বিচার বিভাগীয় তদন্ত: মজলুমের বিরুদ্ধে একতরফা অস্ত্র
অ্যাডভোকেট এম. মাফতুন আহমেদ

“সত্য বাবুর কাছে অভিযোগ দিলাম, উত্তর পেলাম না”

অ্যাডভোকেট এম.মাফতুন আহমেদ:  আমার জন্মের চার বছর পর। অর্থাৎ ১৯৬৮ সাল। একটি জনপ্রিয় বাংলা সিনেমা। নাম “এতটুকু আশা”। গানটি’র শিরোনাম ছিল ‘তুমি কি দেখেছো কভু’। গায়ক মরমী কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বার। আজ তিনি মরহুম। এই সিনেমাটি’তে তিনি গেয়েছিলেন—

“প্রতিদিন কত খবর আসে যে কাগজের পাতা ভরে
জীবন পাতার অনেক খবর রয়ে যায় অগোচরে
কেউ তো জানেনা প্রাণের আকুতি
বারে বারে সে কি চায়
স্বার্থের টানে প্রিয়জন কেন
দূরে সরে চলে যায়”…..।

আসলে প্রতিদিন অনেক খবর আসে; কাগজের পাতা ভরে। চোখ বুলিয়ে পড়ি আর দেখি। মগজে সঠিক উত্তর মেলে না। হিসাবের অংকে মিল খায় না। তবে এতোটুকু বুঝি এসব খবর রয়ে যায় বড় সাহেবের অগোচরে। এক সময় অসৎ দুনীর্তিবাজদের বিরুদ্ধে সরাসরি কোন অভিযোগ বা পত্রিকার খবর প্রকাশিত হলে সত্য বাবুরা নড়েচড়ে বসতেন। দ্রুত ব্যবস্থা নিতেন। এ সবের এখন আর কোন বালাই নেই।

আইনগত বাধা যাই থাকুক না কেন জনমনে বদ্ধমূল ধারণা এখন আর পেপার-পত্রিকায় রিপোর্ট দিয়ে কোন কাজ হয় না। তার মানে কোন মেধাবী লেখক, সাংবাদিক সাহিত্যিক কী এদেশে নেই? তাঁরা কী লিখতে পারেন না। অবশ্যই মেধাবী সাংবাদিক, কলামিষ্ট এদেশে এখনও আছে। শৃঙ্খলা বা জবাবদিহিতা নেই বলে আগেভাগে সত্য বাবুর সাথে আধারে সবকিছু ম্যানেজ হয়ে যায়। তাই হতাশার গহব্বরে থেকে অপরিসীম ব্রেন চর্চা করে স্পষ্টভাষী অনুসন্ধানী কলাম এখন আর পাঠক সমাজে কেউ প্রকাশ করতে চায় না।

ভাবখানা এমনই যে জনসাধারণ নয়, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেত্বত্ব ঠিক থাকলে তার চাকুরী ঠিক থাকবে। তাই রাজনৈতিক নেতাদের পোষা গোলাম সাজে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী যদি বেশি আনুগত্য দেখায় সেখানে কেউ যে কারোর খবর রাখবে না এটাই স্বাভাবিক? জনমনে একরাশ আকুতি কেন সে জানবে? জানার ইচ্ছে প্রকাশ করবে। পাওয়ার হাউজ ঠিক থাকলে সব ঠিক। তাই স্বার্থের টানে দূরে সরে চলে যায়। এক পর্যায়ে অনিয়মের বিরুদ্ধে ন্যায্য অধিকার আদায়ে মানুষ বিপ্লবী হয়ে উঠে।

নাগরিক হিসেবে দেশের এবং আমজনতার প্রতি সবার কমবেশি দায়িত্ব, কর্তব্যবোধ থাকে। সাংবিধানুযায়ী জবাবদিহিতা, সকল দুনীর্তি—অনিয়মের বিরুদ্ধে উচ্চকিত কণ্ঠে প্রতিবাদ করার অধিকার আছে সকল নাগরিক সমাজের। বলা যায় এটি দেশপ্রেমের একটি অংশ। মগজে উত্তর না মিললেও একথা দ্বিধাহীনচিত্তে প্রতিবাদ করা সকল বিবেকের দায়িত্ব।

