মীর হালিম : আইনের শাসনে পরিচালিত যেকোনো সাংবিধানিক গণতন্ত্রে দ্রুত বিচার পাওয়া কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিলাসিতা নয়—বরং এটি একটি মৌলিক অধিকার। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আইনের সুরক্ষা লাভ, জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার নিরাপত্তার যে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যেই নিহিত রয়েছে দ্রুত, সুষ্ঠু ও কার্যকর বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার।
অথচ, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা বর্তমানে পাহাড়সম মামলাজটে জর্জরিত। গত ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের দেওয়া তথ্যমতে, দেশে বিচারাধীন মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬,৩৯,৪৭৬টিতে। এর মধ্যে কেবল সুপ্রিম কোর্টেই বিচারাধীন ৫,৬১,০৪৪টি মামলা (আপিল বিভাগে ৩৮,৭১৩টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৫,২২,৩৩১টি) এবং অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন রয়েছে ৪০,৭৮,৪৩২টি মামলা। এই মানবিক ও প্রশাসনিক সংকটের মধ্যেও বিচারব্যবস্থার গতি আটকে আছে আদালতের সেকেলে বিচারিক ক্যালেন্ডারের ফ্রেমে। এই বিচারিক স্থবিরতা কাটাতে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আমাদের নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে একটি কার্যকর ও উদ্ভাবনী সমাধান খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।
বছরের প্রায় অর্ধেকটা সময় সুপ্রিম কোর্টের এজলাসগুলো একপ্রকার নীরব থাকে। নিয়মিত সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির বাইরেও সুপ্রিম কোর্ট দীর্ঘকালীন বিশেষ অবকাশ পালন করে। সমাজে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বা মামলা দায়েরের গতি একদিনের জন্যও থেমে না থাকলেও সাংবিধানিক ও আইনি প্রতিকার পাওয়ার প্রধান দরজাটি বারবার বন্ধ হয়ে যায়। তাই আদালতের এই ছুটির পঞ্জিকা সংস্কারের বিষয়টিকে আর সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি সময়োপযোগী বিচার নিশ্চিত করার এক জরুরি জাতীয় অগ্রাধিকার।
২০২৬ সালের সুপ্রিম কোর্টের ছুটির পঞ্জিকা বিশ্লেষণ
২০২৬ সালের বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের দাপ্তরিক পঞ্জিকা বিশ্লেষণ করলে বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ থাকার এক বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে। বছরে মোট ৩৬৫ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট পূর্ণাঙ্গভাবে খোলা থাকে আনুমানিক ১৮০ দিন (ছয় মাস) এবং বন্ধ থাকে প্রায় ১৮৫ দিন (ছয় মাসেরও বেশি)। এই বন্ধের মধ্যে রয়েছে ১০৪ দিনের সাপ্তাহিক ছুটি (শুক্রবার ও শনিবার), জাতীয় সরকারি ছুটি এবং হাইকোর্ট বিভাগ রুলস ১৯৭৩ ও আপিল বিভাগ রুলস ১৯৮৮-এর অধীনে ঘোষিত ৬১ দিনের বিশেষ ‘অবকাশকালীন ছুটি’ (যা ক্যালেন্ডারে নীল রঙে চিহ্নিত এবং বছরভেদে ৬০ থেকে ৭০ দিন পর্যন্ত হয়ে থাকে)।
এর সঙ্গে দায়িত্বে থাকা বা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবং প্রখ্যাত আইনজীবীদের প্রয়াণে প্রথাগত ও অনানুষ্ঠানিক আদালত মুলতবির দিনগুলো যুক্ত করলে দেখা যায়, সুপ্রিম কোর্ট সচল থাকে বছরের অর্ধেক সময়েরও কম। যেখানে সাধারণ সরকারি দপ্তরগুলোতে বছরে ছুটি থাকে আনুমানিক ১১৫ থেকে ১২০ দিন, সেখানে সুপ্রিম কোর্ট সক্রিয় থাকে মাত্র ১৮০ দিনের মতো। এই স্বল্প সময়ে ৫,৬১,০৪৪টি বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তির চেষ্টা করা গাণিতিকভাবেই অসম্ভব, যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে বিদ্যমান ছুটির কাঠামো কীভাবে মামলাজট বাড়াতে সাহায্য করছে।
