সরকার ও চার পত্রিকাকে এস আলম গ্রুপের আইনি নোটিশ
আইনি নোটিশ

মাদ্রাসা শিক্ষাক্রমে ব্যবসা, প্রোগ্রামিং ও স্পোকেন ভাষা চালুর দাবিতে আইনি নোটিশ

৩০ দিনের মধ্যে নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্তি ও অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম চালুর অনুরোধ

মাদ্রাসার প্রচলিত ধর্মীয় শিক্ষাক্রম অক্ষুণ্ণ রেখে প্রতিটি স্তরে ‘ইসলামিক বিজনেস ও অ্যাকাউন্টিং’, ‘কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ও প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ’ এবং ব্যবহারিক ‘আরবি ও ইংরেজি স্পোকেন’ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর ২০২৬) জনস্বার্থে এ নোটিশ পাঠান বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন।

নোটিশটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আইসিটি বিভাগের সচিব, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়েছে।

ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক দক্ষতা অর্জনের দাবি

আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পর্যায়ে লাখ লাখ শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছেন। নোটিশদাতার দাবি, মাদ্রাসার প্রচলিত ধর্মীয় সিলেবাস বা ইসলামি শিক্ষার প্রতি তাঁর কোনো আপত্তি নেই। শিক্ষার্থীরা তাঁদের ধর্মীয় পড়াশোনা স্বাভাবিকভাবেই চালিয়ে যাবেন। তবে বর্তমান শিক্ষাক্রমে আধুনিক ও প্রায়োগিক বিষয়ের ঘাটতির কারণে বিপুলসংখ্যক মাদ্রাসাশিক্ষার্থী মূলধারার করপোরেট, বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

নোটিশে বলা হয়, ইসলাম সততাভিত্তিক হালাল ব্যবসা-বাণিজ্য ও উদ্যোক্তা হওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে, বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অতিমুনাফালোভী সিন্ডিকেট, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুত এবং খাদ্যে ভেজাল মেশানোর মতো সমস্যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

নোটিশদাতার বক্তব্য অনুযায়ী, ইসলামি বাণিজ্যিক নীতিতে কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে খাদ্যশস্য মজুত, মাপে কম দেওয়া এবং পণ্যের ত্রুটি গোপন বা ভেজাল মেশানোকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় মাদ্রাসার প্রতিটি শ্রেণিতে ‘ইসলামিক বিজনেস ও অ্যাকাউন্টিং’ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, এ বিষয় অন্তর্ভুক্ত হলে শিক্ষার্থীরা আধুনিক বিপণন (Marketing), ব্যবসায় প্রশাসন (Management), মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা (HRM) এবং হিসাবরক্ষণ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন।

নোটিশে আরও বলা হয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক ব্যবসায়িক কৌশলের সমন্বয়ে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে উঠতে পারবেন। নোটিশদাতার প্রত্যাশা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পরকালের জবাবদিহিতার চেতনা তাঁদের ব্যবসায় সততা বজায় রাখতে এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, খাদ্য মজুত ও ভেজালের মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করবে। এর মাধ্যমে বাজারে অসাধু ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড কমানো এবং নৈতিকতাভিত্তিক অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

কম্পিউটার ও প্রোগ্রামিং শিক্ষার প্রস্তাব

নোটিশে তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান বাস্তবতায় মাদ্রাসার সব স্তরে কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন এবং আধুনিক সফটওয়্যার তৈরির বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ভাষা শেখানোর দাবি জানানো হয়েছে।

নোটিশদাতার মতে, এসব বিষয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত ও বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

আরবি ও ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা বাড়ানোর দাবি

নোটিশে ব্যবহারিক আরবি (Communicative Arabic) ও ইংরেজি (Communicative English) শেখানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এতে বলা হয়, মাদ্রাসার অনেক শিক্ষার্থী আরবি পড়তে পারলেও ব্যবহারিক ও পেশাগত ক্ষেত্রে অনর্গল কথা বলা এবং আধুনিক ব্যবসায়িক যোগাযোগে দক্ষতার অভাবে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের যোগ্যতা কাজে লাগাতে পারছেন না বলে নোটিশদাতা মনে করেন।

তাঁর প্রস্তাব, স্পোকেন আরবি ও ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভাষাগত ও পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক ও করপোরেট খাতে তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতেও তা ভূমিকা রাখতে পারে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব

প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাদ্রাসাগুলোতে বিশেষায়িত শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে আইনি নোটিশে।

এতে বলা হয়, দেশের প্রতিটি মাদ্রাসায় আলাদাভাবে বিশেষায়িত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সরকারের জন্য ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হতে পারে। এ কারণে আইসিটি বিভাগ, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দিয়ে তিনটি বিষয়ের মানসম্মত প্রি-রেকর্ডেড ভিডিও ক্লাস তৈরি করা যেতে পারে।

এসব ভিডিও ক্লাস একটি সরকারি ওয়েব পোর্টাল বা মোবাইল অ্যাপে উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্তের মাদ্রাসাশিক্ষার্থীরা বিনা মূল্যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাঠ গ্রহণ করতে পারবেন এবং কেন্দ্রীয়ভাবে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদ উল্লেখ

আইনি নোটিশে সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি সুযোগের সমতা নিশ্চিতে ১৯ অনুচ্ছেদ, আইনের দৃষ্টিতে সমতার জন্য ২৭ অনুচ্ছেদ, বৈষম্যহীনতার জন্য ২৮ অনুচ্ছেদ এবং আইনের আশ্রয়লাভের অধিকারের বিষয়ে ৩১ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করা হয়েছে।

নোটিশদাতার দাবি, লাখ লাখ মাদ্রাসাশিক্ষার্থীকে আধুনিক ও প্রায়োগিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখা এসব সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

৩০ দিনের সময়সীমা, অন্যথায় হাইকোর্টে রিটের হুঁশিয়ারি

আইনি নোটিশে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে মাদ্রাসার মূল ধর্মীয় সিলেবাস অপরিবর্তিত রেখে ইসলামিক বিজনেস ও অ্যাকাউন্টিং, কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ও প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ এবং আরবি ও ইংরেজি স্পোকেন বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে অনলাইন ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

নোটিশে আরও বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হলে মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষার দাবিতে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট পিটিশন (PIL) দায়ের করা হবে।