আসলে আমার মতো মশা মাছি ক্ষুদ্র প্রাণীর উত্তর দেবার কী আছে? নতুন করে জাতিকে আলোর দিশা দেখানোর বা কী মেধা আছে? চলমান সমাজ ব্যবস্থায় কি বা প্রয়োজন আছে। হাতে গুণ্ডা,হুন্ডা,কলম,ক্ষমতা, টাকা,কড়ি কিছুই নেই। বলা যায় এ সমাজে সব থেকে অসহায়,অপাংক্তেয় নিঃস্ব, রিক্ত আমি একজন।

সাংবিধানিকভাবে এই জাতি রাষ্ট্রের একজন নগন্য মানুষ, এতটুকু পরিচয়। করার কোন ক্ষমতা না থাকলেও বলার কিছু তো আছে। তবে বলতে তো পারি না। কারণ আমি যে বোবা! অন্যায়ভাবে লাল দালানের ভাত কে খাবে? জেলের ঘানী কে টানবে? তবুও বিবেক থাকলে,দেশের প্রতি অফুরন্ত মায়া—মমতা থাকলে কিছু একটা বলতে হবে। দেশপ্রেমের মমত্বে কথার ঝংকার শুনাতে হবে।

কারণ দুষ্ট চক্র, অনিষ্টসাধনকারী, কালোবাজারী, মজুদদারী, ঘুষখোর, সুদখোর, দুনীর্তিবাজ, রাজনৈতিক পা চাটা গোলামরা সমাজের আনাচে—কানাচে, ডাস্টবিনে গুই মাছির মতো কিলবিল করছে। এরা দেশটাকে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে নিয়ে যেতে চায়। তারপর রাজশক্তি বলে একটা কথা আছে। এদের ক্ষমতার দম্ভ এতই বেশী যে, ফু দিলে কোন আসমানে যেয়ে পড়তে হবে তার কোন ইয়াত্তা নেই।

মাশা—মাছি আনাচে—কানাছে ভৌ ভৌ করে। ক্ষুদ্র মশা মাছির মতো সমাজের জীর্ণ—শীর্ণ মানুষ হয়ে অন্যায়,অনিয়মের বিরুদ্ধে ভৌ ভৌ করার মতো ক্ষমতা এতোটুকো তো আছে। মনে রাখতে হবে আপনি জাতির বিবেক। একজন বিবেকের কাজ কী? লুটপাট করে বউ পোলাপান নিয়ে প্রাসাদোপম অট্টালিকায় থাকা, দেশকে ধ্বংস করা, রাষ্ট্রীক স্বাধীনতাকে অপরের হাতে তুলে দেয়া, দেশের টাকা পাচার করে বিদেশের মাটিতে বিত্তবৈভব গড়ে তোলা।

এ সব অনৈতিক কাজ। কোন দেশপ্রেমিক এ কাজকে সমর্থন করেন না। আপনি, আমি অসুর শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করি আগামী প্রজন্মের কাছে কী কৈফিয়ত দেবো? জিজ্ঞেস করলে কী বলবো? বলবো সুদ,ঘুষ,দুনীর্তি,কালোবাজারী,মজুদকারী এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলাম? নীতি বিরুদ্ধ কাজকে প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলাম। হয়তবা পারিনি। তবুও মনের কাছে অজুত সান্তনা দেশপ্রেমিক একজন যোদ্ধা হিসেবে মরণপণ সংগ্রাম করেছি।

