দুর্নীতি দমন কমিশন কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে?

বাংলাদেশে দুর্নীতির বিস্তার এবং গভীরতা নিয়ে কারো মনে সন্দেহ থাকার কথা নয়।

দুর্নীতির গভীরতা আছে বলেই ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা হয়েছিল।

কিন্তু সরকার যে সেটি স্বেচ্ছায় করেছিল সে কথা বলা যায় না।

একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য দাতা দেশ এবং সংস্থাগুলোর তীব্র চাপ ছিল।

২০০৪ সালের আগে দুর্নীতি দমন ব্যুরো ছিল।

রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে একটি স্বাধীন সংস্থা যাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে সেজন্য ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ বিলুপ্ত করে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ প্রতিষ্ঠার চাপ ছিল।

কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ১৩ বছরে নানা সমালোচনার মুখে পড়েছে এ প্রতিষ্ঠানটি।

অভিযোগ রয়েছে সরকারের পছন্দ অনুযায়ী দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয় কিংবা দায়মুক্তি দেয়া হয়।

বিশেষ করে ক্ষমতাবান রাজনীতিবিদ, আমলা কিংবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে সেগুলো খুব কমই আমলে নেয়া হয়। এমনটা মনে করেন অনেকে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কমিশন কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে?

দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ

জবাবে মি: মাহমুদ বিবিসিকে বলেন, “আমি সরাসরি যদি উত্তর দেই তাহলে বলবো আজকে পর্যন্ত স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছি। কিন্তু স্বাধীনতার মাপকাঠি কী? স্বাধীন তো আসলে কেউই না। বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারের সাথে কাজ করতে হয়। আপনারা সাংবাদিকরা কোন রিপোর্ট করার আগে চিন্তা করেন, এটা করবো কী করবো না। সে রকম সেল্ফ ইমপোজড প্রেশার থাকে। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে আমি এ পর্যন্ত কোন প্রেশার এখনো পাইনি।”

মি: মাহমুদ এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বলছেন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।

অতীতে যারা বিভিন্ন সময় চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা বরাবরই দাবী করেছেন যে দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করে।

কিন্তু দুর্নীতি নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাদের বক্তব্য ভিন্ন।

২০১৫ সালের নভেম্বর মাস থেকে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের উপর একটি বিস্তারিত গবেষণা করেছে দুর্নীতি বিরোধী বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।

সে গবেষণার ভিত্তিতে টিআইবির ড. রিজওয়ানুল আলম বলছিলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের উপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়।

মি: আলম বলেন, “আমরা বিভিন্ন নির্দেশকের ভিত্তিতে গবেষণাটি করেছিলাম। সেখানে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে কিছু তথ্য পেয়েছি যেগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ব্যাপারটি আছে। অনেক সময় দেখা গেছে দুর্নীতি নিয়ে জোরালো অভিযোগ থাকলেও গ্রেফতার করা হয় না।”

নিয়ম অনুযায়ী দুর্নীতি দমন কমিশন দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে এবং মামলা করে। এরপর সেটি চলে আদালতে বিচার হয়।

কমিশনের একজন আইনজীবী খুরশীদ আলম জানালেন, যেসব মামলা দায়ের করা হয় সেগুলো প্রায় ৭০ শতাংশ রায় কমিশনের পক্ষে আসে।

কিন্তু আপীল বিভাগের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির হার অনেক কম।

আইনজীবীরা বলছেন, দুর্নীতির দায়ে যারা সাজা পেয়েছেন তাদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তিও আছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন তারা এমন অনেক মামলা দেখেছেন, যেগুলো রাজনীতিক প্রভাবের কারণে দুর্বল তদন্ত হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে সেগুলো টেকে না।

দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী খুরশীদ আলমকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি যখন মামলা পরিচালনা করেন তখন তদন্ত নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট থাকতে পারেন?

