীল বরণ ত্রিপুরা।

ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি: হাইকোর্ট

আপিলের শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী তাপস কুমার বিশ্বাস ও প্রতিকার চাকমা যুক্তি দেন, কোনো সাক্ষীই নির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করতে পারেননি যে তাঁদের মক্কেল ঘুষ গ্রহণ করেছিলেন। এ ছাড়া সাক্ষীদের বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে এবং অভিযোগকারী এজাহারে উল্লেখিত অভিযোগের সমর্থনে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য দিতে পারেননি।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ ও দ্বিতীয় বিবাদীপক্ষের আইনজীবী এস এম ইকবাল বাহার ভূঁইয়া যুক্তি দেন, সরকারি কর্মচারী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আসামি অবৈধভাবে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছিলেন। সাক্ষীদের বক্তব্য ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর সাজা বহাল রাখার আবেদন জানানো হয়।

উভয় পক্ষের বক্তব্য ও মামলার নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখতে পান, অভিযোগের সমর্থনে সাক্ষীরা অর্থ গ্রহণের নির্দিষ্ট পরিমাণ, তারিখ, সময় ও স্থান যথাযথভাবে উল্লেখ করতে পারেননি।

আদালত বলেন, সাক্ষী আবুল কালাম আজাদ আপিল দায়েরের জন্য ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বললেও সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, অর্থ দেওয়ার তারিখ, সময় ও স্থান উল্লেখ করেননি। অন্য কোনো সাক্ষীও এ অভিযোগের সমর্থনে যথাযথভাবে সাক্ষ্য দেননি।

এ ছাড়া তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল মুকিত কাচি মিয়ার কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা গ্রহণের অভিযোগ উল্লেখ করলেও ওই ব্যক্তিকে আদালতে সাক্ষী হিসেবে হাজির করা হয়নি। এ বিষয়ে এজাহারেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল না। ফলে তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্যের ভিত্তিতে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না।

পলাতক থাকাই দোষী হওয়ার প্রমাণ নয়

রায়ে হাইকোর্ট আরও বলেন, বিচার চলাকালে আসামির অনুপস্থিতিকে বিচারিক আদালত দণ্ডাদেশের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু কাউকে পলাতক থাকার কারণে এককভাবে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

আদালত উল্লেখ করেন, আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা হয়েছিল কিংবা ফৌজদারি কার্যবিধির ৮৭ ও ৮৮ ধারায় প্রয়োজনীয় কার্যক্রম যথাযথভাবে নেওয়া হয়েছিল—এমন প্রমাণ নথিতে পাওয়া যায়নি।

নথি অনুযায়ী, নীল বরণ ত্রিপুরা ২০২১ সালের ২৪ ডিসেম্বর চাকরি থেকে অবসর নেন। তিনি ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর দণ্ডাদেশের বিষয়ে জানতে পারেন এবং একই বছরের ৩ অক্টোবর বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন।

আদালত বলেন, বিচার চলাকালে অনুপস্থিত থাকা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আইনের প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলা এক বিষয় নয়। অভিযুক্ত বিচার কার্যক্রম সম্পর্কে জানতেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তা এড়িয়ে গেছেন—এমন প্রমাণ ছাড়া তাঁর অনুপস্থিতিকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় না।

এ প্রসঙ্গে আদালত State বনাম Lalu Miah and another মামলার (৩৯ DLR (AD), ১৯৮৭, পৃষ্ঠা ১১৭) সিদ্ধান্ত উল্লেখ করেন। ওই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, শুধু পলাতক থাকাই অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ নয়।

দণ্ডাদেশ বাতিল, আসামি খালাস

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সরকারি নথিতে জাল নোটিশ, ভুয়া মামলার নম্বর কিংবা অনিয়মের অভিযোগ সন্দেহ তৈরি করতে পারে। কিন্তু এসব বিষয় দিয়ে ঘুষ দাবি বা গ্রহণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা যায় না।

আদালত মনে করেন, রাষ্ট্রপক্ষ নির্ভরযোগ্য ও আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই বিচারিক আদালতের দেওয়া দণ্ডাদেশ আইনগতভাবে বহাল রাখা যায় না।

ফলে নীল বরণ ত্রিপুরার আপিল মঞ্জুর করে ২০২২ সালের ৩০ মার্চ সিলেটের বিশেষ জজ আদালতের দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তাঁকে আনা অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয় এবং তাঁর জামিননামা অবমুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।