সত্য বাবুর কাছে অভিযোগ দেওয়াটাই বৃথা

সত্য বাবু! ভাবেসাবে, পোশাক—আশাকে মনে হয় অনেকটা ভাবে সপ্তমী। সত্যিই সত্য বাবু! সত্য বাবু দায়িত্বশীল রাজকর্মচারী। অনেকে তাই তাঁর কাছে অভিযোগ দেয়। অভিযোগ দেয় এদেশের দুষ্ট চক্র, অনিষ্টসাধনকারী, কালোবাজারী, মজুদদারী, ঘুষখোর, দুনীর্তিবাজ, রাজনৈতিক পাচাটা গোলামদের বিরুদ্ধে। অভিযোগের উত্তর আসে না। সত্য বাবু জানে অভিযোগ দেয়া একজন ব্যক্তির নাগরিক অধিকার। অভিযোগের প্রেক্ষিতে কোন কিছু জানা ভুক্তভোগীদের সাংবিধানিক অধিকার। খোজ নিয়ে জানা গেছে ভুক্তভোগীর অভিযোগটি সত্য বাবুর হাতের কাছে ডাষ্টবিনে। তাই তাঁর উত্তর দেবার প্রয়োজন নেই। কারণ জবাব চাইবে কে? সবাইতো সত্য বাবুর মোসাহিবেতে ব্যস্ত।

সত্য বাবু তো নেই। কোথাও তাঁকে এখন দেখা যায় না। মনে হয় গেল ক’বছর আগে অক্কা গেছে। অক্কা গেছে বলে কোন সমস্যার কী সুরাহ হবে না? শেষমেষ উপায় কী। সত্য বাবু বেঁচে থাকলেও সমস্যার কোন সমাধান হতো কী? অভিযোগ দিলেও ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন না। ভবিষ্যতে কোন একদিন সমাধান হবে বলে মনে হয় না। কারণ এ সবের অগোচরে সত্য বাবুদের সাথে চলে শাপ—লড়–র নানা খেলা। কারণ সব শিয়ালের এক রো।
তাই তো চারণ কবি লিখেছেনঃ

“বিবেক বাবু মারা গেছেন,
সত্য বাবুর গায়ে জ্বর……..।
নীতি বাবু দেশ ছেড়েছেন,
এটা বিবিসির খবর…!!
উচিৎ বাবুর কানে তালা,
জুলুম বাবুর বেজায় জোর…!
শান্তি বাবু অশান্তিতে,
হবেনা আর হয়তো ভোর…!!”

যতই নদীতে তুফান উঠুক না কেন, দেশপ্রেমের মমত্বে কিছু করতে হবে। কথা বলতে হবে। সত্য বাবু যে ‘মুখে ফরিদ বগলে মে ইট’ এটা আগে অনেকে জানতেন না। বিচারের নামে প্রহসন হবে এটা বুঝতে পারেনি। ফেসবুকে একজন পোষ্ট দিয়েছেনঃ

“মানুষের বিচার বন্দি টাকার ফান্দে,
অফিস—আদালতের দ্বারে দ্বারে
সুবিচারের বাণী প্রকাশ্যে কান্দে”।

কথাটি ঠিক কিনা পাঠক মহলের ওপর ছেড়ে দিলাম। তবে আগে জানলে এ নৌকায় হয়তবা অনেকে পা দিতেন না। সময়ক্ষেপণ করার কোন প্রয়োজন ছিল না। বোবার মতো নীরব নিধর হয়ে বসে থাকতেন। কারণ বোবার কোন শত্রু নেই।
ঘুষ নামে শব্দটি ঘরে ঘরে,অফিস—আদালতে প্রকাশ্য বাসা বেঁধেছে। ক্যান্সারের মতো রূপ ধারণ করেছে। বাংলাদেশে এমন কেউ নেই যে বুক হাত দিয়ে বলতে পারবেন না, তিনি ঘুষ খান না,ঘুষ দেন না। রাজনীতির নামে একশ্রেণির রাজনীতিকের অপ্রত্যাশিত টাকা বেড়েছে। কিভাবে এই টাকার পরিমান বৃদ্ধি পেল? কোথাও কোথাও স্বামীর থেকে স্ত্রীর নামে টাকার পরিমান কয়েক ডবল হয়েছে? স্ত্রী কী এমন ব্যবসা করেন? রাতারাতি এতো টাকার মালিক হলেন? প্রিয় পাঠক বুঝতে আপনাদের কী অসুবিধা আছে? রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে তাল গাছ হয়েছে পর্দার আড়ালে।

