সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের প্রচলিত ‘মাই লর্ড’ সম্বোধনের পরিবর্তে ‘ইওর হাইনেস’ (Your Highness) অথবা অন্য কোনো সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারের নির্দেশনা চেয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী।
আবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসলামী আকিদা ও তাওহিদের বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিবেচনায় মুসলিম আইনজীবীদের বিচারপতিদের ‘মাই লর্ড’ সম্বোধন করতে বাধ্য না করে বিকল্প সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
গত ৫ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রধান বিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বরাবর আবেদনটি দাখিল করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে আবেদনটি উপস্থাপন করা হয়েছে।
আবেদনকারী আইনজীবী হলেন মো. মাহমুদুল হাসান (মামুন)। তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন নিয়মিত আইনজীবী। আবেদনের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে তাঁর পরিচয় ও পেশাগত তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদের উল্লেখ
আবেদনে সংবিধানের ৪১(১)(ক) অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন ও প্রচারের অধিকার রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস ও নৈতিক মূল্যবোধের স্বাধীনতা একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অংশ।
আবেদনকারীর বক্তব্য, একজন নিয়মিত প্র্যাকটিসরত মুসলিম আইনজীবী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস, আত্মমর্যাদা এবং সাংবিধানিক অধিকার সমুন্নত রাখাও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
আবেদনে ইসলামের মূল বিশ্বাস তাওহিদের প্রসঙ্গ তুলে বলা হয়েছে, পবিত্র কালিমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’-এর অর্থ হলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর প্রেরিত রাসুল। ইসলামী আকিদা ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সৃষ্টিজগতের একমাত্র স্রষ্টা ও প্রভু আল্লাহ। সে বিবেচনায় কোনো মানুষকে ‘লর্ড’ বা প্রভু হিসেবে সম্বোধন করার বিষয়টি আবেদনকারীর ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে এসেছে ‘মাই লর্ড’ সম্বোধন
আবেদনে বিচার বিভাগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রখ্যাত আইনবিদ ভি. ডি. কুলশ্রেষ্ঠের প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘ল্যান্ডমার্কস ইন ইন্ডিয়ান লিগ্যাল অ্যান্ড কনস্টিটিউশনাল হিস্ট্রির (সপ্তম সংস্করণ, পুনর্মুদ্রিত ২০০৪) ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতীয় উপমহাদেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে হিন্দু যুগ, মুসলিম যুগ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ শাসনামল এবং পাকিস্তান আমল গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আবেদনকারীর দাবি, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে বিচার বিভাগে ‘মাই লর্ড’ সম্বোধনের প্রচলন শুরু হয়। এটি উপমহাদেশের নিজস্ব বিচারিক ঐতিহ্যের অংশ নয়, বরং ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা থেকে আসা একটি রীতি।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্রিটিশ শাসনামলের প্রচলিত এই সম্বোধন স্বাধীন বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায়ও অনুসৃত হচ্ছে। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের ‘মাই লর্ড’ বলে সম্বোধন করা হয়। আবেদনকারীর মতে, এই সম্বোধনের আক্ষরিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য মুসলিম আইনজীবীদের বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
বিচারপতিদের সম্মান বজায় রেখেই বিকল্প সম্বোধনের দাবি
আবেদনে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারিক দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁরা সম্মান, মর্যাদা ও শ্রদ্ধার অধিকারী। বিচারপতিদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর কোনো আপত্তি নেই।
তবে বিচারপতিদের সম্মান ও মর্যাদা বজায় রাখার পাশাপাশি মুসলিম আইনজীবীদের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে ‘মাই লর্ড’-এর পরিবর্তে ‘ইওর হাইনেস’ (Your Highness) অথবা অন্য কোনো সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
প্রধান বিচারপতির কাছে যে আবেদন
আবেদনের শেষাংশে প্রধান বিচারপতির কাছে ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও নৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিশেষ করে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে প্র্যাকটিসরত মুসলিম আইনজীবীদের ক্ষেত্রে ‘মাই লর্ড’-এর পরিবর্তে ‘ইওর হাইনেস’ বা অন্য কোনো সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারের বিষয়ে একটি সমন্বিত সিদ্ধান্ত বা সার্কুলার জারির আবেদন করা হয়েছে।
আবেদনকারীর মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে একদিকে যেমন বিচারপতিদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা বজায় থাকবে, অন্যদিকে মুসলিম আইনজীবীদের ধর্মীয় বিশ্বাস, আত্মমর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকারও সুরক্ষিত হবে।
উল্লেখ্য, এটি প্রধান বিচারপতির কাছে দাখিল করা একজন আইনজীবীর আবেদন। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা জারির তথ্য আবেদনের অনুলিপিতে উল্লেখ নেই।