অধস্তন আদালত: দেওয়ানি আদালতে জুন-ডিসেম্বরের অচলাবস্থা
উচ্চ আদালত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের প্রাথমিক কেন্দ্র—অধস্তন আদালতে ছুটির এই সংকট আরও বেশি প্রকট। দেশের দেওয়ানি আদালতগুলোতে ঐতিহ্যগতভাবেই পুরো ডিসেম্বর মাসজুড়ে বিচারিক অবকাশ পালন করা হয়ে থাকে। যদিও ২০২৫ সালে এতে কিছুটা সমন্বয় এনে এই এক মাসের ছুটি ভেঙে জুনে ১৫ দিন এবং ডিসেম্বরে ১৫ দিন করা হয়েছে, তবুও দিনশেষে দেওয়ানি আদালতগুলো বছরে সেই পূর্ণ এক মাসের ছুটির প্রভাবই বহন করছে। সহজ কথায়, এটি প্রবাদের মতো ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ’ পরিবেশনের মতোই রয়ে গেছে।
১৮৮৭ সালের দেওয়ানি আদালত আইনের ১৫ ধারার অধীনে জারি করা গেজেট প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে নিম্ন দেওয়ানি আদালতগুলো এই ছুটির দিনগুলোতে নিয়মিত বিচার, সাক্ষ্যগ্রহণ ও রায় ঘোষণা স্থগিত রাখে। এই প্রশাসনিক স্থবিরতার কারণে দেশজুড়ে জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক ও উত্তরাধিকার মামলা এবং বাণিজ্যিক বিষয়গুলোর বিচার থমকে যায়। কেবল নিম্ন আদালতেই যেখানে প্রায় ১৮ লাখ দেওয়ানি মামলা জমে আছে, সেখানে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিচারকাজ বন্ধ রাখা সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে এক বড় বাধা।
৫৪ বছরের হিসাব: বিচারিক কাজের ১৩ বছরের নীরবতা
স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫৪ বছরে অতিরিক্ত বিচারিক ছুটির পুঞ্জীভূত ক্ষতি গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করলে এক আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে ওঠে। সাধারণ ছুটির বাইরেও সুপ্রিম কোর্ট গড়ে বছরে ৬০ দিন অতিরিক্ত অবকাশ পালন করায় গত সাড়ে পাঁচ দশকে মোট ৩,২৪০টি সম্ভাব্য কর্মদিবস হারিয়ে গেছে—যা প্রায় ৮ বছর ৯ মাসের পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক বন্ধের সমতুল্য। একইভাবে, প্রতি বছর সংবিধিবদ্ধ ছুটির মাধ্যমে অধস্তন দেওয়ানি আদালতগুলো বন্ধ থাকায় আরও ৫৪ মাস বা ৪.৪ বছর বিচারিক কাজ স্থগিত ছিল। সব মিলিয়ে, ১৯৭১ সালের পর থেকে দেশের পুরো বিচার বিভাগ ১৩ বছরেরও বেশি সময় অকার্যকর অবস্থায় কাটিয়েছে। একটি আধুনিক ও নিরবচ্ছিন্ন ক্যালেন্ডার থাকলে এই হারিয়ে যাওয়া সময়টুকু বাঁচানো যেত এবং দেশের মামলাজটও বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্যে স্থবির থাকা কোনো বিচারিক ক্যালেন্ডার একটি আধুনিক গণতন্ত্রের চাহিদা মেটাতে পারে না। এখনো প্রতি বছর ছয় মাসেরও বেশি সময় যখন আদালত বন্ধ থাকে, যেখানে লাখ লাখ মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় প্রহর গুনতে গুনতে বুড়িয়ে যায়, সেখানে এই লম্বা লম্বা অবকাশকে কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না; বরং তা সামগ্রিক বুদ্ধির জড়তা বা প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের শামিল। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার সংরক্ষণ, সাংবিধানিক অধিকার বাস্তবায়ন ও মামলাজট কমাতে হলে বাংলাদেশে ১৪০ বছরের পুরোনো এই ঢালাও ছুটির খাঁচা থেকে বেরিয়ে এসে, জনস্বার্থে, একটি সৃজনশীল, নিরবচ্ছিন্ন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা শুধু সময়ের দাবি নয়, অপরিহার্যও বটে। ‘দাদার আমলে দায়ের করা মামলা নিয়ে নাতিদের লড়াই করার সংস্কৃতি’র এই উদাসীনতা কেবল আদালতের ব্যর্থতা হিসেবেই থাকবে না, এটি হবে এক সময়-সচেতনতাহীন জাতির নীরব ট্র্যাজেডি।
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আইনি নজির