আইনজীবী মি: আলম বলেন, “এটা পার্টলি কারেক্ট। প্রত্যেকটা ইনভেস্টিগেটিং অফিসার তো সমভাবে পারদর্শী না। এটার অবশ্যই সংকট আছে। এর জন্য ট্রেনিং দরকার। আমাদের মামলায় সরকার দলীয় সংসদ সদস্য বদির কনভিকশন হয়েছে। মামলা বিভিন্ন সময় হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ হয়। হাইকোর্ট যখন হস্তক্ষেপ কর তখন প্রসিডিং দীর্ঘায়িত হতে থাকে।”

বাংলাদেশে দুর্নীতির নানা প্রকারভেদ আছে। তবে দুর্নীতিকে প্রধানত; দুটি ভাগে ভাগ করা হয়।

একটি হচ্ছে, প্রতিনিয়ত যারা সরকারী সেবা নিতে যান তাদের অনেকেই বিভিন্ন সংস্থায় গিয়ে নানাভাবে ঘুষ দিতে বাধ্য হন।

অন্যটি হচ্ছে, বিভিন্ন প্রকল্পে রাজনৈতিক দুর্নীতি। ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেখা গেছে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার শিকার হয়েছেন।

২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং কিছু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল।

কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে-সাথে অনেক মামলার কোন পরিণতি হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্তরাই সুবিধা পেয়েছেন বেশি।

দুর্নীতি দমন কমিশন বলছে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং এখানে কোন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষের ধারণা ভিন্ন রকম।

তাদের অনেকেই মনে করেন দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করে না কিংবা করতে পারে না।

ঢাকার একজন বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আমার তো মনে হয় দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। দুর্নীতির তো বিচার হয় না। বিচার হইলে তো সাধারণ মানুষ হয়রানি হইতো না।”

“দুর্নীতি দমন কমিশন সরকারী প্রভাবশালী লোকের জন্য কাজ করতে পারে না। বিরোধী দলের যারা আছে তাদের মামলা দেয় আর সরকারী দলের কিছু হয় না,” বলছিলেন আরেকজন বাসিন্দা।

বিভিন্ন সময় দুর্নীতি দমন কমিশন অনেক ব্যক্তির সম্পদ নিয়ে তদন্ত করে এবং তাদের দুর্নীতি দমন কমিশনে তলব করে।

এসব খবর সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হয়। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে এ কাজ করে কমিশন?

জবাবে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বিবিসিকে বলেন, “কমিশনের এটি একটি দুর্বলতম দিক। দুর্বলতম দিক এজন্য বলছি যে আমরা অনেক সময় স্পেসিফিক ক্রাইটেরিয়া ধরে এগুতে পারিনা। ….. আমরা এখন তদন্তকারীদের কিছু সুনির্দিষ্ট পয়েন্টের ভিত্তিতে তদন্ত করতে বলছি। এখন আমরা হুট করে কাউকে ডাকছি না আবার হুট করে কাউকে ছাড়ছিও না। এখন পরিশুদ্ধভাবে তথ্য যাচাই-বাছাই করি।”

কিন্তু বিভিন্ন সময় কমিশনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরকার বিভিন্ন সময় দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার বললেও জনমনে এ সংক্রান্ত ধারনার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে জিজ্ঞেস করেছিলাম বিষয়টিকে সরকার কিভাবে দেখছে?

আইনমন্ত্রী মনে করেন, যেহেতু প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি সেজন্য এ প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে মানুষের মাঝে আস্থার সংকট আছে।

এটি দূর হতে সময় লাগবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে বর্তমান সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে বলে আইনমন্ত্রী দাবী করেন।

দুর্নীতি দমন কমিশন পরিচালনার সাথে যারা যখন সম্পৃক্ত থাকেন তারা সবসময় নিজেদের স্বাধীন বলে দাবী করেন।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু স্বাধীনতার দাবী করলেই হবে না, এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক দেশের মানুষ কী ভাবছে সেটিও একটি বড় বিষয়।

/