ঘুষ, দুনীর্তি দেশের সব কিছুকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ঘুষ নামে অভিশপ্তটি দেশ—জাতির উন্নয়নে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কথা সত্য যে, “আমাদের আয় বেড়েছে। মাথাপিছু জিডিপিতে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষেরা ভারত ও পাকিস্তানের মানুষের চেয়ে গড়ে বেশি আয় করেন। এটি দেশের অভ্যন্তরে তাঁদের আয়ের হিসাব। আয়ের ক্ষেত্রে কয়েক বছর ধরেই ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্যেই মাথাপিছু জিডিপিতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় শক্তির দু’টি দেশ ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিল বাংলাদেশ”।
সূত্রঃ (দৈনিক প্রথম আলো,১৬ ডিসেম্বর ২০২৩)

ঘুষ বন্ধ হলে এ দেশ আজ কোথায় যেয়ে দাঁড়াতো? এক কথায় এদেশ বেহেস্ত পরিণত হতো। যে দেশে বিনা চাষকারকিতে ফসল উৎপাদন হয়। সে দেশে কী না হতে পারে। কলামটি লিখতে যেয়ে এক গানের কলি মনে পড়ে গেল। এক বাউল কবি গেয়েছিলে —“সাধের লাউ বানাইলা মোরে বৈরাগী”। প্রিয় পাঠক, এবার বুঝেছেন এ দেশের উর্বার মাটির কি গুণ? সেই মাটির মানুষের আজ কী দূরাবস্থা; নীরব নিভৃতে একটু ভেবে দেখুনতো?

কালোবাজারী, মজুদদারী, ঘুষখোর, দুনীর্তিবাজ এদের প্রতিরোধ করা খুব কী কঠিন কাজ? মোটেই না। রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে ‘রুল অভ ল’—র প্রতি সত্য বাবুরা শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠলে কঠোর হস্তে চিহ্নিত ঘুষখোরদের জিরো টলারেন্সে আনা খুব কঠিন কিছু নয়। কিন্তু যিনি করবেন তিনি তো পাক্কা ঘুষখোর! নূন্যতম দেশপ্রেম তাঁর মধ্যে নেই। তাঁর অতীত আমলনামা খুব খারাপ। খেঁাজ নিলে তাঁর থলের বিড়াল সব বেরিয়ে যাবে। প্রশ্ন হলো বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?

ঘন্টা বাঁধতে চাইলে নিজেকে সততা, নিমোর্হতার পরিচয় আগে দিতে হবে। যা মানুষকে বলিয়ান করে। একজন সি.এস.পি (সেন্ট্রাল সিভিল সার্ভিস অভ পাকিস্তান)। নাম পি.এ.নাজির। এই নামটি’র সাথে এই তল্লাটের কমবেশি সবাই পরিচিত। তখন উনি কুষ্টিয়ার এস.ডি.ও। এক তহশীল অফিসে ইন্সপেকশনে গেলেন। তহশীলদারের অফিসের সামনে টাঙনো নোটিশে দূর এক গ্রামের ক্যাম্পে অবস্থান করছেন বলে জানান দেন। বিকার পাঁচটা পর্যন্ত সেখানে থাকার কথা। অথচ অফিসে তহশীলদার ঘুমান।