আদালতের এই দীর্ঘ ছুটি কেবল প্রশাসনিক বিলম্বই সৃষ্টি করে না, বরং এটি সরাসরি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে উচ্চ আদালত পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, বিচারে অযৌক্তিক বিলম্ব সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের অধীন ‘যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া’র মূল ভাবনাকে আঘাত করে। জামিন বেঞ্চ বা বিচারিক আদালত ছুটিতে থাকার কারণে যখন বিচারাধীন বন্দিরা বছরের পর বছর কারারুদ্ধ থাকেন, তখন সময়মতো বিচারিক সিদ্ধান্ত না পাওয়ার কারণে ৩২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়।
বাস্তব চিত্র হলো, একজন বিচারপতি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বছরে শত শত মামলা নিষ্পত্তি করলেও নতুন মামলা দায়েরের হার নিষ্পত্তির হারকে ছাপিয়ে যায়। ছুটির মাসগুলো একটি কৃত্রিম বাঁধের মতো কাজ করে—আদালত খোলার সঙ্গে সঙ্গে নতুন মামলার ঢল নামে, যা আবার বিচারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং মামলার স্বাভাবিক গতি বিনষ্ট করে।
অধিকন্তু, আইনবিজ্ঞানে স্বীকৃত ‘বিলম্বে বিচার কার্যত বিচারহীনতারই শামিল।’ বাংলাদেশ আইন কমিশন বারবার উল্লেখ করেছে যে, আমাদের দেশে জনসংখ্যা ও বিচারকের অনুপাত বিশ্বে সর্বনিম্নদের একটি—প্রতি দশ লাখ মানুষের জন্য মাত্র ১২ জনেরও কম। এই অপ্রতুল বিচারকসংখ্যার সঙ্গে যখন আদালতের কর্মদিবস বছরে মাত্র ১৮০ দিনে সীমিত রাখা হয়, তখন মামলাজট নিরসন করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আদালত বন্ধের মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
বছরে প্রায় ছয় মাস আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ থাকার মাশুল গুনতে হয় পুরো সমাজকে:
• বিচারপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে: জামিনের আশায় অপেক্ষারত বিচারাধীন বন্দি কিংবা জরুরি রিট আবেদনের মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়া সাধারণ মানুষ পড়ে যান চরম অনিশ্চয়তায়। এতে যেমন তাঁদের মৌলিক অধিকার ব্যাহত হয়, তেমনই বাড়ে মানসিক চাপ ও আর্থিক ক্ষতি।
• আইনি অঙ্গনের ক্ষেত্রে: অভিজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা এই দীর্ঘ অবকাশ সহজেই সামলে নিতে পারেন; কিন্তু নবীন আইনজীবী, স্বাধীন চর্চারত তরুণ পেশাজীবী এবং আদালত-সংশ্লিষ্ট ক্লার্ক, ব্যবসায়ী বা মুহুরিরা মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েন। একই সঙ্গে তরুণ আইনজীবীদের পেশাগত ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় এবং বিচারপ্রার্থীরাও চলমান মামলার গতি হারিয়ে ফেলেন।
ঔপনিবেশিক অতীত ও তুলনামূলক চিত্র
আদালতের এই দীর্ঘ ছুটির ইতিহাস মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের সঙ্গে জড়িত। ব্রিটিশ শাসনামলে যেসব ইউরোপীয় বিচারপতি এখানে দায়িত্ব পালন করতেন, তাঁরা যেন এ অঞ্চলের বর্ষার অতিবৃষ্টি বা গ্রীষ্মের চরম দাবদাহ থেকে রক্ষা পান এবং জাহাজে করে নিজ দেশে যাতায়াত করতে পারেন, সেজন্য এই দীর্ঘ অবকাশের প্রথা বাস্তবিক প্রয়োজনেই চালু করা হয়েছিল।
প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় যে এই ছুটির সংস্কার সম্ভব এবং কার্যকর। বাংলাদেশ যখন ১৮৮৭ সালের দেওয়ানি আদালত আইন ও পুরোনো রুলসের ওপর নির্ভর করে পুরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখছে, তখন অন্য দেশগুলো সামনে এগিয়ে গেছে।
ভারতে জাস্টিস মালিমাথ কমিটি (২০০০-২০০৩) মামলাজট কমাতে বার্ষিক ছুটি অন্তত ৩ সপ্তাহ কমানোর সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করে। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তাদের গ্রীষ্মকালীন ছুটি ১০ সপ্তাহ থেকে কমিয়ে ৭ সপ্তাহে নিয়ে আসে এবং অবকাশকালীন বেঞ্চের পরিসর বাড়ায়। আরও এক ধাপ এগিয়ে, পাকিস্তানে ২০০২ সাল থেকে ধারাবাহিক বিচারনীতির মাধ্যমে রোটেশনাল ছুটি এবং নিরবচ্ছিন্ন শুনানি কাঠামো চালু করে বছরজুড়ে আদালত সচল রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ইতিহাস ও অতীতের সংস্কার উদ্যোগ
