সাঈদ আহসান খালিদ
সাঈদ আহসান খালিদ

আইনজীবীর বয়সসীমা ও ২ বছরের এলএলবি কোর্স: আইন শিক্ষায় দ্বিচারিতা ও প্রহসনের অবসান কবে হবে?

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির (এনরোলমেন্ট) সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ২০৩০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে। এই সময়সীমা বাস্তবায়িত হলে ৩৫ বছর বয়সের পর আর কোনো নাগরিকের নতুন করে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আইনি সুযোগ থাকবে না।

মূলত আইন পেশার মর্যাদা ও দক্ষতা রক্ষা করা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি পেশা থেকে অবসরের পর দুর্নীতি বা অসদুপায়ের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের এই পেশায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা, আইনগত ও সাংবিধানিক বৈধতা কিংবা বিশ্বের অন্যান্য দেশের আইনজীবী নিয়োগব্যবস্থার তুলনামূলক প্রেক্ষাপট সুদীর্ঘ বিশ্লেষণের দাবি রাখে, যা এই লেখার মূল বিষয়বস্তু নয়।

এই লেখার প্রধান উপজীব্য হলো—জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা ল কলেজগুলোর দুই বছর মেয়াদি নৈশকালীন এলএলবি (পাস) কোর্সের বর্তমান আইনশিক্ষা ব্যবস্থার চরম তামাশা, অসারতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দ্বিচারিতা।

সুপ্রিম কোর্টের রায়: দুই বছরের এলএলবি কোর্স নিয়ে নির্দেশনা

২০১৭ সালে ‘বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বনাম এ কে এম ফজলুল করিম’ [14 ADC (2017) 271] মামলায় বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আইনশিক্ষা বিষয়ে এক ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। সেই রায়ের মাধ্যমে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুই বছর মেয়াদি এলএলবি (পাস) কোর্স পরিচালনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং আইন পেশায় প্রবেশের জন্য চার বছর মেয়াদি সমন্বিত এলএলবি (অনার্স) ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হয়।

শুধু তাই নয়, মামলার রায়ে স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল যে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা দুই বছর মেয়াদি এলএলবি ডিগ্রিকেও পর্যায়ক্রমে চার বছরে রূপান্তর করতে হবে এবং ভর্তির ক্ষেত্রে বার কাউন্সিলের কাছ থেকে আগাম ছাড়পত্র (ক্লিয়ারেন্স) নিতে হবে। আদালতের নির্দেশনায় সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছিল, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুই বছর মেয়াদি এলএলবি প্রোগ্রামটি সর্বোচ্চ ২০২০ সাল পর্যন্ত চালানো যাবে।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে এই রায় সরকার ও ইউজিসি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ল কলেজগুলোর জন্য তা আজও আলোর মুখ দেখেনি।

ফলে দেশে এক অদ্ভুত ও বৈষম্যমূলক আইনশিক্ষানীতি দৃশ্যমান—বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছরের এলএলবি ডিগ্রি নিষিদ্ধ হলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা নৈশ ল কলেজগুলোতে এই কোর্স দেদারসে বহাল আছে, যেখানে যেকোনো বয়সে এই ডিগ্রি নেওয়া যাচ্ছে।

এই ব্যবস্থা কেবল স্পষ্ট বৈষম্যমূলকই নয়, বরং আদালতের সরাসরি নির্দেশনার বরখেলাপ এবং দেশের সামগ্রিক আইনশিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে চরম সাংঘর্ষিক।

একই ডিগ্রি, ভিন্ন নিয়ম: রহস্যটা কোথায়?

প্রশ্ন হচ্ছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছর মেয়াদি এলএলবি ডিগ্রি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ল কলেজগুলোতে একই ডিগ্রি জারি রাখার অন্তর্নিহিত ‘মাজেজা’ বা রহস্যটা কী?

দুই বছরের সংক্ষিপ্ত ডিগ্রি নিয়ে আইনজীবী হওয়া যদি আইন পেশার মান ও আভিজাত্যের অবনমনের কারণ হয়ে থাকে, তবে তো সেই ডিগ্রির সুযোগ সবখানেই বন্ধ হওয়ার কথা!