এস.ডি.ও সাহেব বললেন—“এখানে ঘুমানোর কথা তো নয়? অফিসের ভেতরে গিয়ে দেখলেন দুটো বড়ো বড়ো কাঠের সিন্দুক তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। —‘এগুলো কী’? জবাব এলো,‘হুজুর,এ গুলো জীবননগর জমিদার বাড়ী থেকে আনা হয়েছে। এতে কালেকশনের টাকা পয়সা রাখা হয়’। বললাম,‘আপনার তহশীলে এত টাকা আদায় হয়! খুলুন তো তালা দুটো’। তিনি ইতস্তত করতে লাগলেন।

এস.ডি.ও সাহেব আবার জোরের সাথে বলায় তালা খুলে দিলেন। ভিতরে গুড়ের বড়ো বড়ো গোলাকার পাটালি এবং এ দিয়েই দুটো সিন্দুক পূর্ণ করে রাখা হয়েছে। বললাম,‘খাজনা কী কাঁচা পয়সার বদলে এই সব দিয়ে আদায় করা হয় নাকি’? এ সব সোনাদানা দিয়ে কী করেন আপনি? এতগুলো গহনা তো আপনার স্ত্রীর হতে পারে না। আর যদিও হয় সরকারি অফিসের ক্যাশ বাক্সে্র আসে কীভাবে? এবারও কোন জবাব নেই। তাঁকে হুশিয়ারী করে দিলাম ,‘যদি তাড়াতাড়ি জবাব না দেন তবে কালেক্টর সাহেবের সামনে আপনাকে শারিরিক দণ্ড দেয়া হবে’।

বললাম,‘যদি সত্য বলেন তবে সহানুভূতি পাবেন,নতুবা চাকরিও যাবে,হাজতবাস ও ঘটবে। অনেক চাপাচাপির পর মুখ খুললেন,‘হুজুর,এগুলো আমি কিনেছি বাড়ী নিয়ে যাবার জন্য আর গহনাগুলো আমার স্ত্রীর’। বুঝলাম একে যত সোজা ভাবছিলাম,এ তা নয়। তাই তারই টেবিলে বসে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্তের আদেশ দিলাম”। (সূত্রঃ‘স্মৃতির পাতা থেকে’,পি এ নাজির,পৃ.—৭৯—৮০)

এ রকম হাজার হাজার পিএ নাজির রয়েছে এদেশে। আমি দেখেছি খুলনার অবসরপ্রাপ্ত এক জেলা ও দায়রা জজ মি. বিপ্লব গোস্বামী। এখানে বিচার আঙ্গিনায় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ,অনিয়মের অভিযোগ আসলে স্ব বিবেচনায় আগে বিভাগীয় মামলা রুজু করতেন। তাঁর সততা ছিল প্রখর। খুলনাবাসী যা আজও স্মরণ করেন।

আজকের দিনে কোন সত্য বাবু এ ধরনের সাহসী উদ্যোগ কী নিতে পারবেন? পারতেন যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে দেশের প্রতি মমত্ব থাকতো। আর নিজেকে ঘুষ দুনীর্তির উর্ধ্বে উঠতে পারতেন। নিজের আয়নায় চেহেরাটা কালেভদ্রে দেখতেন। দেখে অনুশোচনাবোধ করতেন। তাহলে পিএ নাজির সাহেবদের মতো দৃষ্টান্ত স্থাপন করা এই সমাজে খুব কঠিন কাজ নয়।

সরকার পরিচালিত হয় তিনটি অর্গানের মাধ্যমে। এই বিভাগ সমূহ একে অপরের পরিপূরক। একটা ছাড়া অন্যটা চলতে পারে না। ঘুষখোরদের কী অপ্রতিরোধ্য দৌরাত্ন? কোথায় হারিয়ে গেল ‘ল এণ্ড অর্ডার’? প্রিয় পাঠক আপনাদের নিয়ে যাই হাল জামনায় সরাসরি সত্য বাবুর কাছে।