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ইস্ট বেঙ্গল হাইকোর্ট মূলত ক্যালকাটা হাইকোর্টের রুলস অনুসরণ করত। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে এক ফুল কোর্ট মিটিংয়ে তৎকালীন ঢাকা হাইকোর্ট নিজস্ব রুলস গ্রহণ করে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১০৭ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে সুপ্রিম কোর্ট নিজেদের রুলস তৈরির ক্ষমতা পায়, যার ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ ও ১৯৫৮ সালের রুলসের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ রুলস ১৯৭৩ এবং আপিল বিভাগ রুলস ১৯৮৮ প্রণীত হয়।
দীর্ঘদিন ধরে বিধিগুলো অপরিবর্তিত থাকার পর ২০১২ সালে কেবল হাইকোর্ট বিভাগে এফিডেভিটের সময়সীমায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয় (যেমন রিটের ক্ষেত্রে ৩০ দিন এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি আবেদনের জন্য ৪৫ দিন)। তবে আপিল বিভাগে পুরোনো প্রথাই বহাল রাখা হয়। এই পরিবর্তনটি বিচারকাজ দ্রুত করার উদ্দেশ্যে করা হলেও, মূল সংস্কার না করে কেবল এমন নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়ায় তা জটিলতা বাড়িয়েছে বলে আইনজ্ঞদের কাছে সমালোচিত হয়েছে।
তবে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের নজিরও আমাদের আছে। ২০২০ সালের আগস্টে, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে একটানা ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটির পর মামলাজট সামলাতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের ফুল কোর্ট মিটিংয়ে ওই বছরের সব দীর্ঘ অবকাশ বাতিল করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এটি প্রমাণ করে যে, জনস্বার্থে প্রয়োজন হলে ফুল কোর্ট নিজেদের প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বিচারিক বর্ষপঞ্জি পরিবর্তন করতে পারে।
একইভাবে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টের ফুল কোর্ট মিটিংয়ে অধস্তন দেওয়ানি আদালতের মাসব্যাপী ছুটি দুই ধাপে (১-১৫ জুন এবং ১৭-৩১ ডিসেম্বর) বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যদিও এসব পদক্ষেপ সমস্যাটি অনুধাবনের পরিচয় দেয়, তবুও নাগরিক সমাজ, আইন কমিশন ও গবেষকেরা বারবার তাগিদ দিয়েছেন যে, এসব সাময়িক সমন্বয় কেবল অন্তর্বর্তী সমাধান। বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন ছুটির ব্যবস্থার এক চিরস্থায়ী ও কাঠামোগত পরিবর্তন।
আইনজীবী সমিতির নীরবতা ও অ্যাটর্নি জেনারেলের আহ্বান
জনমনে এ নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ থাকলেও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন আইনজীবী সমিতির নেতৃত্বের মধ্যে এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের নীরবতা লক্ষ্য করা গেছে। বছরের পর বছর ধরে সমিতিগুলোর নেতারা প্রথাগত অভ্যাসকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন, যার ফলে একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষিত রয়ে গেছে। এই প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার কারণেই বিচারপ্রার্থীর প্রয়োজন ও আদালতের সক্রিয়তার মধ্যকার ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে।