আর ইস্যুটা যদি হয় ল কলেজ বনাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক মানের প্রশ্ন, তবে প্রশ্ন জাগে—জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা এসব সান্ধ্যকালীন ল কলেজে প্রদত্ত দুই বছরের এলএলবি ডিগ্রি কোন শিক্ষাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ডে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে উত্তম?

একটা সময় পর্যন্ত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ল কলেজে দুই বছরের আইনের ডিগ্রি নিয়ে আইনজীবী হওয়ার একটি ঐতিহাসিক উপযোগিতা নিশ্চিতভাবেই ছিল, যখন গুটিকয়েক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া দেশে আইনশিক্ষার আর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা ছিল না।

‘বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২’ যখন প্রণীত হয়, তখন দেশে মাত্র দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশিক্ষা চালু ছিল—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এমনকি ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও দুই বছর মেয়াদি সান্ধ্যকালীন এলএলবি প্রোগ্রাম ছিল, যা পরবর্তীতে ১৯৭৭-৭৮ শিক্ষাবর্ষে এসে চার বছর মেয়াদি এলএলবি (অনার্স) ডিগ্রিতে রূপান্তরিত হয়।

অন্যদিকে, ১৯৯২ সালের আগে এ দেশে কোনো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু আজ সময় বদলেছে; দেশে এখন অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাই ১১৫টি এবং দেশের অধিকাংশ পাবলিক ও প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে অত্যন্ত আধুনিক আইনশিক্ষা চালু রয়েছে।

বর্তমানে বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ চার বছর মেয়াদি অনার্সে শিক্ষার্থীদের জায়গা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। দেশের জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোতে প্রতি বছর আইনের চার বছরের অনার্স ডিগ্রিধারী প্রচুর মেধাবী ও নবীন আইনজীবী যুক্ত হচ্ছেন, যেখানে কোর্টগুলোতে এখন এই অনার্স ডিগ্রিধারী আইনজীবীদের বসার স্থান সংকুলান করাই মুশকিল হয়ে পড়েছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন বিভাগ: দ্বিচারিতার আরেক উদাহরণ

এই পুরো পরিস্থিতির সবচেয়ে নাটকীয় ও প্রহসনের বিষয় হলো, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই ২০২৩ সালে আইন ও বিধি ভেঙে গাজীপুরের মূল ক্যাম্পাসে সরাসরি আইন বিভাগ খুলে নিয়মিত চার বছর মেয়াদি এলএলবি (অনার্স) প্রোগ্রাম চালু করেছে!

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যখন আইন অমান্য করে নিজস্ব ক্যাম্পাসে এই ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) তাৎক্ষণিকভাবে এর তীব্র বিরোধিতা করে।

ইউজিসির স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, ১৯৯২ সালের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী এটি একটি ‘অ্যাফিলিয়েটিং’ বা কলেজ তদারকিকারী বিশ্ববিদ্যালয়, কোনো সরাসরি পাঠদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়। ফলে ইউজিসি এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইনি ছাড়পত্র ও অনুমোদন ছাড়া এই অন-ক্যাম্পাস আইন বিভাগ চালু করা সম্পূর্ণ এখতিয়ারবহির্ভূত ও বেআইনি।

এই বিরোধের জেরে ২০২৪ সালে বিষয়টি দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত গড়ায় এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতির (চ্যান্সেলর) আদেশক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি চূড়ান্ত পরিপত্র জারি করে এই অন-ক্যাম্পাস অনার্স প্রোগ্রামটিকে সম্পূর্ণ ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে তা চিরতরে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।

তবে এই কঠোর প্রশাসনিক নির্দেশনার পরেও আজ, ২০২৬ সাল পর্যন্ত, এই বিতর্কিত আইন বিভাগটি বন্ধ করা যায়নি। আদালতের স্থগিতাদেশ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৪১(১) ধারার নিজস্ব ব্যাখ্যাকে পুঁজি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম ও ক্লাস যথারীতি সচল রেখেছে।

এটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশিক্ষায় তামাশা ও দ্বিচারিতার একটি টেক্সটবুক উদাহরণ। কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছে হয়—‘এমন ইউনিভার্সিটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ যেখানে ছিল তাদের অধীনে থাকা শত শত ল কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়ন করা এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সেগুলোকে চার বছরের অনার্সে রূপান্তর করা, সেখানে তারা সেই মূল দায়িত্ব পুরোপুরি এড়িয়ে গেছে। অথচ নিজেরা আইন লঙ্ঘন করে মূল ক্যাম্পাসে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের চার বছরের এলএলবি (অনার্স) ডিগ্রি দিচ্ছে, আর দেশজুড়ে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা নৈশকালীন ল কলেজগুলোতে দুই বছরের ‘ডিগ্রির তামাশা’ ও সনদ বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার প্রকাশ্য সুযোগ করে দিচ্ছে।

আইনশিক্ষার মান নিশ্চিত করতে বার কাউন্সিলের দায়িত্ব

এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। ১৯৭২ সালের বার কাউন্সিল অর্ডার অনুযায়ী গঠিত এই সংস্থাটিই অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তি এবং লিগ্যাল প্র্যাকটিশনারদের আচরণ, শৃঙ্খলা ও আইন পেশার মান নিয়ন্ত্রণে একমাত্র বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান।

গুণগত আইনশিক্ষা নিশ্চিত করা বার কাউন্সিলের অন্যতম প্রধান ম্যান্ডেট, কারণ আইনশিক্ষার মানের ওপরই একজন প্র্যাকটিশনারের মান নির্ভর করে।

এই আইনের Section 10(i) অনুযায়ী আইনশিক্ষার মানোন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে পরামর্শক্রমে শিক্ষার মান নির্ধারণ করা বার কাউন্সিলের আইনি দায়িত্ব।

একইভাবে Section 40(2)(t) অনুযায়ী বার কাউন্সিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কর্তৃক অনুসরণযোগ্য আইনশিক্ষার মান নির্ধারণ এবং এই উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের জন্য বিধি প্রণয়ন করতে পারে। এমনকি আইনের Section 11 অনুযায়ী গঠিত ‘লিগ্যাল এডুকেশন কমিটি’র ৯ জন সদস্যের মধ্যে ন্যূনতম দুইজন বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের আইনশিক্ষক হওয়ার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে।

গুণগত আইনশিক্ষার এই অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করেই বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ২ নভেম্বর ১৯৯৮ তারিখে ‘লিগ্যাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট’ (LETI) প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যাতে নতুন তালিকাভুক্ত আইনজীবীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় এবং তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক আইনশিক্ষার ব্যবধান কমে আসে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বর্তমানে সেই মহৎ ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

আইনশিক্ষায় দ্বিচারিতার অবসান কবে?

পরিশেষে বলতে হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা সমস্ত আইন কলেজে অভিন্নভাবে চার বছর মেয়াদি এলএলবি (অনার্স) ডিগ্রি চালু করা হোক, নতুবা এই দুই বছরের এলএলবি ডিগ্রি নামের প্রহসনটি চিরতরে বন্ধ করা হোক।

বাংলাদেশে আইনজীবী, বিচারক কিংবা আইনের পেশাজীবী হওয়ার একমাত্র অ্যাকাডেমিক কোয়ালিফিকেশন হওয়া উচিত চার বছর মেয়াদি এলএলবি (অনার্স) ডিগ্রি। কেউ ভবিষ্যতে কেমন ‘প্র্যাকটিশনার’ হবেন, সেটির ভিত্তিপ্রস্তর নির্ধারণ করে দেয় তাঁর আইনশিক্ষা এবং আইনশিক্ষকের মান। তাই গোড়ায় গলদ রেখে শুধু আইনজীবী হওয়ার সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা কখনোই অসুখ সারানোর আসল ক্যাপসুল হবে না।

‘যার নাই কোনো গতি, সে করে ওকালতি’—আইন পেশাকে খাটো করার এই ঔপনিবেশিক ও অবমাননাকর ধারণাকে পরিপুষ্ট করার উপরোক্ত প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন ভণ্ডুল করার সময় এখনই।

লেখক: সাঈদ আহসান খালিদ, শিক্ষক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।