১২ নভেম্বর ২০২৩ সাল। রেজিঃ ডাকযোগে খুলনা জুডিসিয়াল ম্যাজিসট্রেট আদালত—১ এর কাছে বেঞ্চ ক্লাক ‘কাবেরী রানী পাইক’ এর বিরুদ্ধে ১০/২০ টাকা ঘুষের লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন রেজিঃ ডাকযোগে জনৈক আইনজীবী অ্যাড. নাহিদ সুলতানা।
বেঞ্চ ক্লাকের কী খুঁটির জোর? খুলনা জুডিসিয়াল ম্যাজিসট্রেট আদালত—১ এর কাছে সেই চিঠি না দিয়ে তিনি নিজেই চিঠি খুলবেন, অতঃপর দেখবেন খামের মধ্যে কী লেখা আছে?

প্রশ্ন হলো উক্ত জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে কী চিঠি খুলে নিতে বলেছেন? সম্ভবত বলেননি,বলতে পারেন না। শুধু তাই নয়, মনে হয় পোষ্ট অফিসের রানারের সাথে কাবেরী রানী পাইক ঔদ্যত্যপূর্ণ আচারণও করেছেন। রানার খামে লিখলেন—“পেশকার সাহেবা চিঠিখানী খুলিয়া গ্রহণ করিবেন। খুলিয়া বিলি করার আমাদের আইনের আওতায় নাই। তাই চিঠি বিলি করা গেল না।—গোবিন্দ। ১৫.১১.২৩”।

কোন দেশে বাস করি। চিঠিতে কী লেখা আছে সেটা দেখে নিবেন। তারপর গ্রহণ করবেন। জুডিসিয়াল সার্ভিস কণ্ডাক্ট বা সরকারি শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধিতে এসব ঔদ্যত্যপূর্ণ লেখা আছে কিনা জানি না। তবে এসব চরম আইন বহিভূর্ত এবং ঔদ্যত্য আচারণ বলে মনে করি।

একজন বিজ্ঞ আইনজীবী সরাসরি অভিযোগ দিয়েছেন ১০/২০ টাকা ঘুষের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষকে তদন্ত সাপেক্ষে এসব ঘুষখোরদের দেশের স্বার্থে সরাসরি আইনের আওতায় আনা উচিত ছিল বলে বোদ্ধা মহল মনে করেন। তাহলে কোথায় থাকলো আজকে জবাবদিহিতা? এ রকম কাবেরী রানী পাইকদের উর্ধ্বতনদের বিরুদ্ধে দেশের হাজারো বিচারপ্রার্থী জান্নাতিদের অভিযোগ রয়েছে। কে দেখবে,কে শুনবে তাঁদের নীরব আর্তনাদ। তাই তো “এতটুকু আশা” বাংলা ছায়াছবির গানের শেষ কলি আবার মনে পড়ে গেল।

“তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়
দুঃখের দহনে করুন রোদনে
তীলে তীলে তার ক্ষয়”…..।

এখনো সময় আছে এদের গলার টুটি চেপে ধরুন। আইনের আওতায় আনুন। এরা দুর্জন, এরা ঘুষখোর। এরা জাতির শত্রু। এদের প্রতিরোধ না করলে এই জাতি রাষ্ট্র দুনীর্তিবাজ, ঘুষখোরদের কাছে একদিন পরাজয় হবে। জাতি রাষ্ট্র তিলে তিলে ধ্বংস হয়ে যাবে। জিম্মি হয়ে পড়বে গোটা জনগোষ্ঠী। সত্য বাবু এখনও মরেও মরে নাই। সত্য বাবুরা আছেন বলে পৃথিবীটা এখনও টিকে আছে। তাহলে কিসের ভয়, কিসের ডঙ্কা। মোসাহেবী নয়, সত্য, ন্যায়ানুগ ভূমিকা পালন করতে কোন বাঁধা আছে বলে মনে করি না।

লেখক: আইনজীবী, কলামিষ্ট ও সম্পাদক- আজাদবার্তা।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম -এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম কর্তৃপক্ষের নয়।