তবে এই দীর্ঘ ছুটির সংস্কৃতি নিয়ে আইনি অঙ্গনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও জোরালো সমালোচনা এসেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের বিদগ্ধ আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সম্পাদক, বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতের এই দীর্ঘ ছুটির পদ্ধতির কঠোর সমালোচনা করে একে বিচারিক গতিশীলতা ও জনগণের বিচার পাওয়ার পথের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সাধারণ সরকারি ছুটির সঙ্গে দীর্ঘ অবকাশ যুক্ত হয়ে বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় আদালত বন্ধ থাকে। বিচারকেরা ছুটির সময়ে রায় লেখেন—এই পুরোনো যুক্তিকে খণ্ডন করে তিনি জানান, বাস্তবে অনেক সময় ছুটির পুরো মাসে একজন বিচারকের একটি রায়ও লেখা হয়ে ওঠে না। এই জায়গা থেকে সরে এসে মামলাজট নিরসনে অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ ছুটি ও অবকাশ পুনর্মূল্যায়ন করতে তিনি মাননীয় প্রধান বিচারপতির প্রতি আহ্বান জানান।
সময়োপযোগী আধুনিকায়ন: একটি কৌশলগত রূপরেখা
সুপ্রিম কোর্টের ছুটির সময়সূচি সংস্কারের অর্থ বিচারকদের বিশ্রাম কেড়ে নেওয়া নয়; বরং পুরো প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে বন্ধ না রেখে বছরজুড়ে আদালত চালু রাখার একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করা। এই পদক্ষেপগুলো এককভাবে বা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে:
১. সংবিধিবদ্ধ আইন ও বিচারিক বিধিমালার আধুনিকায়ন:
দেওয়ানি আদালত আইন ১৮৮৭, দেওয়ানি কার্যবিধি (CPC) এবং ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) মতো মূল আইনি কাঠামোগুলো সংস্কার করে অযথা মামলা দীর্ঘায়িত করার সুযোগ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের ১৯৭৩ ও ১৯৮৮ সালের রুলস পরিমার্জন করে অপ্রয়োজনীয় অবকাশ ও প্রথাগত ছুটি কমিয়ে এনে বিচারপ্রক্রিয়াকে আধুনিক করতে হবে। একই সঙ্গে ২০২১ সালের বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক (পারিতোষিক ও বিশেষাধিকার) আইন এবং ২০২৩ সালের সুপ্রিম কোর্টের বিচারক (ছুটি, পেনশন ও বিশেষাধিকার) আইনেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সমন্বয় করতে হবে।
২. বিচারকের সংখ্যা ও গবেষণা কর্মকর্তা বৃদ্ধি:
হাইকোর্ট বিভাগে (বর্তমানে মাত্র ১০৮ জন) এবং আপিল বিভাগে (বর্তমানে মাত্র ৫ জন) বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি নিম্ন আদালতেও পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। অতি সম্প্রতি আপিল বিভাগের বিচারকদের গবেষণাকাজে সহায়তার জন্য অধস্তন আদালতের বিচারকদের মধ্য থেকে প্রেষণে ‘রিসার্চ অ্যান্ড রেফারেন্স অফিসার’ নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগটি ব্যাপক সফল হয়েছে। এই মডেলটি হাইকোর্ট বিভাগেও চালু করলে রায় লেখা ও মামলা নিষ্পত্তির গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশনার খবর প্রকাশিত হয়েছে, যা সফল হলে এ বিষয়ে আরও একটা অগ্রগতির সম্ভাবনা রয়েছে।
৩. বস্তুনিষ্ঠ বেঞ্চ গঠন ও ধারাবাহিকতা রক্ষা:
সংবিধানের ১০৭(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ গঠনের এখতিয়ারকে মূলত কাজের গতি বাড়ানো ও বিশেষায়িত দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে ব্যবহার করা যেতে পারে। বছরে ঘন ঘন বেঞ্চ পুনর্গঠন বা বিচারক পরিবর্তনের কারণে বিচারপ্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং শুনানি বিলম্বিত হয়। এই চর্চা পরিবর্তন করে নির্দিষ্ট বেঞ্চে নির্দিষ্ট বিষয়াদির শুনানির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে অধিকতর জনস্বার্থ রক্ষা হবে বলে মনে হয়।
৪. অবকাশকালীন বেঞ্চের এখতিয়ার বৃদ্ধি:
সাময়িকভাবে বা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যদি অবকাশ প্রথা রাখতেই হয়, তবে অবকাশকালীন বেঞ্চের পরিধি কেবল জরুরি জামিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত রিট, ডেথ রেফারেন্স, দেওয়ানি স্থগিতাদেশ ও বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ দিলে কিছুটা দুঃখ লাঘব হবে।
৫. ঘূর্ণায়মান ছুটি বা রোটেশনাল সিটিং:
পুরো আদালতকে একসঙ্গে বন্ধ রাখার প্রথা বাতিল করে বিচারকদের জন্য ব্যক্তিভিত্তিক ‘অর্জিত ছুটি’র নিয়ম চালু করতে হবে। এতে বিচারকেরা সারা বছর পর্যায়ক্রমে ছুটি ভোগ করবেন, আর আদালত ৩৬৫ দিনই বিচারপ্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
৬. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার:
রায় লেখা ও আইনি গবেষণার চাপ কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও এআই-চালিত গবেষণা টুলস ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ই-ফাইলিং এবং ভার্চুয়াল শুনানির সুবিধা বছরজুড়ে চালু রাখলে প্রশাসনিক কাজ কখনো থমকে থাকবে না।
৭. প্রাক্-বিচার বা প্রি-ট্রায়াল কেস ম্যানেজমেন্ট:
আইনে স্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে, যাতে প্রারম্ভিক আইনি প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত শেষ হয়। বিচার শুরুর আগেই নির্দিষ্ট সময়সূচি বেঁধে দেওয়ার নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যাতে বারবার সময় আবেদনের সুযোগ না থাকে।
৮. বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) বাধ্যতামূলক করা:
দেওয়ানি ও বাণিজ্যিক বিরোধের ক্ষেত্রে আদালতে মূল বিচার শুরুর আগেই বিকল্প উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) উদ্যোগ বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিরোধগুলো আদালতের বাইরেই নিষ্পত্তি হবে এবং বিচারকদের ওপর চাপ কমবে।
৯. বিচারিক জবাবদিহিতা ও ডেটা ট্র্যাকিং:
রেজিস্ট্রার জেনারেল অফিসের অধীনে একটি অটোমেটেড ‘জুডিশিয়াল পারফরম্যান্স ইনডেক্স’ চালু করে মামলা নিষ্পত্তির হার ও বয়সভিত্তিক ডেটা পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যেন কোথায় ধীরগতি হচ্ছে তা ধরে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
১০. নিরবচ্ছিন্ন শুনানি ও অযথা সময় আবেদনে জরিমানা:
একবার চূড়ান্ত শুনানি শুরু হলে তা টানা বা প্রতিদিন চালিয়ে যাওয়ার নিয়ম কঠোরভাবে মানতে হবে। অযথা বিচার বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে সময় আবেদন করলে পক্ষ বা আইনজীবীর ওপর বাধ্যতামূলক অর্থদণ্ড বা কস্ট আরোপের বিধান নিশ্চিত করতে হবে।
সংস্কারের এক ঐতিহাসিক সুযোগ
স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে আংশিক কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুরো বছরজুড়ে আদালত চালু রাখার মতো একটি সমন্বিত বিচারিক ক্যালেন্ডার এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। বর্তমান সরকার ও বিচার বিভাগের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি এই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তবে তা হবে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এক যুগান্তকারী অর্জন।
আমাদের সংস্কৃতি ও আধুনিক রাষ্ট্রের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিচারিক ক্যালেন্ডারকে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। সেকেলে রেওয়াজ পেছনে ফেলে নিরবচ্ছিন্ন বিচারিক সেবা নিশ্চিত করতে পারলে আদালতের মর্যাদা যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলের ওপর আস্থাও সুদৃঢ় হবে। সংস্কারের বীজ রোপণ করার সময় এখনই।
আমরা যদি এখনই সচেষ্ট না হই, তবে ‘দাদার আমলে দায়ের করা মামলা নিয়ে নাতিদের লড়াই করার সংস্কৃতি’র এই উদাসীনতা কেবল আদালতের ব্যর্থতা হিসেবেই থাকবে না, এটি হবে এক সময়-সচেতনতাহীন জাতির নীরব ট্র্যাজেডি।
লেখক: অ্যাডভোকেট মীর হালিম, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) ও পাবলিক পলিসি অ্যানালিস্ট।

